ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

উচ্চ মাধ্যমিকের ফল বিপর্যয়

দায় কেবল শিক্ষার্থীর নহে

দায় কেবল শিক্ষার্থীর নহে
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের দায় প্রধানত শিক্ষার্থীদের উপর চাপাইবার প্রবণতা দেখিয়া উদ্বেগ হইতেছে, মূল সংকট আবারও উপেক্ষিতই না রহিয়া যায়! গত ২২ বৎসরের মধ্যে পাসের সর্বনিম্ন হারের পশ্চাতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, সামাজিক অস্থিরতা ও কঠিন প্রশ্নপত্রের ন্যায় প্রসঙ্গসমূহও আসিয়াছে। তথাপি অভিযোগের তীরখানি শিক্ষার্থীদের দিকেই নিক্ষিপ্ত। অথচ অকৃতকার্য প্রায় ছয় লক্ষ শিক্ষার্থীর মধ্যে ইংরেজি ও আইসিটিতে অনুত্তীর্ণ প্রায় চার লক্ষ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার সহিত এই দুই বিষয়ের দুর্বলতা জড়িত। তজ্জন্য দায় কেবল শিক্ষার্থীদের? নাকি উহার নেপথ্যে রহিয়াছে পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষক সংকটের দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা? 

মাধ্যমিক পর্যায়ের সরকারি বিদ্যালয়ে প্রায় তিন সহস্র এবং এমপিওভুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ৭৭ সহস্রাধিক শিক্ষকের পদ শূন্য বলিয়া জানাইতেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। প্রায় চার সহস্র বিদ্যালয়ে আইসিটি এবং আড়াই সহস্রাধিক বিদ্যালয়ে ইংরাজির শিক্ষক নাই। শিক্ষক ব্যতীত বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা গড়িয়া উঠিবে কী প্রকারে? একদিকে বিষয় বাধ্যতামূলক করা, অন্যদিকে শিক্ষক নিয়োগ ও পাঠদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা– এই স্ববিরোধিতার দায় শিক্ষা প্রশাসন উপেক্ষা করিতে পারে না। ইংরাজিতে দুর্বলতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অত্যন্ত প্রাচীন সমস্যা। বৎসরের পর বৎসর ইংরাজি পাঠেও শিক্ষার্থীদের বৃহৎ অংশ ভাষাটি ব্যবহার করিতে পারে না। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার কারণে ভাষাগত দক্ষতাও তৈয়ার হইতেছে না। অপরদিকে, ২০১৩ সালে আইসিটি বাধ্যতামূলক করা হইলেও অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে এই বিষয়ে পৃথক শিক্ষক পদই সৃষ্টি করা হয় নাই। আইসিটি বিষয়ে ৮০ শতাংশের অধিক শিক্ষকের মূল ডিগ্রিও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নহে। অর্থাৎ যেই বিষয়ে দক্ষতা অর্জন জরুরি, সেই বিষয়েই শিক্ষার্থীরা যথাযথ শিক্ষক ও পাঠদান হইতে বঞ্চিত।

এইবারের পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যসূচিতে পরীক্ষা গ্রহণ এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে নিরপেক্ষতার উপর গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছিল। পাসের হার কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি করিবার সংস্কৃতি হইতে বাহির হইয়া আসা ইতিবাচক নিশ্চয়। কিন্তু কঠোর মূল্যায়ন মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নহে। শিক্ষার্থীদের নিকট প্রত্যাশিত মান দাবি করিবার পূর্বে সেই মান অর্জনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করিতে হইবে। এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের কেবল ওই বিষয়সমূহে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দিবার সিদ্ধান্তও দৃশ্যত ইতিবাচক। উহাতে অনেক শিক্ষার্থীর জীবন হইতে একটি বৎসর ঝরিয়া পড়িবে না; সত্য। তবে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দিয়া মূল সংকট আড়াল করা যাইবে না। এই যুক্তিও আমলযোগ্য, শিক্ষার্থীদের ফলের মূল্যায়ন হইলে শিক্ষক, প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষা প্রশাসনের দক্ষতারও মূল্যায়ন প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ হইলে তাহাদের জবাবদিহি করিতে হইতেছে। অথচ যাহাদের দায়িত্ব মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, তাহারা দায়মুক্ত থাকিবেন কেন?

এই বৎসরের ফল বিপর্যয় তাই কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা নহে; শিক্ষাব্যবস্থারও ব্যর্থতা। প্রয়োজন ফলের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা। কোন বিষয়ে, কোন অঞ্চলে এবং কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা পশ্চাতে রহিতেছে, তাহা চিহ্নিতকরণ আবশ্যক। শূন্য শিক্ষক পদ দ্রুত পূরণ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের কার্যকর তদারকি নিশ্চিতকরণ অতীব জরুরি। ইংরাজি ও আইসিটিতে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস, ব্যবহারিক শিক্ষা ও বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করিতে হইবে। ফল বিপর্যয়ের পর শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা লইয়া আলোচনা সহজ। কিন্তু সেই ব্যর্থতার নেপথ্যের প্রাতিষ্ঠানিক দায় স্বীকারই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। শুধু পরীক্ষার খাতা নহে; এইবার শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব পালনের খাতাও পর্যালোচনা করিতে হইবে।

আরও পড়ুন

×