পথচারীর জন্য বিপজ্জনক শহর
# সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের অর্ধেকের বেশি পথচারী # ঝুঁকিতে পথচারী, সাইকেল ও মোটরসাইকেল আরোহী
নেই পদচারী সেতু, তাই পথচারীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাড়ির ফাঁক গলে রাস্তা পার হতে হয়। ছবিটি নগরীর টাইগার পাস মোড় থেকে তোলা মো. রাশেদ
আব্দুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৪ | ০০:৩৯
পথচারীদের জন্য বিপজ্জনক নগর এখন চট্টগ্রাম। সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে যত মানুষ নিহত হন, তার অর্ধেকের বেশি পথচারী। গত তিন বছরে চট্টগ্রামে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু বেড়েছে। যার বড় শিকার হচ্ছেন সাধারণ পথচারীরা। এখানে সড়কের তুলনায় ফুটপাত রয়েছে কম। যে ফুটপাত আছে তার বেশির ভাগই হাঁটার অনুপযোগী। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামের সড়কগুলো পথচারীবান্ধব নয়। বেশির ভাগ ফুটপাত অবৈধ দখলে। যার কারণে পথচারীরা মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হন। এ ছাড়া জেব্রা ক্রসিং ও আধুনিক সংকেত ব্যবস্থা না থাকা সড়কের প্রতিটি মোড় ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয় পথচারীদের। ফলে দুর্ঘটনায় পথচারীদের মৃত্যু হয় বেশি। সড়ক পার হতে গিয়ে ট্রাক কিংবা বাসচাপায় মৃত্যু নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরে পিচঢালা, কংক্রিট ও কাঁচা সড়ক আছে ১ হাজার ৩৩৫ কিলোমিটার। বিপরীতে ফুটপাত আছে মাত্র ১৫১ কিলোমিটার।
ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটির (বিআইজিআরএস) সহযোগিতায় চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ও ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিস। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরের সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এই তিন বছরে ২৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৬৩ জন নিহত হয়েছেন। ২০২০-এর তুলনায় ২০২২ সালে সড়কে মৃত্যুহার বেড়েছে ৩৮ শতাংশ। সড়কে নিহত ব্যক্তিদের ৫৬ শতাংশ পথচারী। সড়কে সবচেয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পথচারী, সাইকেল ও মোটরসাইকেল আরোহী। এই তিন শ্রেণির মৃত্যুহার ৮৯ শতাংশ।
সড়কে মারা যাওয়া মানুষের মধ্যে ৮১ শতাংশ পুরুষ। যাদের বয়স ২০ থেকে ৫৪ বছর। অর্থাৎ কর্মক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু হচ্ছে বেশি। এর মধ্যে বেশি মৃত্যু হয়েছে ৩৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ব্যক্তি। যাদের অধিকাংশ মোটরসাইকেল আরোহী।
চট্টগ্রাম নগরের সড়কে সংঘর্ষের ঘটনার ৩৩ শতাংশ যানবাহন ও চালককে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। যারা ঘটনার পর আহত বা নিহত ব্যক্তিদের পথে রেখে পালিয়েছেন। ২০২২ সালে সড়কে অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে রমজান মাসে। যার অধিকাংশ বিকেল ৪টা থেকে রাত ১২টার মধ্যে। অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে বৃহস্পতিবার রাত ও শনিবার বিকেলে। সাপ্তাহিক ছুটির কারণে বৃহস্পতিবার বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে নগরবাসীর। আবার ছুটি শেষে নগরে ফিরতে শনিবার বিকেলে চাপ থাকে। এ সময় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে।
সড়ক দুর্ঘটনাগুলোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে গবেষকরা প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম নগরের ১০ মোড় ও ১০টি সড়ককে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে টাইগারপাস মোড়, আউটার রিংরোডের খেজুরতলা, অক্সিজেন মোড় ও জিইসি মোড় সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। রুটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী আমানত সেতু পর্যন্ত সড়ক।
