ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

চিকিৎসা ছাড়াই ফিরে গেল মর্জিনার অসুস্থ মেয়েটি

চিকিৎসা ছাড়াই ফিরে গেল  মর্জিনার অসুস্থ মেয়েটি
×

.

 আনোয়ারুল হায়দার, নোয়াখালী 

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৩৪

২৭ আগস্ট, দুপুর সাড়ে ১২টা। স্থানীয় মর্জিনা বেগম (৪০) জ্বরে আক্রান্ত মেয়ে তাসলিমাকে (১২) নিয়ে চর ওয়াপদা আল আমিন বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসার জন্য আসেন। এসে দেখেন কমিউনিটি ক্লিনিকে তালা ঝুলছে। মর্জিনা এই প্রতিবেদককে দেখে বলেন, ‘এক ঘণ্টা ধরে ক্লিনিকের সামনে অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে বসে আছি। কর্তব্যরত স্বাস্থ্যকর্মী মো. ইব্রাহিম খলিল রাসেল নেই। ক্লিনিকে তালা ঝুলিয়ে ১১টায় চলে গেছেন বলে শুনেছি। আরও একদিন চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে গেছি।’ চর ওয়াপদা গ্রামের বাসিন্দা ও ক্লিনিকের জন্য ৫ শতক জমিদাতা মো. সামছুদ্দিনের (৪৫) অভিযোগ, ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) রোগীদের কাছ থেকে ১০-২০ টাকা নিয়ে থাকেন। অনিয়মিত আসা-যাওয়া করেন।’ একই এলাকার এক গৃহিণী (৩৫) বলেন, ‘ক্লিনিকে কোনো ওষুধ দেওয়া হয় না। মানুষ এসে খালি হাতে ফিরে যান।’ 
নোয়াখালীর নয় উপজেলায় ৩০২টি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি না থাকায় রোগীরা সেবা পাচ্ছেন না। আবার সিএইচসিপিরা ইচ্ছেমতো আসা-যাওয়া করেন, রোগীর কাছ থেকে টাকা নেন। যথাযথ তদারকির অভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠী চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। 
বুধবার সরেজমিন নোয়াখালী সদর ও সুবর্ণচর উপজেলার বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন করে চিকাৎসার এমন করুণ চিত্র দেখা গেছে। ওয়াপদা আল আমিন বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মো. রাসেল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘গত এক বছর ধরে ক্লিনিকে কোনো ওষুধ সরবরাহ নেই। তাই রোগীরা আসেন না।’ ক্লিনিকে তালা ঝুলানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্য চা-নাশতা খেতে আল আমিন বাজারে যাই। রোগী এলে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরামর্শ দিয়ে বিদায় করে দিই। কারও কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা নেওয়া হয় না।’
নোয়াখালী সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ৯ উপজেলার ৯১ ইউনিয়ন ও ৮ পৌরসভা এলাকায় ৩০২টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪৪টি, সুবর্ণচর উপজেলায় ২৪টি, হাতিয়া উপজেলায় ৪১টি, বেগমগঞ্জ উপজেলায় ৪৮টি, সোনাইমুড়ী উপজেলায় ৩৯টি, চাটখিল উপজেলায় ৩১টি, সেনবাগ উপজেলায় ২৯টি, কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলায় ২৩টি করে মোট ৩০২টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব ক্লিনিকে ১৬৬ জন পুরুষ ও ১২৮ জন নারী সিএইচসিপি কর্মরত রয়েছেন।
প্রান্তিক অঞ্চলের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় সাধারণত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও পুষ্টি সেবা দেওয়া হয়। পাশাপাশি মা, নবজাতক এবং অসুস্থ শিশুর সমন্বিত সেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা এবং প্রাথমিক আঘাতের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ছাড়া বহুমূত্র রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। রোগীরা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে আগে সরবরাহ পেতেন ৩৩ ধরনের ওষুধ। পরবর্তীতে তা ২৭ ধরনে নেমে আসে। বর্তমানে ২২ ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। এ ছাড়াও শিশুদের অপুষ্টির ওষুধ দেওয়া হয়। গত এক বছর ধরে বেশির ভাগ ওষুধ সরবরাহ বন্ধ।
সুবর্ণচর উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় ওষুধ সরবরাহ বন্ধ ছিল। চলতি মাসে চালু হয়েছে। ঢাকা থেকে ওষুধের কার্টন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসে। সেখান থেকে সিএইচসিপিরা ক্লিনিকে ওষুধ নিয়ে যান। নিয়ম অনুযায়ী ওষুধ সরবরাহ না থাকলেও নিয়মিত ক্লিনিক খুলে রোগীদের স্বাস্থ্যশিক্ষা পরামর্শ দেওয়ার বিধান রয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অফিস চলাকালীন ক্লিনিকে তালা ঝুলিয়ে অনুপস্থিত থাকায় চর ওয়াপদা আল আমিন বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মী মো. ইব্রাহিম খলিল রাসেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 
সদর উপজেলার নোয়াখালী ইউনিয়নের পূর্বচর এলাহি কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, সিএইচসিপি ফারহানা ফেরদাউস ও তার একজন সহকারী এক গৃহবধূ ও তার সন্তানকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। চিকিৎসা নিতে আসা ঝর্ণা আক্তার (২৫) বলেন, ‘আমি মুরাদপুর গ্রাম থেকে এসেছি। আমার এক বছর বয়সী সন্তান ইয়াকুব ইসহাকের জ্বর। সিএইচসিপি দেখে প্যারাসিটামল সিরাপ ও ভিটামিন ট্যাবলেট দিয়েছে। ক্লিনিকে নাকি আর কোনো ওষুধ নেই। তবে বাজার থেকে কিনতে বলেছেন। কিন্তু আমার কাছে ওষুধ কেনার মতো টাকা নেই।’ ক্লিনিকে আসা গৃহবধূ ঝর্ণা আক্তার বলেন, ‘আগে এই ক্লিনিকে জ্বর, সর্দি-কাশি এবং পেটে ব্যথার জন্য বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন আর সেই সুবিধা নেই।’ 
সিএইচসিপি ফারহানা ফেরদাউস বলেন, ‘এখানে প্রতিদিন গড়ে ৩০-৩৫ জন রোগী আসেন। 


