পোশাক খাত
পরিস্থিতি শান্ত করে মজুরি দাবির নিষ্পত্তি সম্ভব
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৮ | আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | ১০:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
তৈরি পোশাক খাতে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সেটা অভাবনীয় নয়। তবে এটা এড়ানো যেত। ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের কাজটা মাস তিনেক আগে করলেও দেশের প্রধান এই ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের কর্মীরা আশ্বস্ত থাকতেন। তারা খুশি হয়েছিলেন পাঁচ বছরের বদলে তিন বছর পরপর মজুরি কাঠামো হালনাগাদের বিধান চালু হওয়ায়। তবে সেই ধারায় মজুরি বোর্ড গঠনে সরকার বিলম্ব করে ফেলেছে। ডিসেম্বর থেকেই নতুন কাঠামোয় এ খাতের শ্রমিকদের মজুরি পাওয়ার কথা। হাতে আছে মাত্র এক মাস।
এর মধ্যে ১ নভেম্বর থেকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন প্রদান শুরু হয়েছে। তাদের সিংহভাগ জুলাই-সেপ্টেম্বরের বেতনও একত্রে পেয়েছেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এর আওতায় আনার কাজ চলছে। ১১ বছর পর নতুন কাঠামোয় তাদের বেতনপ্রাপ্তি নিয়ে বড় আপত্তি নেই। সরকারও তার আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে এর বাস্তবায়নে এগিয়েছে। তবে এর পাশাপাশি প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিকের পোশাক খাতে মজুরি বৃদ্ধির কাজটি যথাযথভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়াস ছিল না বলেই প্রতীয়মান।
সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মত নিয়ে এবং পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের রাজি করিয়ে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে কয়েক মাস লেগে যাওয়াই স্বাভাবিক। তাই শ্রমিকদের মনে শঙ্কা, আরও কয়েক মাস পুরোনো কাঠামোতেই মজুরি পেতে হবে। এ অবস্থায় সরকারের ঘোষণা থাকতে পারে– চলতি মাসের মধ্যেই আলোচনা সম্পন্ন করে ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করা হবে। পরিস্থিতি শান্ত করে আনতে পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সমিতিসহ সব পক্ষই রাখতে পারে ইতিবাচক বক্তব্য।
এবার ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি উঠেছে। এর আগেরবার, ২০২৩ সালেও যে ন্যূনতম মজুরির দাবি উঠেছিল, তার চাইতে অনেক কম মজুরি শ্রমিকরা মেনে নিয়েছিলেন। তবে শ্রমিকসহ সারাদেশের মানুষ এখন আছেন টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে। মাঝে কিছুটা কমে আসার পর এটা আবার ‘ডাবল ডিজিটের দিকে ধাবমান’। এ অবস্থায় পোশাক শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা অনেক ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। খাতটির উদ্যোক্তারা আয় করেন ডলারে, আর মজুরি দেন টাকায়। ডলারের দাম এর মধ্যে অনেক বেড়েছে এবং কমেছে টাকার দাম। আর তৈরি পোশাকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও ন্যূনতম মজুরিতে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমরা কতখানি পিছিয়ে, সেটিও এখন সবার জানা।
এমন তো নয়, মজুরির বাইরে অন্যান্য সুবিধা শ্রমিকরা অনেক বেশি পেয়ে থাকেন। কিছু ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান বাদে এ খাতে কর্মপরিবেশের উন্নতি হয়নি আজও। অগ্নি নিরাপত্তাসহ যেসব সংস্কার হয়েছে, সেটাও পশ্চিমা ক্রেতাদের চাপে। ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগও এ খাতে সীমিত। অনেকে বলছেন, এর সুস্থ চর্চা থাকলে সেই মাধ্যমেই মজুরিসহ বিভিন্ন প্রশ্নের নিষ্পত্তি হতো। বারবার মজুরি ঘিরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। সে কারণেই আবার এই শঙ্কার বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত ছিল সরকার ও উদ্যোক্তাদের। বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা করে বিকাশ লাভকারী একটি খাতে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির সুযোগ রাখা তো উচিত নয়। ক্রেতারা এতে উদ্বিগ্ন হতে পারেন। এর সুযোগ স্বভাবতই নেবেন প্রতিযোগীরা।

ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবিতে এর আগে একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে দেখা গেছে। একটা সময় পর্যন্ত কোনো মজুরি কাঠামোই তো ছিল না পোশাক খাতে। সুনির্দিষ্ট নিয়মবিধির আওতায় নতুন কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে, সেটাও নয়। শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির পর, আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তাদের দাবি কিছুটা আদায় হয়েছে। পোশাক খাতে অটোমেশনের কারণে কাজের সুযোগ সংকোচন, ছাঁটাই, ‘কালো তালিকাভুক্তি’র যন্ত্রণাও রয়েছে। গভীরভাবে দেখলে এগুলোও বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টির কারণ। জীবনযাত্রার অব্যাহত ব্যয় বৃদ্ধিতে মজুরি বৃদ্ধির দাবিটা রয়েছে অগ্রভাগে।
পোশাক খাতে উদ্যোক্তাদের কোনো যন্ত্রণা নেই, তা নয়। এর মধ্যেও খাতটিকে এগিয়ে নিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বসম্প্রদায়ে তুলে ধরার জন্য তাদের প্রশংসা করা হয়। পোশাক খাতের অগ্রগতিতে অন্যান্য খাতেরও বিকাশ ঘটেছে। দরিদ্র নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রেখেছে পোশাক খাত, এটাও সবাই বলেন। উদ্যোক্তাদের সাফল্যের পেছনে সরকারের অব্যাহত নীতি-সহায়তার ভূমিকাও অনস্বীকার্য। তবে স্বীকার করতে হবে, পোশাক খাতে নিয়োজিত লাখ লাখ কর্মীর অবদান কখনোই যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি। এই অবমূল্যায়ন দেখা গেছে বিভিন্ন সময়ে নির্ধারিত মজুরি কাঠামোতেও। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চালু হওয়া ন্যূনতম মজুরিতেও সেটা ছিল স্পষ্ট। অন্যান্য শিল্প খাত দ্রুত বিকশিত হচ্ছে না বলেও পোশাক খাত শ্রমের একটা অব্যাহত সরবরাহ পাচ্ছে। প্রবাসী শ্রমবাজারেও আছে চাপ। তবে এসবের ‘সুযোগ গ্রহণ’ অব্যাহত রাখা উচিত হবে না সেই খাতের উদ্যোক্তাদের, বিশ্ববাজারে যাদের প্রশংসা রয়েছে। উপযুক্ত ও সম্মানজনক মজুরির ব্যবস্থা করে তারা এখন পারেন উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে।
শ্রমিকদের দাবি আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করে উদ্যোক্তারা পারেন অন্যান্য ক্ষেত্রে খরচ কমানো এবং সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে। বিদ্যমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় ক্রেতাদের কাছ থেকে বাড়তি দাম তারা সহজে পাবেন না। সরকারের কাছ থেকেও বাড়তি প্রণোদনা কিংবা ছাড় পাওয়া সম্ভব নয়। সরকার নিজেই আছে অর্থ সংকটে। জ্বালানি খাতে ও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী পুষতেই তার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি, পরিবহন ও বন্দর সুবিধার দক্ষ ব্যবহারের মতো ক্ষেত্রগুলোয় জোর দিয়ে হলেও শ্রমিকদের একটা মোটামুটি মানসম্মত জীবন নিশ্চিতে তাদের এগিয়ে আসা জরুরি।
নির্ভরযোগ্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা না পেয়ে মাঝে উদ্যোক্তারা অনেক ভুগেছেন, সন্দেহ নেই। কলকারখানা বন্ধ হয়েছে; পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদনও করতে পারেননি। কিন্তু সে জন্য তো শ্রমিক দায়ী নয়। তাদের একাংশ সেই কারণে বরং কর্মচ্যুত হয়েছে। এর দায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে। আর তাদের সঙ্গেই করতে হবে বোঝাপড়া।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
- পোশাক খাত