ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিক্ষক ৪ জন, শিক্ষার্থী পাঁচ, ১২টায় ফাঁকা বিদ্যালয়

শিক্ষক ৪ জন, শিক্ষার্থী পাঁচ, ১২টায় ফাঁকা বিদ্যালয়
×

মধ্য বোয়ালিয়া হরকুমার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে তিনজন শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন শিক্ষক সমকাল

 আনোয়ারুল হায়দার, হাতিয়া (নোয়াখালী) থেকে ফিরে

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০০ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

৩০ মার্চ দুপুর পৌনে ১টায় বোয়ালিয়া হরকুমার দাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক অনুপস্থিত। তৃতীয় শ্রেণিতে ৩ জন শিক্ষার্থী বসে আছে। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে সহকারী শিক্ষক অনুপ চন্দ্র দাস পায়চারি করছেন। চতুর্থ শ্রেণিতে কোনো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নেই। পঞ্চম শ্রেণিতে সহকারী শিক্ষক স্বপনা রানী দাস বসে আছেন, কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী নেই।

এই বিদ্যালয়ে ৬ জন শিক্ষকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ৪ জন। সহকারী শিক্ষক জেরি রানী দাস মাতৃত্ব ছুটিতে রয়েছেন। প্রধান শিক্ষক জরুরি কাজে উপজেলা শিক্ষা অফিসে গেছেন বলে জানান শিক্ষক অনুপ চন্দ্র দাস। 

১৯৯০ সালে ৩৩ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত আধুনিক ভবন ও ওয়াশ ব্লক সংবলিত এই বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কাগজে-কলমে ৩০ জন হলেও বাস্তবে আছে মাত্র ৫ জন। সহকারী শিক্ষক স্বপনা রানী দাস বলেন, ‘পঞ্চম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। তাই আমি একাই শ্রেণিকক্ষে বসি আছি।’ মধ্য বোয়ালিয়া হরকুমার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন শিক্ষক।

স্থানীয় আমিন হোসেন, নীরব উদ্দিন, মো. বাদশা জানান, এই বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে ৩ জন আর চতুর্থ শ্রেণিতে ২ জনসহ মোট ৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রথম, দ্বিতীয় ও পঞ্চম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের ইচ্ছেমতো বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া ও পাঠদানে অবহেলার কারণে স্থানীয় অভিভাবকরা তাদের ছেলেমেয়েদের দূরের প্রাথমিক বিদ্যালয় বা মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রত্নেশ্বর রায় অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘৩০ মার্চ আমি জরুরি কাজে উপজেলা শিক্ষা অফিসে গিয়েছি। আমি নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসি। বিদ্যালয়ে ৩০ জন শিক্ষার্থী আছে।’

নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা ভেঙে পড়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না, ইচ্ছেমতো বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করেন। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত শ্রেণি কার্যক্রম চলার কথা থাকলেও দুপুর ১২টায় অধিকাংশ বিদ্যালয় ছুটি হয়ে যায়। পাঠদানে শিক্ষকদের অবহেলা ও বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। কর্তৃপক্ষেরও কোনো তদারকি নেই।

৩০ মার্চ দুপুর সোয়া ১২টা। হাতিয়া উপজেলার চরকিং ইউনিয়নের দক্ষিণ-পশ্চিম বোয়ালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা যায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে। কেউ কেউ বারান্দায়, কেউ মাঠে ঘোরাফেরা করছে। ক্লাস না করে বাইরে ঘোরাফেরা করছ কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলল, ‘আমাদের হেড স্যার আজ স্কুলে আসেননি, ক্লাস হচ্ছে না।’

বিদ্যালয়ের পিয়ন রাশেদ উদ্দিন নিচে দাঁড়িয়ে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর পিয়ন গিয়ে দোয়ালিয়া বাজার থেকে প্রধান শিক্ষক রিপন চন্দ্র দাসকে ডেকে আনেন। বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় দেখা যায়, সহকারী শিক্ষিকা শাবনুর আক্তার চতুর্থ শ্রেণির ৭-৮ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করাচ্ছেন। তৃতীয় শ্রেণিতে  শিক্ষক-শিক্ষার্থী কেউ নেই। 

জানা গেল, সহকারী শিক্ষক রোকসানা আক্তার বিদ্যালয়ে আসেননি। তিনি ৩১ মার্চ থেকে ৩ দিনের ছুটি আবেদন করেছেন, কিন্তু অনুপস্থিত ৩০ মার্চ বিদ্যালয়ে। রোকসানা আক্তারের মোবাইলে কল করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রিপন চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমি চা খেতে কিছু সময়ের জন্য দোয়ালিয়া বাজারে গিয়েছিলাম। সহকারী শিক্ষিকা রোকসানা আক্তার ৩দিনের ছুটি নিয়ে কিছুক্ষণ আগে বিদ্যালয় ত্যাগ করেছেন।’

প্রধান শিক্ষক রিপন চন্দ্র দাস বলেন, ‘১৯৪০ সালে ৮০ শত জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে ৬ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ৩ জন। বিদ্যালয়ে ২১২ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। জানালেও বাস্তবে ২০ জন শিক্ষার্থীকেও দেখা যায়নি। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পানি পানের জন্য নেই নলকূপ, নেই স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশ ব্লক। রয়েছে আসবাবপত্র ও শ্রেণীকক্ষের সংকট। ঝুঁকিপূর্ণ দুটি ভবনে পাঠদান করতে হয়। দ্বিতল ভবনটির বিম ও পিলারের পলেস্তরা খসে পড়ছে, রড বের হয়ে আছে। একটি ভবন ২০১১ সালে ও অপরটি ২০১৪ সালে নির্মাণ করা হলেও ১২-১৪ বছরেই এগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।’ 

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১০টি ইউনিয়নে ২২৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে ১ হাজার ২৬৮ জন শিক্ষকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮ জন শিক্ষকের পদ শূন্য। বিদ্যালয়ের পাঠদান ও শ্রেণীকার্যক্রম পরিদর্শনের জন্য ৮ জন উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা থাকার কথা। কিন্তু কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২ জন। 

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আবদুল জব্বার বলেন, ‘কোন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘মাত্র দুইজন সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দিয়ে ২২৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তদারকি করা কঠিন।’

আরও পড়ুন

×