কুঁড়েঘরে সততার জীবন
ফকির চাঁনকে পদক পরিয়ে দিচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সমকাল
এম সেকান্দর হোসাইন সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪২
জেলে ফকির চাঁন দাশ। বয়স ৭০। টানা ৫০ বছর কেটেছে সাগরে, মাছ ধরে। ছোট্ট একটি দরজা-জানালাহীন ঝুপড়ি ঘরে থাকেন পরিবার নিয়ে। অভাব-অনটনে থাকলেও কখনও অসৎ পথে পা বাড়াননি। কখনও মাছ বেশি পেয়েছেন, কখনও কম পেয়েছেন, আবার কখনও ঝুড়ি ছিল খালি। কিন্তু মাছ ধরায় কখনও সরকারি আইন ভঙ্গ করেননি। সবসময় সরকারি বিধিবিধান মেনে সমুদ্রে মাছ ধরেছেন, কখনও নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করেননি। তার সততার সুনাম এলাকাজুড়ে। সেই সততার মূল্যায়ন করেছে রাষ্ট্রও। সীতাকুণ্ড উপজেলায় প্রথম জেলে হিসেবে রাষ্ট্রীয় পদক পেয়েছেন। ‘প্রান্তিক চাষি ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের’ স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই পদক দেওয়া হয়। গত সোমবার রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের হাত থেকে ব্রোঞ্জপদক গ্রহণ করেন ফকির চাঁন। সারাদেশের ১৬ জন জেলে ৯টি ক্যাটেগরিতে এ পদক পান। ফকির চাঁন বলেন, ‘সত্যের পথে ও সততার সঙ্গে জীবনযাপন করেছি বলে রাষ্ট্র আমাকে সম্মানিত করেছে। এই সম্মান সততার। একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে সততার পুরস্কার নেওয়া অনেক বড় সৌভাগ্যের বিষয়।’
ফকির চাঁন নিজে অক্ষরজ্ঞানহীন হলেও পাঁচ মেয়েকেই পড়ালেখা করিয়েছেন। বিয়ে দিয়েছেন তিনজনকে। দুই মেয়ে এখনও পড়ালেখা করছে। কণিকা দাশ স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে ও ছোট মেয়ে পূজা দাশ পড়ে একাদশ শ্রেণিতে। কুমিরা ইউনিয়নের পশ্চিম কাজীপাড়া জেলেপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, ভাঙাচোরা একটি ঝুপড়ি ঘরে বাস করেন ফকির চাঁন। ঘরের চারপাশে ভাঙাচোরা টিনের ঘেরা। চালের ছিদ্র দিয়ে দেখা যাচ্ছে আকাশ। বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য চালের একাংশ ঢেকে দিয়েছেন প্লাস্টিক দিয়ে। সামনে ছোট বারান্দা, ভেতরে বাঁশের বেড়া দিয়ে বানানো চারটি কক্ষ।
নিজে পড়তে না পারলেও মেয়েদের পড়ালেখা করানোর ব্যাপারে ফকির চাঁন বলেন, ‘১৯৮৬ সালে আমার ছোট ভাই কুয়েতে থাকত। তখন ছিল চিঠির যুগ। কিন্তু পড়ালেখা না জানার কারণে ভাইয়ের কাছে কখনও চিঠি লিখতে পারিনি। ভাইয়ের কাছে চিঠি লিখে দেওয়ার জন্য এলাকার এক শিক্ষিত ব্যক্তির কাছে যাই। তিনি অনেক ঘুরিয়ে ১৪ দিন পর আমাকে একটা চিঠি লিখে দেয়। সেদিন প্রতিজ্ঞা করি সন্তানদের পড়ালেখা করিয়ে শিক্ষিত করব। আজ মেয়েরা আমার সেই স্বপ্ন পূরণ করেছে।’
তার মেয়ে কণিকা দাস বলেন, ‘আমাদের অনেক কষ্ট আছে। ঘরে অভাব আছে। কিন্তু বাবা সৎ মানুষ হিসেবে পুরস্কার পেয়েছে দেখে বুকটা গর্বে ফুলে গেছে। সততা টাকা-পয়সার চেয়ে অনেক বড়।’
জেলেপাড়ার বাসিন্দা বিপ্লব জলদাস বলেন, ‘ফকির চাঁন কখনও নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করেননি। সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা সবসময় মেনে চলেন এবং অন্যদেরও মানতে উৎসাহ দেন। অভাব-অনটনের মধ্যেও সন্তানদের শিক্ষিত করেছেন। সরকারের দেওয়া সততার পুরস্কার তার প্রাপ্য। তার এ অর্জন সম্মানিত করেছে এলাকাকে।’
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মোতাছিম বিল্লাহ্ বলেন, ‘বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে ফকির চাঁনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক সরেজমিন কুমিরায় এসে মনোনয়নপ্রাপ্ত ব্যক্তির ঘরবাড়ি দেখে গেছেন। প্রতিবেশী ও স্থানীয় জেলে সর্দারদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সব বিবেচনায় ফকির চাঁনই পুরস্কারের যোগ্য ছিলেন।’
- বিষয় :
- সততা
