আর্থিক খাতের দুই বিল পাসের পর অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বিতর্কে জড়ালেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০১:২৭
শেয়ারবাজার ও বীমা খাতের ঊর্ধ্বতনদের বয়সসীমা তুলে দিয়ে সংসদে দুটি বিল পাস হয়েছে। বিলের ওপর আলোচনায় অংশ না নিলেও পাস হওয়ার পর এ নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে পাল্টাপাল্টি বিতর্কে জড়িয়েছেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা।
যদিও যথাসময়ে এই বিল দুটির বিষয়ে সদস্যদের জানানো হয়নি বলে অভিযোগ তুলে বিরোধীদলীয় নেতা আলোচনার সুযোগ পাননি বলে জানিয়েছেন। তবে স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানা বিলের ওপর জনমত যাচাইয়ের আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেছেন, শেয়ারবাজারে গত ১৫ বছরে এক লাখ কোটি টাকার ওপরে লুটপাট হয়েছে। এই অর্থ সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ছিল, যা একটি বিশেষ গোষ্ঠী লুটে নিয়েছে। এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)– এ দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থায় চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে এই দুই বিলের মাধ্যমে।
বিল পাসের পর এই বিতর্কে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, অর্থনৈতিক খাতে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়োগ দেওয়া হবে না। এর জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানকে বিএনপির দলীয় লোক আখ্যা দিয়ে তাঁর অপসারণের দাবি তোলে বিরোধী দল। তবে সরকারি দল বলেছে, গভর্নর দলীয় ব্যক্তি নন।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ছাড়া অন্য কেউ বিল দুটির বিষয়ে জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠানোর জন্য লিখিত নোটিশ দেননি। কেউ সংশোধনী প্রস্তাবও দেননি। ফলে কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, রুমিন ফারহানা ছাড়া অন্য কোনো সদস্য বিলের ওপর আলোচনারও সুযোগ পাননি। কিন্তু বিরোধী দলের একাধিক সদস্য বিলের ওপর আলোচনার জন্য কয়েক দফা হাত তোলেন।
একটি বিল পাসের পর ফ্লোর পেয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘আসলে আমরা বেশির ভাগ সদস্য এখানে নতুন এসেছি। আমরা বিধি আস্তে আস্তে রপ্ত করছি।’ তিনি বলেন, এ বিল নির্ধারিত সময়ে পাস করতে হবে– এমন বাধ্যবাধকতা নেই। এখানে বিধি মেনে তিন দিন আগে নোটিশ দিয়ে বিলটি সংসদে আনা উচিত ছিল। তারা একটু আগে বিলের কপি পেয়েছেন। তিনি সংসদ সদস্যদের অধিকার খর্ব না করার অনুরোধ করেন। যেহেতু আজই (বৃহস্পিতবার) বিলের কপি দেওয়া হয়েছে, তাই তিনি বিল দুটি স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান।
অবশ্য ততক্ষণে একটি বিল পাস হয়ে গেছে। এ পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বিধি অনুযায়ী আগের দিন বিলের রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। সময় মার্জনার এখতিয়ার স্পিকারের আছে। তখন স্পিকার বিলটি (বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) পাসের প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যান। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
বিল পাসের পর বিতর্ক
বিল দুটি পাস হওয়ার পর ফ্লোর নেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি বলেন, সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা যেভাবে চাইবেন সেভাবে আইন পাস হবে। সেটাই এই সংসদের বাস্তবতা।
আখতার হোসেন বলেন, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ও বীমা করপোরেশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এটা কী কোনো ব্যক্তিকে মাথায় রেখে করা হচ্ছে নাকি একটা পলিসিকে মাথায় রেখে করা হচ্ছে? এনসিপির এই সংসদ সদস্য বলেন, যেভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর নিয়োগ হয়েছে, সেভাবে যদি কোনো বিশেষ ব্যক্তিদের মাথায় রেখে এ দুটি আইনে বয়সের সীমা তুলে ধরা হয়, তাহলে অর্থমন্ত্রী যেভাবে দক্ষ লোক নিয়োগের কথা বলেছেন সেটার সঙ্গে বৈপরীত্য দেখা দেবে।
আখতার হোসেন বলেন, বিএনপি ২০০১ সালে যখন ক্ষমতায় এসেছিল, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিজেদের মতো করে উপদেষ্টা বসানোর জন্য প্রধান বিচারপতির বয়স ৬৫ থেকে ৬৭ করেছিল। তারপর একটা দীর্ঘ ভোগান্তি জাতিকে পোহাতে হয়েছিল।
আখতার হোসেনের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যখন আইনটি হয়েছিল, তখন দেশের মানুষের গড় বয়স ছিল ৫৭। এখন ৭২ বছর। বিশ্বের প্রায় কোনো দেশে সিকিউটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে বয়সের সীমা নেই।
বিরোধী দলের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের আগামীর অর্থনীতির যে নতুন প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হচ্ছে, এখানে যোগ্য, দক্ষ ব্যক্তি যদি আসতে চান, আপনাকে এগুলোকে মাথায় রাখতে হবে। এখানে ইমোশনের কোনো সুযোগ নেই।’
