ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

বিআরটি বাতিল ও উন্নয়ন প্রকল্পের ন্যায্যতা

বিআরটি বাতিল ও উন্নয়ন প্রকল্পের ন্যায্যতা
×
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে প্রথম বিশেষ বাস চালানোর উন্নয়ন প্রকল্প– বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি। বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথে ১৪ বছর ধরে এর নির্মাণকাজ চলেছে। ব্যয় হয়েছে দুই হাজার ৮১১ কোটি টাকা। বিআরটির সার্বিক কাজের ৭৭ দশমিক ৪৮ ভাগ শেষ হবার পর তা বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রকল্প বাতিলের 
ফলে স্টেশন ও লেন বিভাজক ভেঙে করিডোরকে সাধারণ মহাসড়কে পরিণত করা হবে বলে সরকার জানিয়েছে।

২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একনেকে অনুমোদনের সময় প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় দুই হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে কাজ শেষ হবার কথা থাকলেও ২০২৫ সালের অন্তর্বর্তী সরকার পর্যন্ত মোট চার দফায় ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। সর্বশেষ প্রস্তাবিত প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব অন্তর্বর্তী সরকার ফিরিয়ে দেওয়ার পর বর্তমান সরকারের আমলে পুরো প্রকল্পই বাতিল হলো। বিদেশি ঋণনির্ভর এই প্রকল্প বাতিল হলেও বাংলাদেশকে সুদসহ ছাড় করা সমুদয় ঋণ পরিশোধ করতেই হবে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ এই অংশে অগণিত মানুষ এক যুগের বেশি সময় যানজট ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে অবর্ণনীয় দুর্দশায় পর্যুদস্ত হয়েছেন। শুধু তাই নয়; বিআরটি স্থাপনা নির্মাণজনিত দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত হন। উত্তরায় গার্ডারচাপায় এক পরিবারের পাঁচজন মারা যান। তবে প্রাণহানি থেকে শুরু করে অর্থনাশ– কিছুই বিআরটি প্রকল্পকে আলোর মুখ দেখাতে পারল না। রাস্তায় একটি বাস নামানোর আগেই প্রকল্প ভাঙার সিদ্ধান্ত এলো। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের তথ্য অনুযায়ী, ভাঙচুরের জন্য আরও হাজার কোটি টাকার বেশি লাগতে পারে।

যুক্তিসংগতভাবে প্রশ্ন ওঠে– প্রায় দেড় দশকে অজস্র কাঠখড় পোড়ানোর পর এই প্রকল্প বাতিল করাই কি একমাত্র সমাধান? বাতিলের প্রকৃত খরচ কত হবে এবং এই খরচে প্রকল্পটি শেষ করে নেওয়া যেত কিনা? আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গৃহীত বড় উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতিটিতে প্রস্তাবিত ব্যয় বৃদ্ধির নিয়মিত ঘটনা ঘটেছে। বিআরটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে আরও বড় অভিযোগ– পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকল্পের সময় ও জনগণের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। বিআরটি বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সরকার বুয়েটের অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা কমিটি তৈরি করে। কমিটি প্রতিবেদনে বিআরটিকে দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতা’র উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে জানায়– যথাযথ কারিগরি যাচাই, দক্ষ জনবল ও জবাবদিহিতার অভাবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রকল্পটিকে বাতিলের পক্ষে মতামত দেয়।

০২.
বুয়েট বিআরটি প্রকল্পকে পদ্ধতিগত ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করে পরামর্শক ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার সুপারিশ করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প সমীক্ষা ও নকশা শেষ হওয়ার আগেই অনুমোদন দিয়েছিল। অন্তত তিন দফা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবও তারা অনুমোদন করেছে। এ জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনীতিকদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে যারা কারিগরি ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের ভূমিকার জবাবদিহিতাও জরুরি। এত জনগুরুত্বপূর্ণ ও দেশের জন্য জরুরি একটি প্রকল্প– এটি কি ছেলের হাতের মোয়া যে, ফাইল সামনে এলো আর একজনের পর একজন সই করে দিলেন! পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্টতা না থাকলে এত বড় অন্যায্য অপতৎপরতা এতদূর অগ্রসর হতে পারে না। সমীক্ষা বা যাচাইয়ের দায়িত্বে রাজনীতিকরা ছিলেন না। আমলারা যারা ছিলেন, তাদের জবাব দিতে হবে। সেই জবাব পৌঁছাতে হবে জাতীয় সংসদে। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদে পৌঁছাতে হবে প্রকল্প পরিচালক ও পরামর্শকদের জবাব। দায়িত্বরত কর্মকর্তারা স্বাক্ষর না করলে ব্যয় সংশোধন প্রস্তাব রাজনীতিকদের টেবিলে পৌঁছায় না। সরকারকে তাই সংসদেই উপস্থাপন করতে হবে এত বিশাল প্রকল্পের কুশীলবদের ঘটনাক্রম।

