আন্তর্জাতিক
গণতন্ত্রের ঘুরে দাঁড়ানোর বছর
ডেভিড ভ্যান রেইব্রুক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভিক্টর ওরবান, আলেক্সান্দার ভুচিচ এবং ফ্লাভিও বোলসোনারোর সাম্প্রতিক নির্বাচনী পরাজয় আমাকে ভাবতে বাধ্য করছে, শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সাল কি গণতন্ত্র ঘুরে দাঁড়ানোর বছর হয়ে উঠছে? এমনকি ইসরায়েলেও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোট তাদের সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে এবং সেখানে আরব দলগুলোর এক অভাবনীয় উত্থান দেখা গেছে।
এপ্রিলে হাঙ্গেরির এক অভাবনীয় নির্বাচনী ফলের মধ্য দিয়ে এই পট পরিবর্তনের সূচনা। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে শিকড় গেড়ে বসা স্বৈরশাসক ওরবানকে ক্ষমতাচ্যুত করেন বিরোধীদলীয় নেতা পেতার মাগার। সুদীর্ঘ ক্ষমতার বছরগুলোতে নিজের স্বৈরাচারী শাসন চিরস্থায়ী করে তা পাকাপোক্ত করতে যা যা করা সম্ভব; সবই করেছিলেন ওরবান। সংবাদমাধ্যম ছিল তাঁর পকেটে, বিচার বিভাগ ছিল তাঁর হাতের মুঠোয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাও পরিকল্পিতভাবে খর্ব করা হয়েছিল। অথচ মাগারের দলের চারপাশেই গড়ে ওঠে এক বিশাল নাগরিক আন্দোলন, যা তাঁকে হটিয়ে দিতে সফল হয়।
সার্বিয়ায় শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদ ও বিক্ষুব্ধ নাগরিকদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি তৃণমূলভিত্তিক জোট ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ অপ্রত্যাশিতভাবে ভুচিচকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ২০১৪ সাল থেকে কঠোর হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন ভুচিচ। প্রথমে প্রধানমন্ত্রী এবং পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এ বলয় গড়ে তুলেছিলেন। অতি ডানপন্থি বীরত্বপূর্ণ ভাবমূর্তি, আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং আইনের শাসনের প্রতি অবহেলার চেনা পরিচয়টি ছিল তাঁর সাম্প্রতিক বছরগুলোর সাফল্যের মূল সূত্র। কিন্তু নাগরিকদের সহ্য করারও তো একটা সীমা থাকে। সার্বিয়ার নোভি সাদ রেলস্টেশনের নবনির্মিত ছাদের ক্যানোপি ধসে ১৬ জনের মৃত্যু এবং এর ফলে ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী জনরোষ তৈরি হওয়ার পরই ভুচিচের পতন নিশ্চিত হয়ে যায়।
গত সোমবার এলো সবচেয়ে বড় খবরটি। সব ধারণা ভুল প্রমাণিত করে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। অনেক ব্রাজিলিয়ানই ফ্লাভিও বোলসোনারো তাঁর বাবার চেয়ে কোনো অংশে কম উগ্র ডানপন্থি নয়, এমন একটি প্রশাসনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছিলেন।
লুলার এই জয় লাতিন আমেরিকাজুড়ে ডানপন্থি পপুলিস্টদের বিজয়রথ থামিয়ে দিয়েছে– বিশ্লেষকদের এ কথা সত্য। কিন্তু একটু দূর থেকে সামগ্রিক চিত্রটা দেখলে এক বৃহত্তর প্রবণতা চোখে পড়ে। এটি মূলত বাম বনাম ডানের লড়াই নয়। বরং গণতন্ত্রপন্থি বনাম প্রান্তীয় গণতন্ত্র-উত্তরপন্থি বা পোস্ট-ডেমোক্র্যাটদের লড়াই। হাঙ্গেরির মাগার একজন মধ্য ডানপন্থি নেতা, যিনি একসময় ওরবানের দলেরই সদস্য ছিলেন। সার্বিয়ায় ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ জোটের নেতৃত্ব দিয়েছেন ইলিয়া সর্দানোভিচ, যিনি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে যুক্ত নন। মুক্ত সংবাদমাধ্যম এবং আইনের শাসনের মতো উদারনৈতিক মূল্যবোধকে সমর্থন করলেও কসোভোর ব্যাপারে তাঁর অবস্থান ঐতিহ্যগত সার্বীয় জাতীয়তাবাদের পক্ষেই। অর্থাৎ কসোভোর স্বাধীনতা থাকা উচিত নয়।
তবে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পার্থক্য সত্ত্বেও মাগার, সর্দানোভিচ এবং লুলার মধ্যে এই মৌলিক বিশ্বাসের জায়গায় মিল রয়েছে– গণতান্ত্রিক খেলার নিয়মগুলো অবশ্যই মেনে চলতে হবে। নির্বাচন হতে হবে অবাধ, বিচারক ও সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে এবং চেক অ্যান্ড ব্যালান্স বা ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।
আগামী বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি বৃহত্তম সদস্য রাষ্ট্র– ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি ও পোল্যান্ডের নির্বাচন। জার্মানির এএফডির আচরণ দেখলে বোঝা যায়, পোস্ট-ডেমোক্রেসি ঝোঁকসম্পন্ন ডানপন্থি পপুলিস্ট দলগুলো ইউরোপে বেশ ভালোভাবে সক্রিয়। আর খুব দ্রুতই স্পেনে পিপলস পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকারের অংশ হতে পারে ভক্স দলও। তবে হাঙ্গেরি, সার্বিয়া ও ব্রাজিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে– স্বৈরশাসকদের উত্থান এবং ক্ষমতায় তাদের দীর্ঘ অবস্থান প্রকৃতির কোনো অপরিবর্তনীয় নিয়ম নয়। খুব শিগগির হয়তো এই পোস্ট-ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্র-উত্তর দিনগুলোকেও পুরোনো ও অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে।
ডেভিড ভ্যান রেইব্রুক: বেলজিয়ান লেখক
এবং ‘অ্যাগেইনস্ট ইলেকশনস: দ্য কেস ফর ডেমোক্রেসি’ বইয়ের লেখক; দ্য গার্ডিয়ান
থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক