উচ্চশিক্ষা
শিক্ষকদের রাজনৈতিক বিশ্বাস বনাম দলীয়করণ
এম এম শহিদুল হাসান
এম এম শহিদুল হাসান
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে এসে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সংখ্যায় বেড়েছে, কিন্তু একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে: তরুণ প্রজন্ম গড়ার দায়িত্ব যাদের হাতে, সেই শিক্ষকদের নিয়ে সময় ও শক্তি কোথায় যাচ্ছে? শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণায় শিক্ষকরা সময় দিলেও অনেক শিক্ষকই সরাসরি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। কোথাও কোথাও তারা নিজ দলের ছাত্র সংগঠনের উপদেষ্টা বা রাজনৈতিক অভিভাবকের ভূমিকাও পালন করেন। শিক্ষকদের এতটা দলীয় সম্পৃক্ততা আন্তর্জাতিকভাবে অস্বাভাবিক।
প্রশ্নটি আরও জরুরি। ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের ধরন আগাম বলা কঠিন। প্রয়োজনীয় দক্ষতা দ্রুত বদলাচ্ছে, অর্থনীতি ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীরা এখন শুধু জ্ঞানার্জন নয়; কর্মজীবনের দক্ষতা অর্জনের জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে যেখানে এআই তথ্য প্রদান করে, সেখানে শিক্ষকের ভূমিকা পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে শিক্ষকের দায়িত্ব কমেনি, অনেক বেড়েছে।
উন্নয়নের পথে এশিয়ার অভিজ্ঞতা
এশিয়ার অন্য দেশগুলো থেকে আমাদের শেখার আছে। ১৯৬০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়া ছিল দরিদ্র কৃষিপ্রধান দেশ। শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প ও রপ্তানিতে টানা বিনিয়োগ করে তারা আজ বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪৪ শতাংশই এখন রপ্তানি থেকে আসে। ভিয়েতনামও দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি, দক্ষ প্রশাসন ও আধুনিক হয়ে ওঠা শিক্ষাব্যবস্থার জোরে বড় রপ্তানিমুখী উৎপাদনকারী দেশ হয়েছে। ২০২৫ সালে তাদের রপ্তানি ৪৭ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে, যার বড় অংশ এসেছে ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তি খাত থেকে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটি পরিষ্কার: অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য শুধু অবকাঠামো আর বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়; দরকার এমন বিশ্ববিদ্যালয়, যা জ্ঞান, দক্ষতা, উদ্ভাবন ও চিন্তার স্বাধীনতা তৈরি করতে
পারে। তাই শিক্ষকদের দায়িত্ব শ্রেণিকক্ষের বাইরেও প্রসারিত। তবে তা মূলত একাডেমিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক।
স্বাধীনতার লড়াই থেকে দলীয় রাজনীতি
বিশ্ববিদ্যালয় কখনও রাজনীতিমুক্ত জায়গা ছিল না; হওয়া উচিতও নয়। এখানে রাজনৈতিক ধারণা নিয়ে বিতর্ক হয়; জনসাধারণের নীতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সমাজের প্রচলিত ধারণা যাচাই করা হয়। নাগরিক হিসেবে শিক্ষকদেরও রাজনৈতিক বিশ্বাস রাখা এবং মতপ্রকাশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
আসল প্রশ্ন অন্য জায়গায়। শিক্ষকরা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে সক্রিয় দলীয় রাজনীতিক হয়ে উঠবেন? দলীয় লাইনে শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করবেন? রাজনৈতিক যোগাযোগের জোরে একাডেমিক ও প্রশাসনিক পদ চাইবেন?
