তবুও নিরাপত্তায় গলদ বন্দরে
কর্তৃপক্ষ অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের পথে অগ্রসর হলেও নিরাপত্তার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরে সমকাল
সারোয়ার সুমন
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৩৫
চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা জোরদার করতে চলতি বছরেই ই-গেটে পাস সিস্টেম চালু করেছে কর্তৃপক্ষ। পেমেন্টও নিচ্ছে তারা অনলাইনে। অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের অংশ হিসেবে পথে অগ্রসর হচ্ছে। নতুন এ ব্যবস্থায় চালকরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রবেশ ফি পরিশোধ করে কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে নিরাপদ ও দ্রুত ই-গেট প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন। ম্যানুয়াল কিউর পরিবর্তে এ প্রযুক্তি ট্রাফিক প্রবাহ সচল রাখছে এবং কার্গোর রিয়েলটাইম ট্র্যাকিং সুবিধা নিশ্চিত করছে। একইসঙ্গে চালু হয়েছে যানবাহন ট্র্যাকিং ও স্বয়ংক্রিয় বার্থ বরাদ্দ পদ্ধতি। চালু হয়েছে ‘মেরিটাইম সিঙ্গেল উইন্ডো’, যা বাণিজ্য ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করছে। নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে এতসব উদ্যোগ নেওয়ার পরও সুরক্ষিত হচ্ছে না বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। চুরি হচ্ছে কনটেইনারে থাকা পণ্য। গত সপ্তাহেও কনটেইনারে করে বিদেশ যেতে বহিরাগত প্রবেশ করেছে বন্দরে। প্রবেশ করেছে চোরও।
অথচ আন্তর্জাতিক জাহাজ ও বন্দর সুরক্ষা কোড (আইএসপিএস) অনুসরণ করে পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহায়তায় ইন্দো-প্যাসিফিক ইনফরমেশন শেয়ারিং টুল (আইওআরআইএস) প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। ‘আইওআরআইএস’ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি মেরিটাইম ইনফরমেশন শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম, যা ২০১৮ সালে প্রথম চালু হয়। এর মাধ্যমে শুধু তথ্য আদান-প্রদান ছাড়াও রিজিওনাল থ্রেট, হিউম্যান ট্রাফিকিং, নৌপথে অবৈধ চোরাচালান এবং নৌপথের বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জানতে ও জানাতে পারবে একে অপরকে। গত ৩ থেকে ১৩ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আইওআরআইএস বিষয়ক দুটি বিশেষ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। এতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোট ২৮ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নেন।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশে মেরিটাইম সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মূলত এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো ছয়জন মেরিটাইম সিঙ্গল উইন্ডো প্রশিক্ষক তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। তারাই ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম হবেন।’
এদিকে, দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আসে মার্কিন কোস্টগার্ড বাহিনী। তারা আইএসপিএস মনিটরিং সেল, সিসিটিভি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম, রপ্তানি কনটেইনার স্ক্যানার এবং ইস্পাহানি-সামিট অ্যালায়েন্স ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সরেজমিন পরিদর্শন ও মূল্যায়ন করে। রিপোর্টে এবারই প্রথমবারের মতো বন্দর নিয়ে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করেনি তারা। সার্বিক কাজে সন্তোষ প্রকাশ করে তারা। কিন্তু এই টিম যাওয়ার পরই কনটেইনার থেকে চুরি হয়েছে পণ্য। বন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করেছে একাধিক বহিরাগত। এ জন্য বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদারের দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ীরা।
বিজিএমইএর পরিচালক এসএম আবু তৈয়ব বলেন, ‘নিরাপত্তা বাড়াতে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক উদ্যোগ নেওয়ার কথা শুনেছি বন্দর থেকে। কিন্তু এখনও বন্দরের সংরক্ষিত এলাকা থেকে পণ্য চুরি হয়। এত চেক পোস্ট থাকার পরও কনটেইনারে করে বিদেশ পাড়ি দিতে বহিরাগত প্রবেশ করছে বন্দরে। তাহলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিচ্ছিদ্র এটা তো বলতে পারি না আমরা।’
জানতে চাইলে বন্দরের মুখপাত্র ও সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়েছে এখন। তারপরও বিক্ষিপ্ত
কিছু ঘটনা ঘটছে। নিরাপত্তা রক্ষীরা সেটিও ধরে ফেলছে। এমন ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।’ তিনি জানান, দায়িত্বে অবহেলা ও অনৈতিকভাবে টাকা নেওয়ার অভিযোগে গত ২ জুলাই এনসিটি ১ নম্বর গেটে নিরাপত্তারক্ষী আবুল খায়ের এবং এনসিটি-৪ নম্বর গেটে দায়িত্ব পালন করা নিরাপত্তারক্ষী হারুন-অর-রশিদকে সাময়িকভাবে বহিস্কার করা হয়েছে।
এত ব্যবস্থা নেয়ার পরও ২৬ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে বন্দরের ভেতরে এবি ইয়ার্ড সংলগ্ন এলাকা থেকে এক বস্তা স্ক্র্যাপ মালামাল চুরির ঘটনা ঘটে। ৯ জুলাই মধ্যরাতে এনসিটিতে জাল ডেলিভারি চালান ব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে একটি কনটেইনার খালাসের চেষ্টা চলে। গত ২৯ জুলাই রাতে বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল থেকে আমদানি করা ৮৪০ কেজি কিশমিশ পাচারের চেষ্টা করা হয়। ৩১ জুলাই আবারও ডকুমেন্ট জালিয়াতি করে কনটেইনার ডেলিভারির চেষ্টা হয়। এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দরের সহকারী জেটি সরকার মো. আরিফুল ইসলাম।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বন্দরে কনটেইনার গায়েবের ঘটনা ঘটলেও জানাজানি হয় আগস্ট মাসে। ফেব্রুয়ারিতে কাস্টমসের নিলামে ৮৫ লাখ টাকায় প্রায় ২৭ টন ফেব্রিক্সের কনটেইনার কেনেন শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের মালিক সেলিম রেজা। তিনি বন্দরের শুল্ক, দাম এবং চার্জ মিলিয়ে মোট ১ কোটি ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ইয়ার্ডে গেলে তিনি জানতে পারেন কনটেইনারটি নেই।
প্রসঙ্গত, গত ১৬ বছরে কনটেইনারে ঢুকে ও জাহাজে লুকিয়ে ৯ বার বিদেশে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আটজনকে জীবিত ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বন্দর থেকে খালি কনটেইনারের ভেতর লুকিযয়ে জাহাজে বিদেশ পাড়ি দেওয়ার সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি। সর্বশেষ গত বুধবার জাহাজে করে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টার সময় তিনজনকে আটক করা হয়। গতকাল সকালে বন্দরের নিরাপত্তা সদস্যরা মাহফুজ শেখ, আবুল খায়ের, মেহেদি হাসান লাবলু নামে ওই তিনজনকে আটক করে। পরে তাদেরকে বন্দর থানা পুলিশে দেওয়া হয়।
- বিষয় :
- বন্দর থানা
