৯টার ক্লাস শুরু হয় ১০টার পর
সকাল ৯টায় ক্লাস শুরুর কথা, অথচ তখনও খোলা হয়নি ফটক, শিক্ষার্থীরা ঘোরাঘুরি করছে বিদ্যালয়ের বাইরে সমকাল
মুহাম্মদ এরশাদ, চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় পশ্চিম ধোপাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, চারজন শিক্ষার্থী মাঠে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ বিদ্যালয়ের ফটক তখনও তালাবদ্ধ। বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও তিনজন সহকারী শিক্ষক আছেন। কিন্তু সকাল ১০টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষকেরও দেখা মেলেনি। শিক্ষার্থীরা জানায়, সব শিক্ষক কখনও একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে আসেন, কিন্তু থাকেন না।
ফোনে যোগাযোগ করা হলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সজীব চক্রবর্ত্তী মোবাইলে প্রতিবেদককে জানান, তিনি পেটের সমস্যার কারণে বিদ্যালয়ে আসতে পারেননি। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় শিক্ষকদের আসতে দেরি হয়। সেখানে সময়মতো গাড়ি পাওয়া যায় না।
উত্তর ধোপাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা যায়, সকাল ৯টায় ক্লাস শুরু কথা থাকলেও ১০টায়ও শুরু হয়নি। তখন ২৫-৩০ জন শিক্ষার্থী ক্লাসে বসে হৈচৈ করছিল।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আছিয়া বেগম চৌধুরী ও দুজন সহকারী শিক্ষক অফিসে বসেছিলেন। সহকারী শিক্ষক মিনহাজ উদ্দীন ওইদিন ছুটিতে ছিলেন। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে একজন শিক্ষককে একাধিক ক্লাস পড়াতে হয়। আছিয়া বেগম জানান, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ম থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত ১১০ জন। কম উপস্থিতির মূল কারণ অভিভাবকদের অসচেতনতা। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম হওয়ায় যথাসময়ে ক্লাস শুরু করা যায়নি বলে জানান তিনি।
চন্দনাইশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৯১টি। উপজেলার দুর্গম ধোপাছড়ি ইউনিয়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬টি। দীর্ঘদিন ধরে এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট চলছে। যাতায়াত ও আবাসন সমস্যার কারণে শিক্ষকরা সেখানে থাকতে চান না। তারা দেরিতে এসে আগেই বিদ্যালয় ছাড়তে চান। ফলে শিক্ষার মান কমে গেছে। আর স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের ভাষায় বিদ্যালয়গুলোয় অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নগণ্য, জাতীয় পতাকা উত্তোলন অনিয়মিত, অ্যাসেম্বলি ও শ্রেণি কার্যক্রম নিয়মমতো হয় না।
ধোপাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত। বুধবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে পরিদর্শনে দেখা যায়, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক জাওয়াত পাঠদান করছেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান তখনও উপস্থিত হননি। বিভিন্ন শ্রেণিতে ১০-১৫ জন শিক্ষার্থী ছিলেন, আর বাকিরা মাঠে খেলছিল।
শামুকছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনকালে দেখা যায়, খণ্ডকালীন শিক্ষিকা মিনা আকতার একটি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছিলেন। প্রধান শিক্ষক আমির হোসেন জানান, শিক্ষক স্বল্পতা ও আবাসন সমস্যার কারণে শিক্ষার মান উন্নত করা যাচ্ছে না। বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষক রয়েছেন, কিন্তু দুর্গম এলাকা হওয়ায় দুজন শিক্ষক অন্য বিদ্যালয়ে চলে গেছেন। তিনি বলেন, খাবার ও আবাসন ব্যবস্থা থাকলে শিক্ষার্থীরা স্কুলমুখী হবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সদস্য আবদুল মান্নান রানা বলেন, ‘স্থানীয় শিক্ষক না থাকায় বাইরের শিক্ষকরা দীর্ঘসময় এখানে থাকতে চান না। ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ক্লাস পরিচালনার জন্য বাধ্য হয়ে উচ্চ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়োগ দিতে হয়।’ স্থানীয় আমিনুল ইসলাম জানান, চিরিংঘাটা ও উত্তর মংলারমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে আসেন এবং দুপুর ১টা-২টার মধ্যে চলে যান।
উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ইলিয়াছ হোসেন এ ব্যাপারে বলেন, ‘আমি গত মাসে ধোপাছড়ির শামুকছড়ি, পশ্চিম ধোপাছড়ি ও ধোপাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছি। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় কয়েক মাস চাকরি করে অন্য জায়গায় চলে যান। ফলে শিক্ষক স্বল্পতা লেগেই থাকে।’
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কবির হোসেন বলেন, ‘যেসব বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ আছে, সেসব বিদ্যালয় নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। তবে দুর্গম এলাকা হওয়ায় যাতায়াত ও আবাসন সমস্যার কারণে শিক্ষক স্থায়ীভাবে বিদ্যালয়ে থাকতে চান না। স্থানীয় শিক্ষক নিয়োগ ও আবাসন ব্যবস্থা ভালো হলে শিক্ষক সংকট থাকবে না।’
- বিষয় :
- স্কুলছাত্র