বর্তমানে পেটের পীড়া ও ব্যাথার ওষুধ নেই। বহুমুত্র রোগ, উচ্চ রক্তচাপের ও এন্টিবায়োটিক ওষুধের সরবরাহও নেই। পেটের পীড়ায় আক্রানন্ত রোগীদের শুধুমাত্র খাবার স্যালাইন দিয়ে থাকি। নারী ও শিশুদের খোঁস-পাঁচড়া, কাটাছেঁড়ার ও চর্ম রোগের জন্য আগে লোশন ও মলম সরবরাহ থাকলেও বর্তমানে তা নেই। আগে প্রতি দেড় মাস অন্তর অন্তর এক কার্টুন করে ওষুধ আসলেও দীর্ঘদিন ধরে তা বন্ধ ছিল। এখানে শিশুদের ও গর্ভবতী মায়েদের ওজন মাপার ওয়েট মেশিনটিও অকেজো। এর ফলে যথাযথ চিকিৎসা সেবা দেওয়া যাচ্ছে না।’ 
সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের হাজির হাট কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায় সিএইচসিপি মো. ইউসুফ ও ক্লিনিকের জন্য জমি দাতা ও ক্লিনিক সভাপতি হাজী মো. নুরুল্লা বসে আছেন। কোন রোগী নেই। মো. ইউসুফ বলেন গত চার মাস ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ ছিল। চলতি মাসের ১০ তারিখে এক কাটুন ওষুধ  পেয়েছি। এর মধ্যে জ্বর, সর্দি–কাশি ও ডায়েরিয়ার জন্য ২০ ধরনের ওষুধ পেয়েছি। দীর্ঘদিন ওষুধ সরবরাহ না থাকায় রোগীর সংখ্যা কমে গেছে।’ মো. ইউসুফ বলেন, ‘গতবছর জুলাই মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা বেতন–ভাতাও পাইনি। দীর্ঘদিন পরিবার পরিজন নিয়ে অর্থকষ্টে ছলাম। বকেয়া বেতন কবে পাব তার কোন নিশ্চয়তা নেই। এরপরও আমরা স্বাস্থ্য শিক্ষা পরামর্শ ও সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’
নোয়াখালী সিভিল সার্জন ডা. মরিয়ম সিমি বলেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিক দেখভাল করার দায়িত্ব সিভিল সার্জনের নয়। এটা হেলথ কেয়ার ট্রাস্ট ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্ব। সিএইচসিপিদের অনিয়ম–দুর্নীতি ও কাজে গাফেলতির বিষয়টিও দেখে ঢাকার হেলথ কেয়ার ট্রাস্ট।’  

আরও পড়ুন

×