ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

২৫০ জন থেকে ৫০ লাখ টাকা ধার নিয়ে উধাও শিক্ষক

২৫০ জন থেকে  ৫০ লাখ টাকা ধার  নিয়ে উধাও শিক্ষক
×

 দিলদার হোসেন স্বপন, ফেনী

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ফেনীর ফুলগাজীতে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ২৫০ জনের কাছ থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন এক স্কুলশিক্ষক। অভিযুক্ত মোহাম্মদ রাকিব উদ্দিন ফুলগাজী পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। বাড়ি চাঁদপুরের দক্ষিণ মতলব উপজেলার কাচিয়ারা গ্রামে। ফুলগাজী উপজেলা সদরে ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন তিনি। সর্বশেষ ২০ মার্চ পর্যন্ত বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন। বর্তমানে তার বাসায় তালা ঝুলছে এবং মোবাইল ফোন নম্বরও বন্ধ রয়েছে। স্ত্রী ও দশম শ্রেণিতে পড়া শিক্ষার্থী মেয়েকে নিয়ে তিনি পলাতক রয়েছেন।

ফুলগাজী পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন বলেন, ‘প্রাইভেট পড়ানোর সুবাদে অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষক রাকিবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তিনি কাউকে বাদ দেননি, সবার কাছ থেকেই টাকা নিয়েছেন। তাকে শোকজ করা হয়েছে। কুমিল্লার মতলবে গ্রামের বাড়িতে লোক পাঠিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত ৪৭টি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি, মৌখিকভাবে দুই শতাধিক ব্যক্তি অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি ম্যানেজিং কমিটি, থানা ও উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।’

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই রাকিব উদ্দিন শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন। দিন-রাত প্রাইভেট পড়ানোর মাধ্যমে অভিভাবকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বিশেষ করে প্রবাসী পরিবারগুলো ছিল তার মূল টার্গেট। সহকর্মী শিক্ষকদের কাছেও আস্থা অর্জন করেন তিনি। অল্প সময়েই ‘প্রিয় শিক্ষক’ হিসেবে পরিচিতি পান। এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রতারণার ফাঁদ পাতেন। বাবা-মায়ের অসুস্থতা, পারিবারিক সংকট কিংবা জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে প্রথমে অল্প অল্প করে টাকা ধার নিতেন। ধারের বিষয়টি কাউকে না জানাতে অনুরোধ করতেন এবং শুরুতে সময়মতো টাকা ফেরত দিয়ে বিশ্বাস অর্জন করতেন।
পরে সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করে ধাপে ধাপে বড় অঙ্কের টাকা সংগ্রহ করতে থাকেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জনের কাছ থেকে তিনি টাকা নিয়েছেন, যার বেশির ভাগই নারী অভিভাবক। সহকর্মীরাও বাদ যাননি তার প্রতারণা থেকে। 

সহকর্মীদের মধ্যে শিক্ষক কমল চন্দ্র দে জানান, বাবার চিকিৎসার কথা বলে তার কাছ থেকে ধাপে ধাপে ৫ লাখ ৩৮ হাজার টাকা নেন রাকিব। সমাজবিজ্ঞান শিক্ষক সুজন চন্দ্র দেবনাথের কাছ থেকে নেন ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, সিনিয়র শিক্ষক সামছুন্নাহারের কাছ থেকে ৪ লাখ ও প্রণব কুমার বণিকের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নেন। এছাড়া, স্থানীয় এক রাজমিস্ত্রির কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা ও  ফুলগাজী বাজারের এক সেলুন কর্মীর কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ধার নিয়ে ফেরত দেননি। অনেক নারী অভিভাবক স্বামীদের না জানিয়ে টাকা দিয়েছেন, যা এখন পারিবারিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা তথ্যমতে, উম্মে ফাতেমা সুরভি নামের এক শিক্ষার্থীর মায়ের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ধার নিয়ে ফেরত দেননি শিক্ষক রাকিব। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সুভার মায়ের কাছ থেকে নেন ১০ হাজার টাকা। ফারিয়ার মায়ের কাছ থেকে ১০ হাজার, তাসরিফার মায়ের কাছ থেকে ৫ হাজার, তাসমিনার কাছ থেকে ২০ হাজার, সাদিয়া সুলতানার কাছ থেকে ১৩ হাজার, নুরজাহানের কাছ থেকে ২০ হাজার, সানজিদার কাছ থেকে ২ হাজার, সামিয়ার কাছ থেকে ৫ হাজার, নুসরাতের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেন।
ফুলগাজী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এস এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনো লিখিত কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে বিভিন্ন সূত্রে শুনেছি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন

×