উন্নয়ন
সৃজনশীল অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা
আনোয়ার ফারুক তালুকদার
আনোয়ার ফারুক তালুকদার
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৮ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি, প্রবাসী আয় ও সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল। এসব খাত দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিলেও রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে। কারণ, কয়েকটি প্রচলিত খাতের ওপর অতিনির্ভরতা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকট, বাজারের পরিবর্তন ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মুখে দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এই বাস্তবতায় মানুষের মেধা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতাকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের সম্ভাবনা কাজে লাগানো জরুরি। সৃজনশীল অর্থনীতি তাই কেবল সংস্কৃতি ও বিনোদনের বিষয় নয়। এটি হতে পারে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের নতুন চালিকাশক্তি।
সৃজনশীল অর্থনীতি বলতে মানুষের জ্ঞান, মেধা, কল্পনাশক্তি, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবননির্ভর পণ্য ও সেবা সৃষ্টি, উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরির প্রক্রিয়াকে বোঝায়। সফটওয়্যার ও অ্যাপ তৈরি, অ্যানিমেশন, ভিডিও গেম, চলচ্চিত্র, সংগীত, প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন, স্থাপত্য, ফ্যাশন ডিজাইন, ডিজিটাল কনটেন্ট, চিত্রকলা, লোকশিল্প ও কারুশিল্প এর অন্তর্ভুক্ত। একজন সংগীতশিল্পী অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গান প্রকাশ করে আয় করতে পারেন; একজন অ্যানিমেশন নির্মাতা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাজ করতে পারেন। গ্রামের একজন কারুশিল্পী নিজের তৈরি নকশিকাঁথা ও পাটজাত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করতে পারেন। অর্থাৎ এখানে মানুষের সৃজনশীলতাই প্রধান পুঁজি।
বৈশ্বিক বাজারে সম্ভাবনা
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের ক্রিয়েটিভ ইকোনমি আউটলুক-২০২৪ প্রতিবেদনে ইউনেস্কোর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল শিল্পের বার্ষিক আয় প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৩.১ শতাংশ। বিশ্ব জিডিপিতে এই শিল্পের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ। তবে বিভিন্ন দেশে সৃজনশীল অর্থনীতির সংজ্ঞা ও পরিমাপ পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকায় এসব পরিসংখ্যান তুলনার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। তবু এ খাতের ব্যাপ্তি ও সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
বাংলাদেশেও এ সম্ভাবনার বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যভিত্তিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে শিল্প, বিনোদন ও অবকাশ খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৮২৯, যা ২০১৩ সালে ছিল ৩৩ হাজার ৪৪১। একই প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতের জিডিপিতে অবদান ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা এবং আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ১৫.৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এ খাতের অংশ এখনও ছোট; প্রায় ০.১৭ শতাংশ। অর্থাৎ সম্ভাবনা তৈরি হলেও তাকে বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার কাজ এখনও বাকি।
সরকারি উদ্যোগ: সম্ভাবনা থেকে বাস্তবায়ন
সরকার সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান জিডিপির ১.৫ শতাংশে উন্নীত এবং এ খাতে পাঁচ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সৃজনশীল পণ্যের নকশা ও মানোন্নয়ন, স্থানীয় শিল্পের বাজার সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক সৃজনশীল হাব প্রতিষ্ঠা এবং উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বাচলে প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয় সৃজনশীল হাব এবং বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সৃজনশীল কার্যক্রমের অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়। সৃজনশীল হাবগুলোকে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, গবেষণা, পণ্য উন্নয়ন, ব্যবসায়িক পরামর্শ এবং দেশি-বিদেশি বাজারের সঙ্গে সংযোগের কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে ইনোভেশন হাব চালুর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা, উদ্যোক্তা হওয়ার প্রস্তুতি এবং মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচিও সম্ভাবনাময়। ২০২৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে আট জেলার তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের শনাক্ত করে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে। কর্মসূচির সুফল নিশ্চিত করতে নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে অর্থায়ন, বাজার সংযোগ ও ব্যবসা পরিচালনায় পরামর্শ দিতে হবে। একই সঙ্গে সৃজনশীল উদ্যোগের উপযোগী প্রকল্পগুলোকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করা জরুরি।
স্থানীয় পণ্য, বৈশ্বিক বাজার
‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ ধরনের উদ্যোগ দেশের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পণ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করতে পারে। নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প, পাটজাত পণ্য, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র ও স্থানীয় কারুশিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে। তবে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; পণ্যের মান, আধুনিক নকশা, মানসম্মত মোড়ক, অনলাইন বিপণন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং রপ্তানি সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় কারিগরদের ন্যায্যমূল্য ও মুনাফার অংশ পাওয়ার বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে কয়েকটি বাধাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এ খাতের অনেক উদ্যোক্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করেন। তাদের অর্থায়ন, পেশাগত নিরাপত্তা, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার সুযোগ সীমিত। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করেও অনেকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ, অর্থ গ্রহণ ও ন্যায্য পারিশ্রমিক পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। তাই সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য সুস্পষ্ট জাতীয় নীতিমালা, নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান, সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে শুধু প্রচলিত খাতের উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়; নতুন ধরনের সম্পদ সৃষ্টির পথও খুলতে হবে। সৃজনশীল অর্থনীতি সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে লক্ষ্য নির্ধারণ ও পরিকল্পনা ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপ, কর্মসংস্থানের মান যাচাই এবং বিনিয়োগের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে। মানুষের মেধা ও সৃজনশীলতাকে যদি যথাযথ অর্থায়ন, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে তা কেবল নতুন কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করবে না; বাংলাদেশের পণ্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্ববাজারে নতুন পরিচিতিও দেবে।
আনোয়ার ফারুক তালুকদার: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
- বিষয় :
- আনোয়ার ফারুক তালুকদার
- অর্থনীতি