ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

বিপন্ন লালমাই পাহাড়

প্রকৃতি ধ্বংসের আয়োজন বন্ধ করুন

প্রকৃতি ধ্বংসের আয়োজন বন্ধ করুন
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

শনিবার সমকালের এক প্রতিবেদনে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের বিপন্ন দশার যেই চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে তাহা উদ্বেগজনক। প্রায় ২৫ লক্ষ বছর পূর্বের প্লাইস্টোসিন যুগে গঠিত এই পাহাড়ের আয়তন আদিতে কত ছিল, তাহার কোনো প্রমাণপত্র না থাকিলেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ২০১৫ সালে প্রকাশিত ময়নামতি-লালমাইবিষয়ক বইয়ের সংশোধিত সংস্করণ অনুযায়ী, কুমিল্লা শহর হইতে প্রায় ৯ কিলোমিটার পশ্চিমে ও উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের আয়তন প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার। কিন্তু বিবিধ কারণে নির্বিচারে পাহাড় কর্তনের ফলে এমনকি উঁচু ভূমিও অনেকাংশে লুপ্ত হইয়াছে। প্রতিবেদন অনুসারে, সদর দক্ষিণ উপজেলার বড় ধর্মপুর, ছোট ধর্মপুর, রতনপুর, বিজয়পুর, সালমানপুর, সানন্দা, জামমুড়া, রাঙামুড়া, ষাইট কলোনি, খলা, ধনমুড়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বহু বৎসর যাবৎ পাহাড় কর্তনের কারণে অনেক স্থানই এখন সমতল ভূমি। উহার ফলস্বরূপ, বন ও কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে লালমাই পাহাড় ও আশপাশ অঞ্চলের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যে বৃহৎ পরিবর্তন আসিয়াছে। ষাটের দশকে তো বটেই, এমনকি নব্বইয়ের দশকেও তথাকার পাহাড়ি অঞ্চল ঘন বৃক্ষাদি, বাঁশবন ও বন্যলতায় আচ্ছাদিত ছিল। তথায় বন্য শূকর, মেছোবাঘ, বনবিড়াল, শৃগাল, হনুমানসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখিও ছিল। এখন সেই সকল বন্যপ্রাণীর কিছুই আর নাই। বৃক্ষরাজিও উচ্ছন্নপ্রায়। কেবল উহা নহে, প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এই অঞ্চলে ছয়টি রাজবংশের ৩৪ জন রাজার শাসনামলের বিভিন্ন কীর্তির যেই নিদর্শন পাওয়া গিয়াছে, সেইগুলিও হৃতপ্রায়। অবাধে পাহাড় কর্তন ও স্থাপনা নির্মাণের কারণে প্রত্নসম্পদ আবিষ্কারের জন্য নূতন খননকার্যও অসম্ভব হইতেছে।
আমরা অবগত, লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের বিস্তীর্ণ ভূমির উপর কুমিল্লা সেনানিবাস, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) ও  বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সেক্টর সদরদপ্তর স্থাপিত হয় ঔপনিবেশিক পাকিস্তান আমলে। পরিবেশ-প্রতিবেশের উপর এহেন স্থাপনার নেতিবাচক প্রভাবের কথা না ভাবিয়াই ঐ সকল প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হইয়াছে। তবে অধিকতর দুর্ভাগ্যজনক, স্বাধীনতার পরও এহেন প্রকৃতি ধ্বংসের অভিলাষ মনোজগৎ হইতে বিদায় লয় নাই। এমনকি ১৯৮০-এর দশকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশে পরিবেশ-সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার পরও এই বিপজ্জনক ধারা অব্যাহত। ১৯৮৩ সালে ৫২ একর ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ। ২০০৬ সালে ৫০ একর পাহাড়ি ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। পরে ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণে আরও ২০০ একরের অধিক ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। পাহাড়ের দক্ষিণাংশে স্থাপন করা হয় পুলিশ ফায়ার রেঞ্জ ও বাংলাদেশ স্কাউটের স্থাপনা। 

বিস্ময়কর হইলেও সত্য, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (২০০০ সালে সংশোধিত)-এর ধারা ১২-তে যে কোনো নূতন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা প্রকল্প স্থাপনের পূর্বে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক হইলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ হইতেছে কার্যত ঐ ছাড়পত্র ব্যতিরেকে। এইদিকে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন পূর্বে শর্তসাপেক্ষে পাহাড়ের বিভিন্ন অংশ ইজারা লওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে শর্ত লঙ্ঘনপূর্বক দখল ও মাটি কর্তন শুরু হয়। এমনকি বাংলাদেশ সার্ভে (বিএস) হওয়ার পর পাহাড়ের অনেক ভূমি ব্যক্তিমালিকানায়ও চলিয়া যায়। যাহার অনিবার্য ফলস্বরূপ পাহাড় কর্তন করিয়া বেসরকারি উদ্যোগে নির্মাণ করা হইতেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রিসোর্ট, বিনোদনকেন্দ্র ও আবাসিক স্থাপনা। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞাও প্রকৃতির এই ধ্বংসযজ্ঞকে নিবৃত্ত করিতে পারিতেছে না।

যে স্থানে সরকারি অনুমোদন ব্যতীত ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় কিংবা পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য স্পর্শকাতর ভূমি ও জলাভূমিরও প্রকৃতি পরিবর্তন করা যায় না, তথায় লালমাই পাহাড়ে এহেন ধ্বংসযজ্ঞের সম্পূর্ণ দায় সরকারকেই লইতে হইবে। আমাদের বিশ্বাস, অবিলম্বে সরকারের বোধোদয় ঘটিবে। তাহারা কেবল অবশিষ্ট পাহাড় রক্ষাই করিবে না; পরিবেশ ছাড়পত্রবিহীন স্থাপনাগুলির বিষয়েও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণের পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে। 

আরও পড়ুন

×