ই-রিকশা বিধিমালা
নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আছে, জবাবদিহি কোথায়
এম এম মুসা
এম এম মুসা
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৪ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০১৪ সালে হাইকোর্ট ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধ করেছিলেন। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চ বিআরটিএ এবং পুলিশকে নির্দেশ দিলেন অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক অবিলম্বে সরাতে। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সেই খবর ছেপেছিল। রাস্তা থেকে কিছুই সরেনি। বরং গলি-উপগলিতে বেড়েছে।
২০২৫ সালে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ একটা খসড়া তৈরি করে– ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’। আইটিভিবিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী সেখানে নিবন্ধন, চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স আর সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী জেল-জরিমানার বিধান থাকার কথা ছিল। কোন এলাকায় কত যান চলবে, সেটা ঠিক করার কথা ছিল স্থানীয় যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির।
এরপর ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫, স্থানীয় সরকার বিভাগ আলাদা একটি বিধিমালা জারি করল। গেজেট হলো ১৭ ডিসেম্বর। সেই পথ ধরে ২০২৬ সালে সিটি করপোরেশন আইনে সংশোধন এলো। ১৩ আগস্টের খবরে জানা গেল, স্থানীয় সরকার বিভাগ সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার জন্য সমন্বিত নীতিমালার উদ্যোগ নিয়েছে। আর ১৭ আগস্ট প্রতিমন্ত্রী বললেন, ই-রিকশার নিবন্ধনের দায়িত্ব বিআরটিএ আর পাবে না। দেবে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা।
দুই মন্ত্রণালয়, এক যান
ই-রিকশা কার? সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের, নাকি স্থানীয় সরকার বিভাগের? আমাদের দেশে যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস, চালকের লাইসেন্স– এসব সামলায় বিআরটিএ। এর ভিত্তি সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮। এই আইন সংসদে পাস হয়েছে। কিন্তু সরকার এখন ই-রিকশাকে সেই কাঠামোর বাইরে নিয়ে গেছে। প্রতিমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এসব যানের নিবন্ধন আর বিআরটিএ দেবে না। এখন থেকে তা দেবে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা। তিনি বলেছেন, জাতীয় সংসদে এ-সংক্রান্ত আইন পাস হয়েছে।
ঠিক আছে। আইনি ভিত্তি তাহলে আছে। কিন্তু একটা বাস্তব প্রশ্ন বাকি থাকে। বিআরটিএর হাতে দেশজুড়ে নিবন্ধন, ফিটনেস ও লাইসেন্সের একটা অবকাঠামো আছে। সেটা বাদ দিয়ে ১৩টি সিটি করপোরেশন আলাদা করে সবকিছু গড়বে? প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, এই ব্যবস্থা শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে। দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা আর সব উপজেলায়।
এই বিধিমালা শুধু সিটি করপোরেশনের জন্য। পৌরসভা ও উপজেলার জন্য এখনও সমন্বিত নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। তার মানে, এই বিধিমালা এক শহরে নিবন্ধিত গাড়িকে অন্য শহরে বাণিজ্যিকভাবে চলতে দেয় না (বিধি ৪(৯))। অথচ শহরের বাইরে সেই গাড়ির কী হবে, গেজেটে কিছু নেই। চট্টগ্রামে নিবন্ধিত রিকশা কোনো পৌরসভা এলাকায় ঢুকলে কোন আইন? পৌরসভার বিধিমালা তো এখনও নেই।

নিবন্ধকের ভূমিকায় ফি-র মালিক
এবার একটা কাঠামোগত সমস্যা। সিটি করপোরেশন কী কী করছে এই বিধিমালায়? সংখ্যা ঠিক করছে। নিবন্ধন দিচ্ছে বা না দিচ্ছে। ফি নিচ্ছে। জোন বানাচ্ছে। রুট ঠিক করছে। রঙ ঠিক করছে। পার্কিং এলাকা ঠিক করছে। চার্জিং পয়েন্টের লাইসেন্স দিচ্ছে। আর তপশিল-২ এর টীকায় লেখা– নিবন্ধন ও নবায়ন ফি বাবদ প্রাপ্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় হিসেবে গণ্য হবে।
যিনি সংখ্যা সীমিত করছেন, তিনিই ফি তুলছেন। যিনি আবেদন নাকচ করছেন, তাঁর ওপরের কর্তৃপক্ষই আপিল শুনছেন, আর সেই সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, নীতিমালার আওতায় স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা হবে। একে বলে স্বার্থের সংঘাত। সংখ্যা ঠিক করার ক্ষমতা আর ফি তোলার ক্ষমতা আলাদা থাকা উচিত। অন্তত আপিল হওয়া উচিত স্বাধীন কোথাও।
কমিটি; যেখানে যারা চালান তারা নেই
বিধি ১৬ আর ১৭। ই-রিকশা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনে সুপারিশ করবে একটি কমিটি। সদস্য সাতজন। স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব, সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী, পুলিশের প্রতিনিধি, বুয়েটের দুজন, জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি, আর একজন উপসচিব।
সবাই সরকারি প্রতিষ্ঠানের লোক। চালকদের কোনো সংগঠনের প্রতিনিধি নেই। যাত্রীস্বার্থের কেউ নেই। প্রস্তুতকারক বা ব্যাটারি খাতের কেউ নেই। বিদ্যুৎ বিভাগ নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর নেই। বিআরটিএ-ও নেই। অথচ যে যান নিয়ে এই কমিটি, তার গোড়াতেই আছে সড়ক নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, পরিবেশ আর জীবিকা।
কমিটি প্রয়োজনে সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে। কিন্তু ‘পারবে’ মানে ‘করবেই’ নয়। যার ক্ষমতা আছে, সে সাধারণত নিজের পছন্দের লোক ডাকে। আর যাদের জীবিকা এই বিধিমালার সিদ্ধান্তে ঠিক হবে, তারা ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন। এমন কমিটির সুপারিশ জনগণ গ্রহণ করবে কেন?