জাতীয় সংকটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে রয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫০, ৬০ ও ৭০-এর দশকের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল প্রতিরোধ ও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে এগিয়ে নিতে শিক্ষকরা রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক অবদান। তাদের অনেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; বহু শিক্ষক-শিক্ষার্থী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন; শহীদ হয়েছেন দেশের অনেক শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী।
সেই রাজনীতির চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তখন প্রশ্ন ছিল না কোন দল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ করবে, কে উপাচার্য হবেন বা কোন গোষ্ঠী প্রশাসনিক সুবিধা পাবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সাড়া দিয়েছিলেন রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র ও জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের ঐতিহাসিক সংগ্রামে।
স্বাধীনতার পর দেশ গড়ার জন্য দরকার ছিল এমন বিশ্ববিদ্যালয়, যা জ্ঞান সৃষ্টি করবে, নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত করবে এবং জাতি গঠনের উপযোগী বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলবে। দুঃখজনকভাবে ধীরে ধীরে দলীয় রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের গভীরে ঢুকে পড়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় শিক্ষকদের পারস্পরিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলে। কখনও কখনও ক্ষমতার পদে নিয়োগেও। সমস্যা কোনো একটি দলে সীমাবদ্ধ নয়; একের পর এক সরকারের বিরুদ্ধেই নিজ রাজনৈতিক শিবিরের শিক্ষকদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

ক্ষমতা থেকে দূরে জ্ঞানচর্চা: আন্তর্জাতিক শিক্ষা
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা মেলে: একাডেমিক স্বাধীনতার জন্য ব্যক্তিজীবনে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকা জরুরি নয়। কিন্তু জ্ঞানচর্চাকে দলীয় ক্ষমতা থেকে আলাদা রাখা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে শিক্ষকরা রাজনীতিতে অংশ নিতে এবং বিতর্কিত মত প্রকাশ করতে পারেন। তবু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণভাবে পাঠদান ও গবেষণাকে দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে দূরে রাখতে চায়। ভারতে বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক ও ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তবে সেখানেও দেখা যায়, ক্যাম্পাস প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সম্প্রসারিত শাখায় পরিণত হওয়ার বিপদ কেমন।
সিঙ্গাপুরের মডেল ভিন্ন। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে চমৎকার অবস্থান অর্জন করেছে, কিন্তু একাডেমিক স্বাধীনতা তুলনামূলক সীমিত। রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয় এড়িয়ে চলা ও সেল্ফসেন্সরশিপের উদ্বেগের কথা সেখানে নথিভুক্ত। জাপানে আবার একাডেমিক পেশাদারিত্ব ও জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতার ওপর জোর দেওয়া হয়।
ব্যবস্থাগুলো আলাদা হলেও মূল শিক্ষা এক: শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এমন একটি সুরক্ষিত পরিসর দরকার, যেখানে পাঠদান, গবেষণা, নিয়োগ ও পদোন্নতি দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না।
রাজনৈতিক দলগুলোরও দায় আছে
দায় শুধু শিক্ষকদের নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকেও ভেবে দেখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকদের রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে তাদের কেন দরকার। উপাচার্য বাছাইয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য কেন গুরুত্ব পাবে? শিক্ষকদের সংগঠন কেন দলীয় লাইনে ভাগ হবে?
উপাচার্য নির্বাচিত হওয়া উচিত একাডেমিক যোগ্যতা, নেতৃত্ব গুণ, সততা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসনের প্রতি অঙ্গীকারের ভিত্তিতে; রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়। প্রতিটি নতুন সরকার যদি এক গুচ্ছ দলঘেঁষা শিক্ষককে সরিয়ে আরেক গুচ্ছকে বসায়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু একই ব্যবস্থা ভিন্ন রঙে বারবার তৈরি করবে।
শিক্ষকের সঠিক ভূমিকা ফিরিয়ে আনা
বাংলাদেশের দরকার রাজনৈতিকভাবে নীরব শিক্ষক নয়; বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীন শিক্ষক। কোনো শিক্ষক যদি এমন আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দায়িত্ব নেন, যার জন্য ব্যাপক দলীয় কার্যক্রম চালাতে হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব থেকে ছুটি নেওয়ার মতো একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকতে পারে। এতে রাজনৈতিক ও একাডেমিক দায়িত্বের সংঘাত এড়ানো যাবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষক নিয়োগ এবং উপাচার্য, ডিন, বিভাগীয় প্রধানসহ অন্য একাডেমিক নেতৃত্বের পদে নিয়োগের জন্য স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়া। এখানে মানদণ্ড হবে একাডেমিক মেধা, সততা ও নেতৃত্ব গুণ।
শিক্ষকদের উচিত নিজের কর্তৃত্ব ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের দলীয় রাজনীতিতে সংগঠিত বা প্রভাবিত করা থেকে বিরত থাকা। তাদের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের পরস্পরবিরোধী নানা ধারণার সঙ্গে পরিচিত করা এবং স্বাধীনভাবে বিচার করতে উৎসাহ দেওয়া।
স্বাধীনতার আগের যুগের মহান শিক্ষকরা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিলেন দলের কর্মী হিসেবে নয়। তারা তা করেছিলেন শিক্ষক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে; দেশের প্রয়োজনের সময় কথা বলার সাহস নিয়ে। এই ঐতিহ্যই ধরে রাখার মতো।
বাংলাদেশ যদি চায় তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাধীনচেতা, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল এমন এক প্রজন্ম তৈরি করুক, যারা দ্রুত বদলে যাওয়া বিশ্বে প্রতিযোগিতা করতে পারবে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিক্ষাদাতা, গবেষক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতা হিসেবে নিজেদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ফিরিয়ে নিতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্বাস ব্যক্তিগত অধিকার, কিন্তু একাডেমিক সততা পেশাগত দায়িত্ব।
এম এম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি; বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক
- বিষয় :
- শিক্ষা