রাইটটার্ন
ভারতে শেষান বনাম জ্ঞানেশ এবং নিরপেক্ষতার সংকট
মোহাম্মদ গোলাম নবী
মোহাম্মদ গোলাম নবী
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলন একটি পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে। যে দেশে টিএন শেষানের (তিরুনেল্লাই নারায়ণ আইয়ার শেষান) মতো প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী শৃঙ্খলা ও স্বাধীনতার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন, সেখানে কয়েক দশক পর নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আবার এত বড় বিতর্ক কেন?
অক্টোবরের শুরু থেকে নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের কাছে পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। সেখানে অবস্থান নেওয়া রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতাদের পুলিশ আটক করলেও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন। বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারদের বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং ক্ষমতাসীন দল সুবিধা পাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি তরুণদের আন্দোলনও এই দাবিতে যুক্ত হয়েছে। ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড়ের পর আটক তরুণ নেতাদের মুক্তি দেওয়া হলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা এসেছে। ফলে বিষয়টি একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থারও প্রশ্ন উঠছে।
টিএন শেষান কেন প্রাসঙ্গিক? তিনি ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। নির্বাচনী আচরণবিধিকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত করে তিনি দেখিয়েছিলেন, প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে প্রয়োগ করলে রাজনৈতিক আচরণেও পরিবর্তন আনা যায়। তার অবদান শুধু কয়েকটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ছিল না। তিনি কমিশনের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশা পর্যন্ত বদলে দিয়েছিলেন।
কিন্তু আমরা জানি যে, প্রত্যাশা বদলানো এবং সেই প্রত্যাশা পূরণের স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। শেষান কাঙ্ক্ষিত আচরণের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন বটে, কিন্তু পরবর্তী প্রত্যেক নেতৃত্বকে সেই আচরণের কাঠামোর মধ্যে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও জবাবদিহি যথেষ্ট নিশ্চিত করতে পারেননি। সেই কারণেই বর্তমান বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক প্রশ্ন সামনে চলে আসছে।
ভালো কাজ একবার হওয়া আর তার ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠিত হওয়া দুটি আলাদা অর্জন। প্রথমটির জন্য ব্যক্তির উদ্যোগ যথেষ্ট হতে পারে। দ্বিতীয়টির জন্য দায়িত্বের স্পষ্টতা, যোগ্য জনবল, প্রয়োজনীয় সম্পদ, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত জবাবদিহি দরকার। সবচেয়ে বেশি দরকার পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেও ভালো কাজটি চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা।
খারাপ কাজ সব সময় সহজ এবং ভালো কাজ সব সময় কঠিন– এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম না থাকলেও যেখানে অনিয়মে ব্যক্তিগত লাভ আছে, বাধা কম এবং জবাবদিহি দুর্বল, সেখানে অনিয়ম বারবার ঘটার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। অন্যদিকে ভালো কাজ করতে গিয়ে যদি শুধু একজন ব্যক্তিকে একাই চাপ, বিরোধিতা ও ক্ষতির ঝুঁকি নিতে হয় তাহলে তার উত্তরসূরি সেই পথে নাও হাঁটতে পারেন। ভালো আচরণের আহ্বান প্রয়োজন এবং সেই সঙ্গে দৃষ্টান্তও। কিন্তু আচরণটি টিকিয়ে রাখতে কাজের পরিবেশ এবং পুরস্কার ও জবাবদিহির ব্যবস্থাও বদলাতে হয়। নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়া যদি ব্যক্তিগত বীরত্বের বিষয় হিসেবে দেখা হয়, তাহলে নিরপেক্ষতার ধারাবাহিকতা দুর্বলই থাকবে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রশ্নটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে নিয়োগের সুপারিশকারী কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সংসদে আইন করার কথা বলা হয়েছিল। পরে আইনে প্রধান বিচারপতির জায়গায় প্রধানমন্ত্রী মনোনীত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে রাখা হয়। ফলে তিন সদস্যের কমিটিতে দুজন সরকারপক্ষের প্রতিনিধি স্থান পান।
এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে পক্ষপাতদুষ্ট বলা যাবে না। তবে যাদের নির্বাচনী আচরণ নিয়ন্ত্রণ করবে কমিশন; কমিশনার নির্বাচনে তাদের প্রভাব কতটা থাকা উচিত– সেই প্রশ্নটি কিন্তু থেকে গেল। এটি এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর টিএন শেষানের মতো তিনি যে ভারত রাষ্ট্রের কোনো সরকারের নন– সেই স্বাধীনতার ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতার প্রতি আস্থা তৈরি করাও সমান প্রয়োজন।
শেষানের সময়েই কমিশনের যৌথ সিদ্ধান্তের প্রশ্ন উঠেছিল। ১৯৯৩ সালে আরও দুজন কমিশনার নিয়োগের বিরুদ্ধে তাঁর আপত্তি আদালতে গিয়েছিল। ১৯৯৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট বহু সদস্যের কমিশনকে বৈধ ঘোষণা করেন। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব একটি কমিশনের; একজন ব্যক্তির নয়– এই নীতিও সেই সময়ে পরিষ্কার করা হয়েছিল। এই নীতির তাৎপর্য বড়। একজন অসাধারণ প্রধান এগিয়ে নিতে পারেন প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু স্থায়ী নির্ভরতার জায়গা হতে হবে প্রতিষ্ঠানের কার্যপদ্ধতি। সদস্যদের মতামত কীভাবে বিবেচিত হবে; সিদ্ধান্ত কীভাবে নথিবদ্ধ হবে; অভিযোগের উত্তর কত দিনে দেওয়া হবে এবং ভুলের সংশোধন কীভাবে হবে– এসবই স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
তাই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবির পাশাপাশি আরও গভীর প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা দরকার। একজনের পরিবর্তে আরেকজন এলেই কি একই ধরনের সমস্যা ফিরে আসা ঠেকানো যাবে? অভিযোগ সত্য হলে দায় নির্ধারণ কীভাবে করতে হবে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকের অধিকার ফিরিয়ে দিতে কী করা হবে– সেসব সুস্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে দেখতে হবে কোন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতায় এমন পরিস্থিতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্যও এটি শিক্ষণীয়। আমরা প্রায়ই ভালো মানুষ খুঁজি; কিন্তু ভালো কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে কম ভাবি। অথচ ভালো কাজের প্রথম সাফল্যের পরই সতর্কতার নতুন দায়িত্ব শুরু হয়। নিয়মিত দেখতে হয় চর্চাটি টিকছে কিনা; কোথায় বিচ্যুতি ঘটছে এবং সংশোধন হচ্ছে কিনা?
টিএন শেষান দেখিয়েছিলেন একজন মানুষ কতটা পরিবর্তন আনতে পারেন। এখন প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে পরবর্তী মানুষটিও সেই মানদণ্ড মেনে কাজ করতে বাধ্য হবেন। ভালো কাজের প্রকৃত স্থায়িত্ব বোঝা যায় মানুষ বদলানোর পর।
মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন
- বিষয় :
- মোহাম্মদ গোলাম নবী