জীর্ণ বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে পড়ান তারা
নারানগিরি সীতা পাহাড় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান করছেন সাইনুচিং মারমা সমকাল
কাপ্তাই (রাঙামাটি) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাহাড়ের বুক চিরে সূর্য ওঠে, আবার পাহাড়ের আড়ালেই হারিয়ে যায়। কিন্তু সীতা পাহাড় এলাকার শতাধিক মারমা পরিবারের অর্ধ সহস্র মানুষের জীবন বড় অন্ধকার। দুর্গম পাহাড়ি পথ, সুপেয় পানির সংকট আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে মানবেতর জীবন কাটছে এখানকার বাসিন্দাদের। আধুনিক শিক্ষা ও নাগরিক সুবিধা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন রাইখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের নারানগিরি সীতা পাহাড় পাড়ার মানুষ।
কাপ্তাই উপজেলা সদর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে হলেও সেখানে পৌঁছাতে নেই কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ হেঁটেই চলাচল করতে হয় স্থানীয়দের। ফলে কোমলমতি শিশুদের জন্য প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়ে উঠেছে চরম দুর্ভোগের বিষয়।
তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছেন এলাকার দুই শিক্ষিত তরুণ-তরুণী অংসাচিং মারমা ও সাইনুচিং মারমা। কোনো ধরনের বেতন-ভাতা বা সরকারি সহায়তা ছাড়াই তারা জরাজীর্ণ একটি বেড়ার ঘরে শিশুদের পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। অংসাচিং মারমা বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা ছাড়া এই জনপদের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই নানা কষ্টের মধ্যেও শিশুদের পড়ানো বন্ধ করিনি।’
বর্তমানে এলাকার শিশুদের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় ডলুছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দীর্ঘ পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে গিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে তারা। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী উক্যহ্লা মারমা বলে, ‘অনেক কষ্ট করে প্রতিদিন পাহাড়ি পথ হেঁটে স্কুলে যাই। দিন শেষে শরীর আর চলে না।’ একই কথা চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী মায়ইনু মারমার কণ্ঠেও। তার বাবা থোয়্যাজ্ঞ মারমা ও মা ক্রইনুংমা মারমা বলেন, ‘আমরা দিনমজুর মানুষ। সন্তানদের এত দূরে স্কুলে পাঠিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকি। এলাকায় একটি স্কুল হলে আমাদের ছেলেমেয়েরা ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারত।’
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে ‘সংগ্রাম’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থা ওই এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। দীর্ঘদিন সেটিই ছিল শিশুদের শিক্ষার একমাত্র ভরসা। পরে জেলা পরিষদের মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়া হলেও অজ্ঞাত কারণে প্রায় পাঁচ বছর আগে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যায়। এতে অন্তত ৬৫ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। শিক্ষা সংকটের পাশাপাশি এলাকাটিতে রয়েছে সুপেয় পানির তীব্র অভাব। শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ি ছড়াগুলো শুকিয়ে গেলে পানির জন্য চরম দুর্ভোগে পড়েন বাসিন্দারা। আর বর্ষা মৌসুমে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঘোলা ও দূষিত পানি পান করতে বাধ্য হন তারা। এতে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। সীতা পাহাড় এলাকার কারবারি পাইচিংমং মারমা এবং স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ক্যথোয়াই অং মারমা সরকারের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, “আমাদের স্বপ্ন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। একটি স্থায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করে শিশুদের বাঁচানোর উদ্যোগ নিন।” স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—পাহাড়ের এই অবহেলিত জনপদ কি অন্ধকারেই পড়ে থাকবে, নাকি প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগে নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে? সেই প্রত্যাশায় দিন গুনছেন সীতা পাহাড়ের বাসিন্দারা। এ বিষয়ে কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, “দুর্গম পাহাড়ি পথ হওয়ায় এলাকাটি পরিদর্শনে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তারপরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।” উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন,
“ডলুছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এলাকাটি অনেক দূরে এবং যাতায়াত অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইতোমধ্যে জেলা শিক্ষা অধিদপ্তরে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।”
- বিষয় :
- বিদ্যালয়