সড়কে পথচারীদের মৃত্যু বেশি : ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ৩৩ জন পথচারী, ২৪ জন দুই ও তিন চাকার চালক ও যাত্রী, ১০ জন চার চাকার যানবাহনের যাত্রী ও চালক। ২০২১ সালে নিহতের ৫৪ জন পথচারী, দুই ও তিন চাকার চালক ও যাত্রী মারা গেছেন ৩২ জন ও চার চাকার চালক ও যাত্রী মারা গেছেন ১২ জন। সাইকেল আরোহী মারা গেছেন পাঁচজন। ২০২২ সালে সড়কে পথচারীর মৃত্যু হয়েছে ৫৯ জন, দুই ও তিন চাকার চালক ও যাত্রী মারা গেছেন ২২ জন, চার চাকার চালক ও যাত্রী মারা গেছেন ১০ জন এবং সাইকেল আরোহী মারা গেছেন ২ জন।
তিনবছরের তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়াদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ পথচারী, ৩০ শতাংশ মোটরসাইকেল ও সিএনজি অটোরিকশার চালক ও যাত্রী, ১২ শতাংশ চার চাকার যানবাহনের চালক ও যাত্রী এবং সাইকেল আরোহী ৩ শতাংশ। সড়কে মৃত্যুর ৮৯ শতাংশ পথচারী, মোটরসাইকেল ও সাইকেল আরোহী।
তিনবছরে ১৯৮টি দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব দুর্ঘটনায় ১০৪ জন পথচারীর মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে ভারী ট্রাক চাপায় ৩৫ জন, বাস ও মিনিবাস চাপায় ২৫ জন, কার,সিএনজি ও টেম্পু চাপায় ১৭ জন, জিপ এবং পিকআপ চাপায় ১০ জন, মোটরসাইকেল চাপায় ৮ জন, মাইক্রোবাস চাপায় ৭ জন ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তার হাল
সিএমপি’র ১৬ থানার এফআইআর, সিডিএমএস ও অ্যাক্সিডেন্ট রিপোর্ট ফর্ম বিশ্লেষণ করে তিনবছরে গবেষকরা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ২০২০ সালে ৬৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২১ সালে ৯৪টি ঘটনায় ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২২ সালে ৮৮ ঘটনায় ৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২০ সালের চেয়ে ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনার হার বেড়েছে। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে কিছুটা কমেছে। গবেষকরা বলছেন, ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে লকডাউন ছিল। মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রিত ছিল। এ জন্য সড়ক দুর্ঘটনার হার কম দেখা গেছে।
নগরের ১৬ থানার মধ্যে সবোর্চ্চ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকায়। যার সংখ্যা ৩৫টি। যাতে ৩৫ জন নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে কম সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে চকবাজার থানা এলাকায়। এখানে ৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে বাকলিয়া থানা এলাকায়। এখানে ২৫টি ঘটনায় ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্দর থানা এলাকা ২৫টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন, চান্দগাঁওয়ে ২২টি দুর্ঘটনায় ২২ জন, কোতোয়ালীতে ২০টি দুর্ঘটনায় ২১ জন, পতেঙ্গায় ২০টি দুর্ঘটনায় ২০ জন, আকবরশাহ থানা এলাকায় ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৮ জন, পাহাড়তলীতে ১৫টি ঘটনায় ১৮ জন, কর্ণফুলীতে ১৩টি ঘটনায় ১৬ জন, ইপিজেডে ১২টি ঘটনায় ১৪ জন, হালিশহরে ১২টি ঘটনায় ১২ জন, ডবলমুরিংয়ে ৮টি দুর্ঘটনায় ৮ জন, পাঁচলাইশে ৬টি ঘটনায় ৬ জন ও সড়দরঘাটে ৫টি দুর্ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২০ সালে চট্টগ্রাম নগরের জনসংখ্যার প্রতি লাখে ২ দশমিক ১ জন, ২০২১ সালে ৩ দশমিক ২ জন ও ২০২০ সালে ২ দশমিক ৯ জন ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।
কর্মক্ষম ব্যক্তিরা মরছে বেশি
