ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র

ট্রাম্পবাদের মৃত্যুঘণ্টা শেষ পর্যন্ত বেজে গেছে

ট্রাম্পবাদের মৃত্যুঘণ্টা শেষ পর্যন্ত বেজে গেছে
×
×

ভোটাররা ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি নিজেদের অসন্তোষের বার্তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন

মোইরা ডনিগান

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | ২১:০৭

কম প্রত্যাশার মধ্যেও এক ধরনের স্বস্তি থাকে। মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক মনে হচ্ছিল যে, নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা কৌতুক করে বলতে শুরু করেছিলেন–এই ফলাফলের অর্থ হয় ট্রাম্প যুগের অবসান, নয়তো জনমত জরিপ পেশারই কবর রচনা। 
এ ধরনের পূর্বাভাসের পর রিপাবলিকানদের যে কোনো জয়কেই একপ্রকার অলৌকিক ঘটনা বলে মনে হতো। ধারণা করা হচ্ছিল ডেমোক্র্যাটরা বড় ধরনের জয় পাবে; আর রিপাবলিকানরা শেষ পর্যন্ত মিশ্র ফলের আশায় নিজেদের মতো করে এমনভাবে প্রচার চালাত যেন তারা সবার ধারণার চেয়েও ভালো করেছে। কিন্তু আজকের দিনে সেই আত্মপক্ষ সমর্থন বা প্রচার চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। ভোটাররা দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি নিজেদের অসন্তোষের বার্তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন এবং তাঁর ক্ষমতা খর্ব করার পক্ষেই জোরালো রায় দিয়েছেন।
এখন সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্ট ও তাঁর মন্ত্রিপরিষদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাতে পারবে, নিজেদের এজেন্ডাগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারবে, কংগ্রেসের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে এবং রিপাবলিকানদের বিচারক নিয়োগের পথ আটকে দিতে পারবে। আগামী দিনে ট্রাম্প একদিকে বলবেন, রিপাবলিকানদের এই পরাজয় ভুয়া– ডেমোক্র্যাট এবং অবৈধ অভিবাসীদের কোনো এক অপকৌশলী ষড়যন্ত্রের ফল; অন্যদিকে বলবেন ফলাফল সত্যি, তবে এর জন্য অন্য কেউ দায়ী। 
ট্রাম্প প্রশাসন গত কয়েক সপ্তাহে এমন ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, তারা বিশেষ করে আলাস্কার মতো হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সিনেট আসনগুলোর ফলাফল চ্যালেঞ্জ করতে পারে। তবে আপাতত সেই পরিকল্পনার পালে হাওয়া হয়তো ফুরিয়ে এসেছে। মঙ্গলবারে ট্রাম্প নিউইয়র্ক টাইমসকে যাই বলুন না কেন–যার মূল্য আসলে খুব বেশি কিছু নয়। তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবেন বলে জানিয়েছেন। নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, তিনি মাইকের সামনে ক্ষোভ ঝাড়বেন এবং সামাজিকমাধ্যমে বড় হাতের অক্ষরে অভিযোগের সুর তুলবেন; তবে এর কোনোটিই খুব একটা প্রভাব রাখবে না। কারণ, মঙ্গলবার রাতে– ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে এক নাটকীয় জয়ের ঠিক ১০ বছর পর ট্রাম্প যুগের বাস্তবিকই অবসান ঘটল।
