টেকনাফে সন্দেহজনক ৩৬৮ এনআইডি নিয়ে তদন্ত
কৃষক ফরিদ আলমকে বাবা বানিয়ে ভুয়া এনআইডি তৈরি করেছেন রোহিঙ্গা রহিম উল্লাহ। সরকারি চাল পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ফরিদের এনআইডি হাতিয়ে এ জালিয়াতি করেন রহিম - সমকাল
আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ১১:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
টেকনাফে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট তৈরির সংঘবদ্ধ একটি চক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়ে এনআইডি ও পাসপোর্ট পাইয়ে দিচ্ছে এই চক্র। গত ১৭ মে দৈনিক সমকালের প্রিয় চট্টগ্রাম পাতায় এ বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে নির্বাচন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন। ইতোমধ্যে শাহপরীর দ্বীপের তিনটি ওয়ার্ডের ৩৬৮টি সন্দেহভাজন এনআইডির তদন্ত শুরু হয়েছে।
পরিচয় গোপন রেখে এই প্রতিবেদক টেকনাফের সাবরাং এলাকার চক্রটির এক সক্রিয় সদস্য মোহাম্মদ ইরফানের সঙ্গে কথা বলেন। আলাপকালে তিনি দাবি করেন, ‘শুধু এনআইডি বানালে এক রেট, আর এনআইডির সঙ্গে পাসপোর্ট করলে আরেক রেট। একসঙ্গে দুটো করালে খরচও কিছুটা কম হবে। শুধু নাম দিলেই হবে, বাবা-মায়ের পরিচয়, ঠিকানা সব আমরা তৈরি করে দেব। সর্বোচ্চ ১০ দিনের মধ্যে একজন রোহিঙ্গাকেও বাংলাদেশি পরিচয়ে এনআইডি ও পাসপোর্ট পাইয়ে দেওয়া সম্ভব। অগ্রিম টাকাও লাগবে না।’
প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে ইরফান বলেন, ‘প্রথমে এনআইডির জন্য অন্য উপজেলা পেকুয়ায় গিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে হবে। এরপর ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। পাসপোর্টের জন্য যেতে হবে চট্টগ্রামে। কোনো ঝামেলা হবে না। বাকি প্রায় তিন লাখ টাকা এনআইডি ও পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পর দিলেই হবে।’
তিনি আরও দাবি করেন, ‘এই টাকা একজনের কাছে যায় না। পাঁচ থেকে ছয় স্তরে ভাগ হয়। অনেকে এনআইডি-পাসপোর্ট করে দেওয়ার কথা বললেও কাজ শেষ করতে পারে না। আমাদের সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। শক্তিশালী নেটওয়ার্ক থাকায় আবেদনকারীদের কোনো ঝামেলা হয় না।’
পরে সাংবাদিক পরিচয় জানার পর তিনি এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অভিযোগও অস্বীকার করেন। তাঁর বাড়ি টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের পুরানপাড়া ও জাদিমুড়া এলাকায়।
এই চক্রে টেকনাফের মো. হুমায়ুন, জাহেদ উল্লাহ, মো. ফয়সাল, ফয়েজ উল্লাহ, নুর হাসান, মোহাম্মদ সৈয়দু, শামসুদ্দিন মির্জা, রমজান আলী, মো. রাকিব এবং নির্বাচন অফিসের সাবেক ডেটা এন্ট্রি অপারেটর নাঈম উদ্দিনসহ একাধিক দালাল ও রোহিঙ্গা মধ্যস্থতাকারী সক্রিয় বলে অভিযোগ আছে।
তদন্তের আওতায় ৩৬৮ এনআইডি
দৈনিক সমকালের প্রিয় চট্টগ্রাম পাতায় ‘টেকনাফে ভুয়া এনআইডি বাণিজ্য’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর নির্বাচন বিভাগ ও প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। বর্তমানে শাহপরীর দ্বীপের তিনটি ওয়ার্ডের ৩৬৮টি সন্দেহভাজন জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র জাল কাগজপত্র, ভুয়া তথ্য ও প্রতারণার মাধ্যমে বাংলাদেশি পরিচয়পত্র সংগ্রহে সহায়তা করে আসছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কম্পিউটার ব্যবসায়ী বলেন, ‘শাহপরীর দ্বীপকেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরির সঙ্গে জড়িত। তাদের অন্যতম সক্রিয় সদস্য জাহেদ উল্লাহ। টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ব্যক্তির জন্য অবৈধভাবে এনআইডি ও পাসপোর্টের ব্যবস্থা করা হয়। শুধু শাহপরীর দ্বীপেই কয়েক হাজার ভুয়া ভোটার থাকতে পারে। এ কাজে কিছু অসাধু জনপ্রতিনিধি, নির্বাচন অফিস ও ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। শুধু ভুয়া এনআইডিধারীদের নয়, এ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত দালাল চক্র ও সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।’
জাহেদ উল্লাহকে ঘিরে নানা অভিযোগ
শাহপরীর দ্বীপের মাঝেরপাড়ার বাসিন্দা জাহেদ উল্লাহর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া এনআইডি তৈরির সিন্ডিকেটে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তদন্তাধীন ৩৬৮টি এনআইডির পাশাপাশি পূর্বে তৈরি হওয়া ২০৬টি সন্দেহভাজন ভুয়া এনআইডি তৈরির সঙ্গেও তার নাম আলোচনায় রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর
আগেও জাহেদ উল্লাহ (স্থানীয়ভাবে ‘জায়তুল্লাহ’ নামে পরিচিত) মাছ ধরা, মুদির দোকান ও সিএনজি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বর্তমানে তাঁর নামে-বেনামে জমি, ট্রলারসহ বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার বিষয়টি এলাকায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া জন্মনিবন্ধন, এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে তিনি এসব সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জাহেদ উল্লাহ সমকালকে বলেন, ‘আমি কোনো সময় এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’
সাবেক ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের নামও আলোচনায়
ভুয়া এনআইডি তৈরির অভিযোগে নির্বাচন অফিসের সাবেক ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নাঈম উদ্দিনের নামও সামনে এসেছে। বর্তমানে তিনি পেকুয়ায় কর্মরত। অভিযোগ রয়েছে, টেকনাফ উপজেলা পরিষদ চত্বরে থাকা মুদি দোকানে আবেদনকারীদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হতো। পরে সুযোগ বুঝে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ছবি তোলার কাজ সম্পন্ন করা হতো। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বর্তমানে তদন্তাধীন ৩৬৮টি সন্দেহভাজন এনআইডির বেশিরভাগই তাঁর দায়িত্ব পালনকালে তৈরি হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে নাঈম উদ্দিন বলেন, ‘ভুয়া এনআইডি তৈরির সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করেছি।’
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, ‘জাহেদ স্থানীয়ভাবে সক্রিয় দালালদের একজন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে শুধু সে নয়, আরও কয়েকজন এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আমার ওয়ার্ডে দুই শতাধিক এনআইডির মধ্যে অধিকাংশই ভুয়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ শাহপরীর দ্বীপের ইউপি সদস্য রেজাউল করিম রেজু বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের ভুয়া এনআইডিগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। প্রাথমিকভাবে অধিকাংশই ভুয়া হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। তদন্ত এখনো চলমান।’
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সালাউদ্দীন আল-আজাদ বলেন, ‘ভুয়া এনআইডির তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহের অভিযোগে ৩৬৮ জনের বিষয়ে পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত চলছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুধু ভুয়া এনআইডি ব্যবহারকারীদের নয়, এসব পরিচয়পত্র তৈরির সঙ্গে জড়িত দালাল, মধ্যস্থতাকারী ও সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।’