স্থানীয় সরকার নির্বাচন
ভোট শেষ করার সময় নিয়ে একমত, শুরু নিয়ে আপত্তি
আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে ইসির পরিকল্পনা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের আপত্তি
ব্রিফিংয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ- সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪৯ | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
নির্বাচন কমিশন (ইসি) আগামী ১২ নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন শুরুর যে পরিকল্পনা করেছিল, সেটা কার্যকর হচ্ছে না। এই সময়ে নির্বাচন শুরু করার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছেন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তারা। তবে আগামী বছর জুনের মধ্যে ইউপি নির্বাচন শেষ করার বিষয়ে সবাই সম্মত হয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানেই এমন মতামত উঠে আসে।
দুপুর আড়াইটা থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠক হয়। অন্য চার নির্বাচন কমিশনার, ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদসহ ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, জনপ্রশাসন সচিব এবং পুলিশ মহাপরিদর্শক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ সরকারের ২৬ মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা বৈঠকে যোগ দেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক সূত্র জানায়, আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা বিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষা ছাড়াও ভোটের জন্য সমন্বিত প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকার কথা বলেন। এ পরিস্থিতিতে ইসি তাদের আগের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।
বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, আগামী বছরের জুনে এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেই ইউপি নির্বাচন শেষ করার বিষয়ে সবাই সম্মত হয়েছেন। পরবর্তী সময় কমিশন সভা করে ভোটের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করবে ইসি।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে ইসি আগের পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি বলেও দাবি করেন মো. সানাউল্লাহ। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ছাড়াও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করতে এই আন্তঃমন্ত্রণায় বৈঠক ডেকেছিল ইসি।
বৈঠক সূত্র জানায়, নভেম্বরে সাত ধাপের ইউপি নির্বাচন শুরু করে আগামী বছরের মে মাসের মধ্যে শেষ করার ইসির পরিকল্পনায় মূল আপত্তি আসে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো থেকে। এসব বিভাগের প্রতিনিধিরা জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যক্রম শেষ করার বিষয়ে প্রভাব পড়েছে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে বিদ্যালয়গুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা, এসএসসির টেস্ট পরীক্ষা এবং প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শেষ করতে হবে। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা হলে পরীক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
স্বরাষ্ট্রসহ অন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরাও স্বল্পতম সময়ে ভোটের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার পদক্ষেপগুলো সমন্বয়ের পাশাপাশি অন্যান্য প্রস্তুতি শেষ করা যাবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।
এর আগে গত সোমবার স্থানীয় সরকার
নির্বাচনের প্রাক-প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে ইসি প্রাথমিকভাবে ১২ নভেম্বর সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে। এর পরদিন মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীরা অসন্তোষ জানিয়ে বলেন, ইউপি নির্বাচনের তারিখ নিয়ে ইসি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, সেটা ইসির একক এখতিয়ার নয়। পরে ইসি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানায়।
এইচএসসির আগে নির্বাচন শেষ করতে সবাই সম্মত
বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, স্থানীয় সরকার বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিষয়ে আজকের সভায় সবাই সম্মত হয়েছেন। আমাদের এই নির্বাচনটা এইচএসসি পরীক্ষার আগে, অর্থাৎ ৬ জুনের মধ্যে শেষ করতে হবে।
