ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

সাক্ষীর নিরাপত্তা

সত্য বলার শাস্তি অনেক

সত্য বলার শাস্তি অনেক
×
×

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৮ | আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | ১১:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুনামগঞ্জের শাল্লার দুলাল মিয়ার কপাল ভালো, তাঁর বসতবাড়ি ও নতুন তৈরি দোকানে শুধু ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। শিশুসহ পরিবারের কয়েকজন আহত হলেও দুলাল মিয়াকে অন্তত প্রহারের চোটে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হয়নি। অথবা পিরোজপুরের মানিক পশারীর সন্তানদের মতো পিতার কবরের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়নি তাঁর সন্তানদের। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মামুদ আলীর ছেলে দুলাল মিয়ার এই ‘সৌভাগ্য’ মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশে অপরাধীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। 

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেওয়া পিরোজপুরেরই মুস্তফা হাওলাদারকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে প্রাণ দিতে হয়েছিল আততায়ীদের হাতে। সাক্ষ্য দেওয়ার অপরাধে কারও বাড়িঘর ভাঙচুর হয়, কারও শেষ বিদায়ের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, আবার কাউকে দিতে হয় নিজের প্রাণ। 

দুলাল মিয়া ২০১৬ সালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। সমকালের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে শাল্লার কয়েক গ্রামে যে কজন সাক্ষী দিয়েছিলেন, তাদের অধিকাংশই ভয়ে বাড়িছাড়া। তাদের নামে বিভিন্ন সময়ে আবার উল্টো নানা রকম অভিযোগ আনা হয়েছে। আতঙ্কে ছিল দুলাল মিয়ার পরিবারও। অপরাধীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া যখন অপরাধে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্রে ন্যায়বিচারের পথ কতটা সংকীর্ণ– বুঝতে অসুবিধা হয় না।

সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা অবশ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রভাবশালী আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া কিংবা ক্ষমতার সমীকরণে দুর্বল অবস্থানে থাকা দুই ক্ষেত্রেই সাক্ষীর জীবন বিপন্ন হয়ে উঠছে। ১ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে এক পরিবার। তাদের অসহায়ত্বের প্রতীক হয়ে আছে পাঁচ বছরের জান্নাতুলের ছবি। ন্যাড়া মাথায় কপালের মাঝখানে আদরের কালো টিপ, গোলাপি জামা, হাসিমুখের ছোট্ট শিশুটির নিষ্পাপ দৃষ্টি প্রাণ পূর্ণ করে দেয়। অথচ সেই সোনার কন্যার মরদেহ পাওয়া গেছে ধানক্ষেতে। বাবা মো. আর্শাদ মিয়ার ভাষ্য, মেয়ের শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল; হাত-পায়ের মাংসও আলাদা করা ছিল। গলায় ও মুখে গামছা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় মরদেহ। এই ঘটনা কীভাবে সহ্য করেছেন জান্নাতুলের বাবা-মা; তারাই জানেন। এখন এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান আসামি জামিনে বের হয়ে হুমকি দিচ্ছে নিহত শিশুর পরিবারকে। সন্তান হারানো পরিবারটি এই রাষ্ট্রের কাছে কীভাবে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করবে এরপর?

পাঠকের মনে থাকবে ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে দিনদুপুরে ইট-পাথর দিয়ে থেঁতলে একজনকে হত্যার সেই ভিডিওর কথা। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে গিয়েছিল মধ্যযুগীয় কায়দায় হত্যার সেই দৃশ্য। ব্যবসায়ী সোহাগ (লাল চাঁদ) হত্যাকাণ্ডের সে বিচার প্রক্রিয়া গত সেপ্টেম্বরে পিছিয়েছিল সাক্ষীর অভাবে। নিরাপত্তাহীনতা ও ঝুঁকির আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ চাক্ষুষ সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত হতে সাহস পাননি। চলতি বছরের ১ অক্টোবর সেই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ছয় মাসের জামিনে বের হয়ে এখন মুক্ত হাওয়া উপভোগ করছেন। 

বাংলাদেশে এখনও পূর্ণাঙ্গ সাক্ষী সুরক্ষা আইন নেই। অথচ ন্যায়বিচারের জন্য সাক্ষীর নিরাপত্তা কোনো আনুষঙ্গিক বিষয় নয়; বিচার প্রক্রিয়ার অপরিহার্য শর্ত। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে সাক্ষীর নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) ‘ভিকটিমস অ্যান্ড উইটনেসেস ইউনিট’ নামে পৃথক বিভাগ রয়েছে, যা ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষার বিষয় দেখভাল করে। প্রচলিত সাক্ষ্য আইন কিংবা কিছু বিশেষ আইনে, যেমন মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর ৪১ ধারায় সাক্ষীর সুরক্ষার আংশিক বিধান আছে। তবে তা সব ধরনের মামলায় কার্যকর ও পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করে না। 

রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল মামলা গ্রহণ, আসামি গ্রেপ্তার কিংবা আদালতে বিচার পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাক্ষীকে নিরাপদে আদালতে হাজির করা; সাক্ষ্য দেওয়ার পর তাঁর ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হুমকি বা হামলার অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াও দায়িত্ব। বিশেষত মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর মামলায় সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিচার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। 

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলাকালে সাক্ষীদের ওপর হামলা ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা একাধিক। গীতিকার ও সুরকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। এরপর তাঁর ছোট ভাই আহমেদ মিরাজের মরদেহ রাজধানীর কুড়িল ফ্লাইওভারের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। ভাইয়ের প্রাণহানির পর বুলবুল যুদ্ধাপরাধের মামলার সাক্ষী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তাহীনতার কথা তুলে ধরে সুরক্ষা চেয়েছিলেন। 

সাক্ষ্য দেওয়ার মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে, তার একটি দৃষ্টান্ত সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম জুনুর ঘটনা। একাত্তরে গুডস হিলে নির্যাতনের শিকার এই মুক্তিযোদ্ধা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের ১৯ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন। ২০১৩ সালে সাক্ষ্য দেওয়ার মাত্র ১০ দিন পর তাঁকে চট্টগ্রামে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবারের অভিযোগ ছিল, সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে তিনি হুমকি পেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন, একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র কী করেছিল? সাক্ষীকে ভয় দেখিয়ে, হামলা করে কিংবা নিখোঁজ করে দেওয়া গেলে আদালতে সত্য পৌঁছাবে না। সাক্ষীকে সত্য বলার সাহস ও নিরাপত্তা দিতে না পারলে সেই রাষ্ট্রের কাছে কি ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা চাইতে পারবে নাগরিক?

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×