শাস্তি নেই
এবার বিধি ১৯। শিরোনাম ‘অপরাধ ও দণ্ড’। দণ্ড বলতে কিছু নেই। আছে শুধু অপরাধের তালিকা– নিবন্ধন ছাড়া চালানো, অনুমোদিত গতি অতিক্রম, অতিরিক্ত যাত্রী, অননুমোদিত ব্যাটারি, মোটর বা কাঠামোর পরিবর্তন, নিষিদ্ধ এলাকায় চালানো, বিপজ্জনকভাবে চালানো, যাত্রী ছাড়া মালপত্র পরিবহন, সিগন্যাল অমান্য, দুর্ঘটনার পর পালানো এবং শেষে ‘আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে’।
কোন আইন? কোন ধারা? কত জরিমানা? কত দিনের কারাদণ্ড? বিচার কোথায়? বিধিমালা বলেনি। বিধি ৬(৩) অবশ্য বলেছে, মেট্রোপলিটন ট্রাফিক বিভাগ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যৌথভাবে বা পৃথকভাবে ‘অবৈধ ই-রিকশা চলাচল বন্ধের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নিতে পারবেন। ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’। কী ব্যবস্থা? জব্দ? জরিমানা? ভ্রাম্যমাণ আদালত? কিছুই বলা নেই।
আইনের একটা মৌলিক নীতি আছে– শাস্তি আগে থেকে জানা থাকতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদও বলে, অপরাধ ঘটার সময় বলবৎ আইন ভঙ্গ ছাড়া কাউকে দণ্ড দেওয়া যাবে না; আর আইনে নির্ধারিত শাস্তির চেয়ে বেশি দণ্ডও দেওয়া যাবে না। নইলে ক্ষমতা ব্যক্তির মর্জির হাতে চলে যায়। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন করি, যে বিধিতে শাস্তির পরিমাণই নেই, সেটাকে ‘প্রয়োগযোগ্য’ বলব কীভাবে?
আরও একটা কথা। বিধি ৭(১) বলছে, জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিআরটি করিডোর এবং ‘প্রশাসন কর্তৃক সময় সময় নিষেধাজ্ঞা আরোপিত সড়ক’-এ ই-রিকশা চলবে না। সময় সময়। যে কোনো সময়। যে কোনো সড়ক। কোনো প্রক্রিয়া নেই, কোনো বিজ্ঞপ্তির নিয়ম নেই, কোনো আপত্তির সুযোগ নেই।
ভারত যেভাবে করেছিল
২০১৪ সালের জুলাইয়ে দিল্লি হাইকোর্ট রাজধানীতে ই-রিকশা নিষিদ্ধ করেছিলেন। কারণ ই-রিকশা সেখানে আইনি যান হিসেবে স্বীকৃতই ছিল না। ডেকান হেরাল্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই বছরের ১ অক্টোবর কেন্দ্রীয় সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে ই-রিকশাকে আইনি মর্যাদা দিল। সংজ্ঞা হলো, তিন চাকার বিশেষ উদ্দেশ্যের ব্যাটারিচালিত যান, সর্বোচ্চ চারজন যাত্রী আর ৪০ কেজি মালপত্র, মোটরের ক্ষমতা ২০০০ ওয়াটের বেশি নয়, সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক।
তারপর ২০১৫ সালে ভারতের সংসদ মোটর ভেহিক্যালস (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট পাস করল। পিআরএস ইন্ডিয়ার সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, এতে ই-রিকশাকে মূল আইনের অধীনে আনা হলো, সর্বোচ্চ ৪০০০ ওয়াট ক্ষমতা পর্যন্ত। চালকের লাইসেন্স দেওয়ার শর্ত বিধিতে ঠিক করার ক্ষমতাও যুক্ত হলো। আর ২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় প্রজ্ঞাপনে ই-রিকশা পারমিটের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হলো, যাতে রাজ্যে রাজ্যে ঝামেলা কমে। আমাদের গেজেটে গতিসীমা আছে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। যাত্রী দুই বা চার। কিন্তু মোটরের ক্ষমতার কোনো সীমা নেই। মালপত্রের নির্দিষ্ট ওজন নেই। চালকের লাইসেন্স নিয়ে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই।
শেষ কথা হলো, সরকার অন্তত তিনটি কাজ করুক। এক. আইনের ভিত মজবুত করতে হবে। দুই. ক্ষমতা ভাগ করা হোক। যিনি সংখ্যা ঠিক করেন, তিনি ফি রাখবেন না। আপিল হবে স্বাধীন কোনো ট্রাইব্যুনাল বা অন্তত নিরপেক্ষ কমিটিতে। তিন. প্রতিটি অপরাধের পাশে নির্দিষ্ট দণ্ড লেখা থাকতে হবে।
এম এম মুসা: গবেষক ও সাংবাদিক
- বিষয় :
- মতামত