তিনি বলেন, সভায় কতগুলো বিষয় সামনে এসেছে। বিশেষ করে শিক্ষার ব্যাপারে বলা হয়েছে, বন্যার কারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে যে প্রভাব পড়েছে, সেটা কাটিয়ে ওঠা গেছে। কিন্তু একটা নির্বাচনে প্রশিক্ষণ সমন্বয় ও দায়িত্ব পালনের জন্য একজন শিক্ষকের অন্ততপক্ষে এক সপ্তাহ সময় লাগে। এ কারণে শিক্ষকরা যেন তাদের মূল্যায়ন পরীক্ষা ও প্রাক-প্রস্তুতির কাজগুলো করতে পারেন এবং পরীক্ষাগুলো যেন ব্যাহত না হয়, সেটাই সভা থেকে অনুরোধ করা হয়েছে।
সানাউল্লাহ বলেন, ‘আমরা বলেছি, এগুলো অবশ্যই আমলে নিতে হবে। আমরা উপলব্ধি করেছি, আরও দুয়েকটি কাজ আমাদের করতে হবে। ইসি সচিবালয়ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসবে, সমন্বয় করবে। সেগুলো সম্পন্ন করে যত দ্রুত সম্ভব কমিশন সুনির্দিষ্ট তারিখ জানিয়ে দেবে।’
এর আগে ইসি প্রাথমিকভাবে ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে নির্বাচনের পরিকল্পনার কথা বলেছিল। এখন ওই পরিকল্পনা থেকে ইসি কী সরে এসেছে– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, এগুলো সম্ভাব্য সময় (টেনটেটিভ টাইম)। ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর চূড়ান্ত করব। আমরা ওখান থেকে সরে আসিনি। আজকে যে তথ্য-উপাত্ত পেয়েছি, এটার ওপর আলোচনা করেই সবকিছু চূড়ান্ত করব।’
বিভিন্ন পরীক্ষার ফাঁকে এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের কার্যক্রম ব্যাহত না করে ইউপি নির্বাচন করার উপযুক্ত সময় খুঁজে পাওয়া ইসির জন্য কঠিন হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন এই নির্বাচন কমিশনার। তিনি বলেন, আজকের সভায় মূলত ইউপি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন ভোটের জন্য বিরতি কম পাওয়া গেছে। পুরো নভেম্বর-ডিসেম্বরজুড়ে পরীক্ষা। জানুয়ারিতে কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। এর পর ফেব্রুয়ারির ৭ বা ৮ তারিখ রোজা শুরু; রোজা শেষ হওয়ার পরপরই মার্চে এসএসসি পরীক্ষা শুরু। এ পরীক্ষা হয়ে গেলে ৬ জুন থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। মাঝখানে একটু সময় পাওয়া যাচ্ছে, এপ্রিল-মে। এই সময়ের মধ্যে কীভাবে সব সমন্বয় করা যায়, তা নিয়ে আরও কাজ করতে হবে।
তাহলে কী নভেম্বরে ভোট শুরু হচ্ছে না– এমন প্রশ্নে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ‘উপাত্তগুলো নিয়ে কমিশন সভায় বসব, তারপর নির্দিষ্ট করা যাবে।’
ইসির ভূমিকার সমালোচনা
ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার পর তা থেকে পিছিয়ে আসায় ইসির কঠোর সমালোচনা করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
গতকাল সমকালকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেন, নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার পর মন্ত্রীদের ধমকে সেটা থেকে সরে আসার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে, ইসি মোটেই স্বাধীন নয়। তারা নতজানু ও মেরুদণ্ডহীন প্রতিষ্ঠান। এ অবস্থায় তাদের পক্ষে কীভাবে আগামী নির্বাচনগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে করা সম্ভব হবে, সেটা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কোনো রকম টালবাহনা আমরা মেনে নেব না। স্থানীয় নির্বাচন করতে হবে। কমিশনকে আগের ঘোষিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাদের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীন সত্তার প্রমাণ দিতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বলেন, তারিখ ঘোষণার পরের চাপ সহ্য করতে না পারলে, আগামীতে নির্বাচনের সময় চাপ এলে সেটাকে কীভাবে মোকাবিলা করবে? নির্বাচন কমিশন সরকারের প্রতি তার নতজানু অবস্থান থেকে সরে এসে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন ভূমিকা পালন করবে– এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, আমরা তো আলামত ভালো দেখছি না। এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যারা স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, কিংবা সরকারের তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করে– সেই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আগামীতে কীভাবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হবে, সেটা নিয়েই এখন সংশয় তৈরি হলো।
মাঠ পর্যায় থেকে সিসি ক্যামেরার তথ্য চাইল ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রগুলোতে স্থাপিত সিসি ক্যামেরাবিষয়ক তথ্য চেয়েছে ইসি। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্ধারিত ছকে এসব তথ্য ইসি সচিবালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।
গতকাল ইসির সিনিয়র সহকারী সচিব রশিদ মিয়া স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত চিঠি থেকে এ তথ্য জানা যায়। এরই মধ্যে এ-বিষয়ক চিঠি সব আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।
- বিষয় :
- স্থানীয় সরকার নির্বাচন