ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

মানিক পশারীর মৃত্যু কি রাজনীতির নির্মম মুখ

মানিক পশারীর মৃত্যু কি রাজনীতির নির্মম মুখ
×
×

হুমায়ূন আহমেদ শ্রাবণ

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

পিরোজপুরের শংকরপাশায় বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন ঘিরে ওঠা অভিযোগকে হালকা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছে– তারই প্রমাণ ওই ঘটনা। 

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন মানিক পশারী। তাই গত সোমবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ২৪ অক্টোবর শনিবার তাঁর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানে বাধা দিয়ে মরদেহ আটকে রাখা হয়। পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা এবং কবর ভরাট করে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁর মেয়ে ও দুই বোন রাতের অন্ধকারে কবর খুঁড়ে দাফনের ব্যবস্থা করেন। আর স্থানীয় বাসিন্দারা এসব কিছুর জন্য জামায়াত নেতাকর্মীদের দায়ী করেছেন।
কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান, আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য কিংবা অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে বিরোধ থাকলে তাঁর শান্তিপূর্ণভাবে শেষ বিদায়ের অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না। এটি শুধু একটি পরিবারের প্রতি নিষ্ঠুরতা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক ভিত্তির ওপরেও আঘাত।

কবরের মাটিতেও প্রতিহিংসার ছায়া
মানিক পশারীর দাফন ঘিরে তাদের ঘটানো ঘটনাবলির পর জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠতেই পারে– রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় না গিয়েই এই অবস্থা! ক্ষমতায় গেলে কী করবে তারা? মানিক পশারীর বিরুদ্ধে জামায়াত নেতাকর্মীরা যে ‘মিথ্যা সাক্ষ্য’ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন, তার নিষ্পত্তি তো আদালতে হবে; কবরস্থানে নয়। আদালতের রায় ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন কি নিজেই সাক্ষীর সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করে সামাজিক শাস্তি দেওয়ার অধিকার রাখে? 

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সাক্ষীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অথচ সমকালের প্রতিবেদনে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার শহিদুল হক চান বলেছেন, মানিক পশারী গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা। আর কারও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের সত্যায়নের দায়িত্ব নিশ্চয় জামায়াত নেতাদের নয়। এ পরিচয় সংক্রান্ত বিতর্কের নিষ্পত্তি অবশ্যই সরকারি নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। সর্বোপরি কারও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তাঁর দাফনের অধিকার এবং পরিবারের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার কোনো বৈধতা তৈরি হয় না।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্ম, স্বাধীনতা এবং নাগরিক মর্যাদার ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যে কোনো বিতর্কের সমাধান হতে হবে তথ্য ও প্রমাণের মাধ্যমে। রাজনৈতিক বিরোধের কারণে কাউকে হেয় করা কিংবা তাঁর পরিবারকে সামাজিক চাপের মুখে ফেলার অভিযোগ স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
মানিক পশারীর ঘটনা একই সঙ্গে সাক্ষীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। অতীতে কোনো রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তি যদি পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কায় থাকেন, তবে ভবিষ্যতে অন্য সাক্ষীরা ন্যায়বিচারের স্বার্থে সত্য বলতে কতটা সাহস পাবেন? ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে যারা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের নিরাপত্তাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আজ জামায়াতের কোনো নেতার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তির নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হলে আগামীকাল অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তি একই ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাই আলোচ্য ঘটনাকে নিছক একটি রাজনৈতিক বিরোধের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা, সাক্ষীর নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের প্রশ্ন। 
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়, মানবিকতাই বা কোথায়?

কোনো ব্যক্তির জানাজা ও দাফন ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি মানবিক মর্যাদারও বিষয়।  
স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মী যারা মানিক পশারীর দাফনে বাধা দিয়েছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন, কোন রাজনৈতিক আদর্শ একজন মৃত মানুষের শেষ আশ্রয় নিয়েও বিরোধ তৈরি করতে শেখায়? কোন নৈতিকতা একটা শোকাহত পরিবারকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে? আর যদি জামায়াতের দাবি অনুযায়ী তারা এ ঘটনায় জড়িত না থাকে, তাহলে সেই দাবি প্রমাণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করাই হবে দায়িত্বশীল আচরণ।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রেরও জবাবদিহি প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত পুলিশের উপস্থিতিতে মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। কিন্তু মরদেহ দীর্ঘ সময় অ্যাম্বুলেন্সে পড়ে থাকার অভিযোগের কারণ কী? প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও, চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য এবং প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটতেই পারে। কিন্তু ক্ষমতা বদলের সঙ্গে প্রতিশোধের সংস্কৃতি চলতে থাকলে নাগরিকের নিরাপত্তা কখনও নিশ্চিত হবে না। জামায়াতে ইসলামীসহ সব রাজনৈতিক সংগঠনকে বুঝতে হবে– গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিরোধী মতকে সহ্য করা দুর্বলতা নয়; বরং রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচায়ক। ধর্ম, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ন্যায়বিচারের ভাষা ব্যবহার করলেই কোনো সংগঠন সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে যায় না। তার কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন হতে হবে অধিকার, মানবিকতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে।

মানিক পশারীর দাফন ঘিরে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। তাঁর পরিবার ন্যায়বিচার পাক। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বেরও দায়িত্ব রয়েছে নিজেদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ বিষয়ে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য বক্তব্য দেওয়া এবং কোনো অন্যায় হয়ে থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
রাজনীতি মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য; প্রতিপক্ষকে মৃত্যুর পরও অপমান করার জন্য নয়। যে রাজনীতি মানুষের শেষ বিদায়ের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, তার নৈতিক ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। মানিক পশারীর কবর ঘিরে ওঠা অভিযোগ তাই শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মানবিকতা, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরীক্ষাও। প্রশ্ন একটাই, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করার শিক্ষা কি আমাদের রাজনীতি কোনোদিন গ্রহণ করবে? করলে তা কবে?

হুমায়ূন আহমেদ শ্রাবণ: পর্তুগালপ্রবাসী সাংবাদিক ও গবেষক

আরও পড়ুন

×