ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বাবার কণ্ঠ শুনে কেঁদে উঠল ছোট্ট মেয়েটি

কারাগারে বন্দিদের সাক্ষাতে ইন্টারকম ব্যবস্থা চালু

বাবার কণ্ঠ শুনে কেঁদে  উঠল ছোট্ট মেয়েটি
×

কারাগারে বন্দি বাবার সঙ্গে কথা বলছে ছোট্ট একটি মেয়ে সমকাল

 শৈবাল আচার্য্য

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ০৬:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘বাবা আমি তোমার আদিবা বলছি। তুমি কেমন আছো বাবা। তোমার জন্য আমার খুব মন খারাপ হয়। তোমাকে খুব মিস করি।’ আরেক পাশ থেকে বাবা বলছেন, ‘মা আমি ভালো আছি। তোমার জন্যও আমার খুব পেট পোড়ে। কতদিন পর আজ তোমার কণ্ঠস্বরটা শুনলাম। মনটা ভরে গেল মা।’ 
এই কথোপকথন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি এক বাবার সঙ্গে তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ের। দীর্ঘদিন পর এভাবে সরাসরি কথা বলতে পেরে বাবা-মেয়ে দুজনই আনন্দিত। অবশ্য তাদের মতো আনন্দিত শত বন্দি। দীর্ঘদিন পর বন্দি ও তাদের স্বজনদের মধ্যে নির্বিঘ্ন কথোপকথনের জন্য চট্টগ্রাম কারাগারে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে ‘ওয়ান-টু-ওয়ান ইন্টারকম টেলিফোন’ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে নির্ধারিত বুথে দাঁড়িয়ে স্বজন ও বন্দিরা সরাসরি কথা বলতে পারছেন। এতে করে লোহার জালের দুই পারের চিৎকারের দিনও শেষ হলো। 

বন্দির স্বজনরা বলছেন, ‘ওয়ান-টু-ওয়ান ইন্টারকম টেলিফোন’ ব্যবস্থার কারণে অনেক মানুষের ভিড়ের মধ্যে গলা ফাটিয়ে কথা বলার দুর্ভোগের অবসান ঘটল চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে। এখন আর গ্রিলের দুই পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কথা বলতে হচ্ছে না। বন্দি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নির্বিঘ্নে, স্বচ্ছভাবে কথা বলার এমন সুযোগটি করে দিতে ব্যতিক্রমী এই মানবিক উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তাঁর উদ্যোগেই আলোর মুখ দেখল এটি। গত ৫ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে সেবাটির উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক।
হত্যা মামলায় প্রায় এক বছর ধরে বন্দি চট্টগ্রাম নগরের খুলশির আমবাগান এলাকার দেলোয়ার হোসেন বাবুলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন তাঁর স্ত্রী রুমা আক্তার, ছেলে ও পরিবারের সদস্যরা। সাক্ষাৎ শেষে রুমা আক্তার বলেন, ‘আগে কারাগারে বন্দি থাকা প্রিয়জনের সঙ্গে বলতে অনেক ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হতো। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও ওপাশ থেকে কী বলছে, আর আমি এপাশ থেকে কী বলছি তা উভয়ই ভালোভাবে বুঝতে পারতাম না। তবে ইন্টারকমে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বললাম। আমি যেমন অপর পাশ থেকে কথা ভালোভাবে শুনতে পেরেছি, আমার কথাও উনি শুনেছেন। সত্যি আজ কথা বলে মনে হয়েছে যেন অনেকদিন পর একে অপরের সঙ্গে সামনা-সামনি কথা বলছি। প্রিয় বাবার সঙ্গে কথা বলে আমার মতো ছেলেটাও খুব খুশি।’

রাজনৈতিক মামলায় বন্দি হালিশহরের বাসিন্দা মো. শাহাদাৎ হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে এসে তাঁর ভাই মো. আব্বাস উদ্দিন বলেন, ‘এতদিন গলা ফাটিয়ে কথা বললেও তা ভালোভাবে শোনা যেত 
না। একই কথা কয়েকবার চিৎকার করে বলতাম। কিন্তু সেভাবে বুঝা যেত না। তবে আজ অনেক শান্তিতে প্রিয় ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে পেরে অন্যরকম ভালো লাগছে।’ বাবার সঙ্গে কথা বলার পর ছোট্ট আদিবা বলে, ‘বাবাটা কারাগারে বন্দী থাকায় মনটা খুব খারাপ। সবাই বাবা বাবা বলে ডাকতে পারলেও আমি পারি না। মার সঙ্গে কারাগারে কথা বলতে আসলেও অনেক মানুষের ভিড় ও শব্দে বাবার সঙ্গে মনভরে কথা বলতে পারতাম না। তাই মন খারাপ করে চলে যেতাম। তবে আজ মনভরে বাবার সঙ্গে কথা বলেছি। খুব সহজে অনেকদিন পর বাবার কণ্ঠস্বরটা শুনেছি। মনে হয়েছে বাবার সঙ্গে পাশাপাশি বসে কথা বলছি।’
পাইলট প্রকল্প হিসেবে কারাগারের নিচতলায় দুই পাশে ১৬টি করে মোট ৩২টি ইন্টারকম স্থাপন করা হয়েছে—এর মধ্যে ১২টি পুরুষ ও ৪টি মহিলা বন্দীদের জন্য বরাদ্দ। পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় তলাতেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “এখন থেকে বন্দী ও তাদের স্বজনদের আর চিৎকার করে একে অপরের সাথে কথা বলতে হবে না। ওয়ান-টু-ওয়ান ইন্টারকম টেলিফোন ব্যবস্থার কারণে স্বাভাবিক গতি ফিরে এসেছে উভয়ের কথোপকথনে। সারাদেশের কারাগারের মধ্যে চট্টগ্রাম কারাগারেই প্রথম এত বড় পরিসরে এই ব্যবস্থা চালু হলো।’
বর্তমানে এই কারাগারে ৬ হাজার ৪৫৫ জন বন্দী রয়েছেন। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক স্বজন সাক্ষাতে আসেন। ভিড় ও শব্দের কারণে এতদিন অনেকেই ঠিকমতো কথা বলতে পারতেন না। 

আরও পড়ুন

×