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ৮১ শতাংশ পুরুষ ও ১৯ শতাংশ নারী। পুরুষদের মধ্যে মারা যাওয়াদের বয়স ২০ থেকে ৫৪ বছর। অর্থাৎ কর্মক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু হচ্ছে বেশি। এরমধ্যে বেশি মৃত্যু হয়েছে ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ব্যক্তি। যাদের অধিকাংশ ছিল মোটরসাইকেল আরোহী। পথচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে ৬০ থেকে ৬৪ বছর বয়সী, ৫০ থেকে ৫৪ বছর বয়সী ও ২০ থেকে ২৪ বয়সী লোকজন। এছাড়া ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সী চালকরা সড়ক দুর্ঘটনায় জড়িত। সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩ শতাংশ চাপা দেওয়া চালক ও গাড়ির হদিস মেলেনি। ঘটনার পর তারা পালিয়েছেন। অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে বৃহস্পতিবার রাত আটটা থেকে ১২টার মধ্যে ও শনিবার বিকেল চারটা থেকে রাত আটটার মধ্যে।
নিরাপত্তা নিশ্চিতে যত সুপারিশ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পথচারীরা। এ জন্য পথচারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সড়কের লেন কমিয়ে ফুটপাতের পরিধি বাড়ানো, মোড়গুলোতে ক্রসওয়াক লেন তৈরি করা, উঁচু-নিচু না করে ফুটপাতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, সড়কে কার্ব এক্সটেনশন কার্যকর করা, সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণে স্পিড হাম্প বসানো ও পথচারী আইল্যান্ড তৈরি করা।
এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও আবাসিক এলাকায় গতি নিয়ন্ত্রণ করা। প্রকৌশলগত সমাধানের পাশাপাশি জনসচেতনতা ও আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা। সড়কে পথচারী ও সাইকেল আরোহীদের অগ্রাধিকার দেওয়া ও যান্ত্রিক যানবাহনকে কম অগ্রাধিকার দেওয়া এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাস রুট রেশনালাইজেশন (পুর্নবিন্যাস) করা। সড়ক নিরাপত্তায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ও বিআরটিএসহ অন্যান্য অংশীজনদের নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সমন্বিতভাবে দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা ও আদানপ্রদান করা। এছাড়া বার্ষিক রোড সেফটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের (ডব্লিউআরআই) পরামর্শক স্থপতি ফারজানা ইসলাম তমা বলেন, ‘সড়কে মৃত্যু হলেই ভিকটিমকে দায়ী করা হয়। অথচ পথচারীদের চলাচলের জন্য সড়কে কোন জায়গা নেই। নগরের সড়কগুলো শুধুমাত্র যানবাহনের চলাচলের কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করা হয়, যেটি ভুল।’
নগরে সড়ক ব্যবস্থাপনার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নগরের কাপ্তাই রাস্তার মাথায় পরীক্ষামূলক জংশন ডিজাইন করেছি। পরদিন সকালে একঘণ্টায় ১ হাজার ২০ জন রাস্তা পারাপার করেছেন। তাদের মধ্যে ৭৪৪ জন অর্থাৎ ৭৩ শতাংশ পথচারী নির্ধারিত ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হয়েছেন। সড়কে মৃত্যু কমাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।’
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ড. সৈয়দ মাহফুজুল হক বলেন, ‘সড়কে মৃত্যুর বড় কারণ অনিয়ন্ত্রিত গতি। ৫ শতাংশ গতি কমালে সড়কে ৩০ শতাংশ মৃত্যু কমে আসবে। সড়কে মৃত্যু কমাতে মাল্টিমোডাল পরিবহন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার ও সড়কে সংঘর্ষ পরবর্তী দ্র্নত ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব বিষয় নিশ্চিত করলে সড়কে মৃত্যু অর্ধেক নেমে আসবে।’
বিআইজিআরএস-চট্টগ্রামের সার্ভিল্যান্স কো-অর্ডিনেটর কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ‘সড়কে ঝুঁকির বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর কোন প্রস্তুতি নেই। একটি শহরে কত গতিতে গাড়ি চলবে তার কোন সীমাও নির্ধারণ নেই। দেশে কোন গাইডলাইনও নেই। যার কারণে দিন দিন সড়কে মৃত্যুর হার বাড়ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের জন্স হপকিন্স ইন্টারন্যাশনাল ইনজুরি রিসার্চ ইউনিটের গবেষণা সহযোগী শিরিন ওয়াধানিয়া জানান, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সড়কে মৃত্যুর ৪৮ শতাংশ পথচারী। শুধুমাত্র সড়কে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা না থাকায় এসব মৃত্যুর বড় কারণ বলে মনে করেন তিনি।
- বিষয় :
- বিপদ