একই সঙ্গে যারা বিআরটি প্রকল্প বাতিলের বিরোধিতা করছেন; সরকার তাদের কথাও গুরুত্বের সঙ্গে এখনও শুনতে পারে। বিশেষত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স-বিআইপির যে দাবি তা আমলে নেওয়া সংগত। বিআইপি জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী ও দেশ-বিদেশের নির্মাণ খাতের লবির স্বার্থের পক্ষে গেছে। একই সঙ্গে এটি গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট মাস্টারপ্ল্যান (জিটিএমপি) এবং ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (আরএসটিপি) প্রস্তাবনার পরিপন্থি। (সমকাল, ২১ অক্টোবর, ২৬)
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, বিআরটির তুলনায় ১০ গুণ ব্যয়ে নির্মিত মেট্রোরেলে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিআরটি বাতিল করা হচ্ছে। বিশ্বের নানা দেশে মেট্রোরেলের তুলনায় বিআরটিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। এটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও অপেক্ষাকৃত বেশি মানুষ এর সুবিধাভোগী। আমাদের দেশে প্রথম বিআরটি প্রকল্পের ৯৭ ভাগ অবকাঠামো তৈরির পর ভেঙে ফেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই এসব মতামত বিবেচনায় নেওয়া সংগত। 

০৩.
সার্বিক উন্নতিতে অবকাঠামো উন্নয়নের বিকল্প নেই। তবে এর সঙ্গে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার প্রশ্নটি সরকারকে সর্বাগ্রে বিবেচনায় রাখতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তৈরি অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র কমিটি আওয়ামী লীগ সরকারের সাতটি বড় প্রকল্প পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ ছাড়াই ব্যয় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। শ্বেতপত্র কমিটির মতে, ১৫ বছরে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মোট বরাদ্দের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ ঘুষ, চাঁদাবাজি, চুরিতে নষ্ট হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে কঠোর নজরদারি তৈরি করে নানামাত্রিক জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যয় সুবিধা বিশ্লেষণের সুযোগ বন্ধ করে নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প শেষ করতে হবে। যে কোনো কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। উন্নয়ন প্রকল্পেই কেবল তা থাকে না। এতে কতিপয় ব্যক্তির আর্থিক ‘উন্নয়নের’ সম্ভাবনা থাকলেও দেশের সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হয়!

সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের কেন্দ্রে থাকতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থ। অবকাঠামো উন্নয়নে রাজধানীর পাশাপাশি জেলা-উপজেলাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু ঢাকার সঙ্গে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করে মানুষকে রাজধানী থেকে দূরে রাখা যাবে না; জেলা-উপজেলায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে জেলার রোগী ঢাকায় এসে হাসপাতালের ওপরেই চাপ বাড়াবেন। মানবসম্পদ উন্নয়নও ঘুরপাক খাবে একই বৃত্তে।

আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে জেলা কিংবা উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার ভয়ংকর চিত্রের কথা আমরা জানি। অধিকাংশ উপজেলা হাসপাতালে এখনও ১০-১২টি গ্রামের আট/দশ লাখ মানুষের জন্য কজন চিকিৎসক থাকেন, তাও অজানা নয়। সেখানে সন্তান প্রসবের জন্য অস্ত্রোপচার ছাড়া আর কোনো অপারেশনের ব্যবস্থা নেই। যে কোনো প্রয়োজনে ছুটতে হয় জেলা হাসপাতালে। সেখানে শয্যার তীব্র সংকট। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্রও ব্যতিক্রম কিছু নয়।

গণঅভ্যুত্থানজাত গণতান্ত্রিক সরকারকে উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণে মানবসম্পদ উন্নয়নকে শীর্ষে রাখতে হবে। অবকাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ, তবে তাতে প্রাধান্য পাবে দীর্ঘমেয়াদি সুফল। সরকার বদলাবে, প্রকল্প চলবে। তাই পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন– সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে 
উন্নয়ন প্রকল্প জাতির গলার কাঁটা না হয়ে সম্পদে পরিণত হয়।

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল ও সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×