বিরোধীদলীয় নেতা ও অর্থমন্ত্রীর বিতর্ক
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, যোগ্য লোকদের যোগ্য জায়গায় স্পেস করে দেওয়া দরকার। কিন্তু একটা কথা আছে, ‘মর্নিং সোজ দ্য ডে’। সরকারের দুই মাসে বেসিক যে জায়গাগুলোতে হাত দেওয়া হয়েছে, প্রতিটি জায়গায় জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপক্ষে চলে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো ‘বেসিক’ জায়গার কথা তিনি বলছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে এবং সাবেক গভর্নরকে যে পদ্ধতিতে বিদায় দেওয়া হয়েছে তা জাতি দেখেছে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এ পর্যন্ত যেসব জায়গায় পরিবর্তন এসেছে, সেগুলা জনগণ ও গণতন্ত্র– কোনোটাই সাপোর্ট করে না। এমনকি খেলার মাঠটা পর্যন্ত আমরা উন্মুক্ত রাখতে পারলাম না। সেখানে গিয়েও আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম।’
এভাবে যদি যোগ্যতা বিবেচনা করা হয়, দেশ এগোবে কীভাবে– এমন প্রশ্ন রেখে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা তো কার ইন্টেনশন কী সেটা দেখতে পারব না। এটা মনের ব্যাপার।’ তিনি বলেন, সবকিছুকে রাজনীতিকীকরণ, ক্ষেত্র বিশেষে গোষ্ঠী-পরিবার প্রাধান্য দিয়ে এগোলে দেশ আগাবে না।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিল পাসের পর এ ধরনের আলোচনার কোনো সুযোগ ছিল না। যেহেতু বিরোধী দল প্রশ্ন তুলেছে– তাই উত্তর দিতে হবে। তিনি বলেন, অতীতে যতবার বিএনপি সরকারে এসেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনে যতগুলো নিয়োগ হয়েছে, সবগুলো ছিল অরাজনৈতিক। যে কারণে আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের সময় কোনো সমস্যা হয়নি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কোনো দলের ব্যক্তি নন। তিনি একটা দলের সমর্থক হতেই পারেন। এখন পর্যন্ত গভর্নরের যে ‘পারফরম্যান্স’ তারা দেখেছেন, সেটা অন্য যে কোনো গভর্নরের পারফরম্যান্সের চেয়ে ভালো।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বয়স বাড়ানোর অভিযোগ সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, তখন আপনাদের (জামায়াতের) পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি করা হয়নি। তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, অর্থনৈতিক খাতে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়োগ দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের অপসারণ দাবি
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, প্রধানমন্ত্রী কোনো অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক দেবেন না বলে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যদি সেটা হয় তারা ধন্যবাদ দেবেন।
সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের আরও বলেন, ‘কিন্তু এখনকার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যিনি আছেন, উনার একটা পরিচয় কিন্তু আছে। সেটা হচ্ছে, বিএনপির যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি হয়েছিল, আমি যেহেতু জানি, উনি এই কমিটির একজন মেম্বার ছিলেন।’
জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘যদি এ রকম পরিচয় থাকে (গভর্নরের) তাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের আলোকে ওনাকে গভর্নর থেকে বাদ দিয়ে এই সিদ্ধান্তের আলোকেই একজন যোগ্য গভর্নর নিয়োগ করা হোক।’
এর পর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু ফ্লোর নিয়ে বলেন, দলকে সমর্থন করা মানে দলের লোক নয়। আর কোনো দলকে সমর্থন করে নির্বাচনী কার্যক্রমে সহায়তা করা মানে দলের লোক নয়। বিরোধী দলের নির্বাচনী কার্যক্রমেও অনেকে সহায়তা করেছেন, যারা তাদের দলীয় লোক নন। নির্বাচন বাংলাদেশে একটা বিশাল কর্মযজ্ঞ। এখানে অনেকে সহযোগিতা করতে পারেন।
বিলে যা আছে
বিল দুটি পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়াম্যান ও কমিশনার পদে এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে সর্বোচ্চ বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে।
এত দিন আইনে ছিল, কোনো ব্যক্তির বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হলে তিনি বাংলাদেশ সিকিউটিরিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান বা কমিশনার পদে নিযুক্ত হওয়ার উপযুক্ত বিবেচিত হন না বা পদে বহাল থাকতে পারেন না। বিলে এই বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইনে বলা ছিল, কোনো ব্যক্তির ৬৭ বছর পূর্ণ হলে তিনি বীমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বা সদস্য হতে পারবেন না। সংসদে পাস হওয়া বিলে এই বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- অর্থমন্ত্রী
- সংসদ
- বিতর্ক
