ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

আইইডিসিআরে মব সহিংসতা

প্রশাসন দলীয়করণের কুফল

প্রশাসন দলীয়করণের কুফল
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালকের ওপর হামলার ঘটনাটি শুধু মব সহিংসতার প্রাবল্যই প্রকাশ করে নাই; সরকারি প্রশাসনের বিশৃঙ্খল চেহারাও উন্মোচিত করিয়াছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, বুধবার সকালে আইইডিসিআরের পরিচালক যখন তাঁহার কার্যালয়ে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সহিত বৈঠক করিতেছিলেন, তখন কয়েক ব্যক্তি তাঁহার উপর হামলা চালায়। জানা গিয়াছে, আইইডিসিআরের পরিচালকের ন্যায় তাঁহার উপর হামলাকারীরাও ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) নেতা। উপরন্তু সম্প্রতি স্বাস্থ্য বিভাগের একটি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হইয়া যায়, যাহার দায়িত্বে ছিলেন হামলার দায়ে অভিযুক্ত ডা. জাহিদ হাসান এবং তিনি প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য উক্ত পরিচালকের উপর চাপ সৃষ্টি করিয়াছিলেন। সম্ভবত স্বীয় উদ্দেশ্য পূরণ না হইবার হতাশাজনিত কারণেই উক্ত হামলার ঘটনা ঘটে। ইহা অনস্বীকার্য, সরকারি প্রশাসনে কর্মরতগণের যে প্রকার নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে থাকিবার কথা, উহা বজায় থাকিলে উক্ত হামলার ঘটনাটি হয়তো ঘটিত না। ইহাও বলা প্রয়োজন, বিশেষত বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেভাবে দেশের প্রায় সর্বত্র মব সহিংসতার বিস্তার ঘটিয়াছিল, যাহা হইতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, থানা এবং সরকারি দপ্তরও মুক্ত ছিল না; উক্ত অনভিপ্রেত ঘটনা উহারই ধারাবাহিকতা মাত্র। আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি, উক্ত সময়ে সরকারি চাকুরিতে পদায়ন, বদলি ও বরখাস্তের সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি থাকিলেও সেইগুলির কোনো প্রকার তোয়াক্কা না করিয়া ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠী মব সহিংসতার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও কর্মরত বিভিন্ন ব্যক্তিকে তাড়াইয়া দিয়া সংশ্লিষ্ট পদে স্ব স্ব পছন্দের ব্যক্তিদের অধিষ্ঠিত করিয়াছেন। প্রতিকারপ্রত্যাশী ভুক্তভোগীদের বারংবার আবেদন যদ্রূপ তৎকালীন শাসকদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে নাই, তদ্রূপ সচেতন মহলের এহেন বর্বরতা বন্ধের আহ্বানও উপেক্ষিত হইয়াছে। যাহা দুঃখজনক, বর্তমান সরকার মব সহিংসতা বন্ধ, তৎসহিত রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানে নিয়মশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়া ক্ষমতাসীন হইলেও তাহা অদ্যাবধি এক প্রকার বাগাড়ম্বর হিসাবেই রহিয়াছে। এহেন পরিস্থিতিতে নির্বাচিত সরকারের সময়েও সর্বক্ষেত্রে পেশি প্রদর্শনে উৎসাহিত হওয়া অস্বাভাবিক নহে।

আলোচ্য ক্ষেত্রে প্রশাসনের দলীয়করণও ভূমিকা রাখিয়াছে বলিয়া আমরা মনে করি। যে কোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দিলে উহার পরিণতি কী হয়, তাহা আমরা অতীতে বহুবার প্রত্যক্ষ করিয়াছি। উহার বিষময় ফলে একদিকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্য ও সেবার মান হ্রাস পায়, অন্যদিকে ক্ষমতাঘনিষ্ঠ পেশাজীবী সংগঠনে উপদলীয় কোন্দল চাঙ্গা হইয়া উঠে, যাহা অনেক সময় সংঘাত-সংঘর্ষের রূপ পরিগ্রহ করে।

প্রসঙ্গত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ইতোপূর্বে অনুরূপ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়াছে। গত জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগের পরিচালক হিসাবে ডা. এসএম মনিরুজ্জামানের নিয়োগ ঘিরিয়া বিরোধে সংশ্লিষ্ট হন ড্যাবের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। এমনকি ড্যাবের বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতাল শাখার সভাপতি ডা. নজরুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বে উক্ত পরিচালককে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়, যাহাকে মব সহিংসতারূপে আখ্যা দিয়াছিলেন সংগঠনটির অন্য অংশের নেতৃবৃন্দ। যাহা হতাশার, উক্ত ঘটনায় প্রশাসনিক তো নহেই, সাংগঠনিক পন্থায়ও দোষীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয় নাই, যাহা বুধবারের ঘটনার হোতাদের অনুরূপ অপরাধ সংঘটনে উৎসাহ দিতে পারে।
আমাদের প্রত্যাশা, এই সকল প্রবণতা রোধে সরকার অবিলম্বে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে। উহার অংশ হিসাবে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে আলোচ্য ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হইবে। সর্বোপরি, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্বাস্থ্য বিভাগ তো বটেই, সমগ্র সরকারি প্রশাসনকে পুনর্বিন্যাসে দলীয় প্রভাবমুক্ত করিয়া মেধা ও যোগ্যতাকে ভিত্তি ধরিতে হইবে।
 

আরও পড়ুন

×