পরবর্তী দুই বছর আগের চেয়ে পুরোপুরি আলাদা হতে হবে। ক্ষমতায় ফিরে আসার পর প্রথম কয়েক মাস যখন সরকারের ওপর তাঁর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল, তখন ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হচ্ছিল যে, ২০২৪ সালে ব্যাপক সাংস্কৃতিক অসন্তোষ এবং পদ্ধতিগত বৈষম্যবিরোধী মনোভাবের ওপর ভর করেই তিনি পুনরুত্থান ঘটিয়েছেন। তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখে মনে হচ্ছিল আমেরিকায় নিজের কর্তৃত্ববাদী শাসন পাকাপোক্ত করতে তিনি বুঝি সফল হবেন। ফেডারেল আমলাতন্ত্রে ছাঁটাই করে শত শত চাকরি বাতিল করেছিলেন এবং হাজার হাজার পদে নিজের অনুগত ও অযোগ্য চাটুকারদের বসিয়েছিলেন। বড় প্রযুক্তি কোম্পানি থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও তিনি নিজের স্বেচ্ছাচারিতা ও সামাজিক এজেন্ডা চাপিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ, প্রতিষ্ঠানগুলো এই ভয় পেয়েছিল যে, অবাধ্য হলে তাদের শক্তিশালী ট্রাম্প প্রশাসনের রোষানলে পড়তে হবে।
তিনি কংগ্রেসের কাছ থেকে থলে থেকে মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া কোনো পকেটমার বা ছিনতাইকারীর মতো অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিজের মুঠোয় নিয়েছিলেন এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ইচ্ছাকে পাত্তা না দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো করদাতাদের অর্থ তছরুপ করেছিলেন। আর তিনি এই কাজগুলো করতে পেরেছিলেন– এই সব করার ক্ষমতা তাঁর হয়েছিল। কারণ তাঁকে একদিকে শক্তিশালী মনে হচ্ছিল এবং অন্যদিকে তাঁর বিরোধীদের দুর্বল মনে হচ্ছিল। দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরজুড়ে তাঁর বাজি ছিল যে, তিনি মানুষকে মান্য করাতে পারবেন। কারণ তিনি অবাধ্যতার পরিণতি ভোগ করার হুমকি দিতে পারতেন, অথচ ডেমোক্র্যাটরা অনুগত থাকার বিরুদ্ধে কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিণতি বা শাস্তির হুমকি দিতে পারত না।
সেই শক্তির ভারসাম্য এখন উল্টে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৪ সালের পুনর্নির্বাচনকে এখন আর কোনো ব্যাপক সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ফল বলে মনে হয় না, বরং মনে হয় মুদ্রাস্ফীতির মতো বাস্তব কিছু বস্তুগত পরিস্থিতির ফল। সেই একই বস্তুগত বিষয়গুলো এখন রিপাবলিকানদের ওপর উল্টো আঘাত হানছে; যখন আকাশচুম্বী গ্যাসের দাম, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, স্থায়ী বেকারত্ব এবং দৃশ্যমান ও প্রকট বৈষম্য ভোটারদের ক্ষুব্ধ করে তুলছে।
উত্তরাধিকারপ্রত্যাশী উচ্চাভিলাষী এবং তরুণ রিপাবলিকানরা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষার তাগিদে তারা তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করবে; আর তিনি কোনো এক বোকা রাজা লিয়ারের মতো তাদের বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করবেন এবং তাদের বিরুদ্ধে নিজের সমর্থকগোষ্ঠীকে একত্র করার চেষ্টা করবেন। তবে মঙ্গলবারের রাতের পর রাজা তৈরি করা বা প্রতিশোধ নেওয়ার তাঁর সেই চেষ্টা অনেকটাই দুর্বল হয়ে যেতে পারে। 
ট্রাম্পের শক্তি সবসময়ই ছিল রিপাবলিকান তৃণমূলের ওপর তাঁর তথাকথিত প্রভাব, তাঁর ক্যারিশমা ভোটারদের অন্ধের মতো যে কোনো জায়গায় অনুসরণ করতে বাধ্য করার ক্ষমতা। মঙ্গলবারের ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের ব্যবধান যদি কোনো ইঙ্গিত হয়ে থাকে, তবে মানুষ আর তাঁর পিছু হাঁটছে না।

মোইরা ডনিগান: গার্ডিয়ানের আমেরিকাবিষয়ক কলাম লেখক; দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 
 

আরও পড়ুন

×