ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

দাঁড়িয়ে আছে সেতু, নেই চলার পথ

দাঁড়িয়ে আছে সেতু, নেই চলার পথ
×

সংযোগ সড়ক নির্মিত না হওয়ায় ফটিকছড়ির পশ্চিম আঁধারমানিক পশ্চিম ত্রিপুরাপাড়ায় যাওয়ার সেতুটি কোনো কাজে আসছে না সমকাল

 ইকবাল হোসেন মনজু, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

খালের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি কংক্রিটের সেতু। দেখে মনে হয়, এ পথ দিয়েই হয়তো প্রতিদিন মানুষের যাতায়াত, শিশুদের স্কুলে যাওয়া, কৃষকের ফসলের গাড়ি কিংবা রোগী নিয়ে ছুটে চলা অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। সেতুর দুই প্রান্তে নেই কোনো সংযোগ সড়ক। এক পাশে উঁচু কংক্রিটের ঢাল, অন্য পাশে ভাঙা মাটি আর আগাছার ঝোপ। তাই প্রায় এক দশক ধরে মানুষের কাজে না লেগে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে সেতুটি– সরকারি অর্থ ব্যয়ের এক নীরব সাক্ষী হয়ে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম আঁধারমানিক পশ্চিম ত্রিপুরাপাড়ায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্র জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ফটিকছড়ি খালের ওপর ৩৬ ফুট দৈর্ঘ্যের সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তৈয়ব এন্টারপ্রাইজ নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করলেও প্রথম বছরের বন্যায় সংযোগ সড়ক ভেঙে যায়। এরপর আর তা পুনর্নির্মাণ হয়নি।
সরেজমিন দেখা যায়, সেতুর ওপর ধুলাবালি জমেছে, দুই পাশে জন্মেছে ঝোপঝাড়। কোথাও মানুষের পায়ের ছাপ নেই। অথচ একটু দূরেই কয়েকজন স্কুলশিক্ষার্থী জুতা হাতে নিয়ে বাঁশের সাঁকো পার হচ্ছে। কৃষকরা কাঁধে ফসল তুলে খাল পেরোচ্ছেন। বর্ষাকালে এই পথই হয়ে ওঠে সবচেয়ে ভয়ংকর।
এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল পশ্চিম আঁধারমানিক, উজানপাড়া, টিলাপাড়া, দবলী ছাড়াকুল, মাঝেরপাড়া ও নামারপাড়াসহ অন্তত ছয়টি পাড়ার কয়েক হাজার মানুষ। সেতু ব্যবহার করতে না পেরে প্রতিদিন তাদের বাঁশের সাঁকো, অস্থায়ী ঘাট কিংবা সরু কাদামাটির পথ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। এলাকার শিব ও কালীমন্দিরে যাতায়াতকারী ভক্তদেরও একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা বিরেন্দ্র মাঝি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘সেতুটা আমাদের চোখের সামনেই আছে, কিন্তু কোনো উপকারে আসে না। বর্ষায় খাল পার হতে গেলে বুক কেঁপে ওঠে। কখন কী হয়, সেই ভয় নিয়েই চলতে হয়।’
মানস ত্রিপুরা ও বিকাশ বৈদ্য বলেন, ‘বৃদ্ধ মানুষ, গর্ভবতী নারী কিংবা অসুস্থ কাউকে খাল পার করানো সবচেয়ে কঠিন। সেতুটি চালু থাকলে আমাদের জীবন অনেক সহজ হতো।’
কৃষক উত্তম কুমার ও রতন জানান, ফসল বাজারে নিতে অতিরিক্ত সময় ও খরচ হচ্ছে। অনেক সময় বর্ষায় পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। তাদের ভাষায়, ‘সেতু আছে, কিন্তু ব্যবহার করতে না পারার কষ্টটা আরও বেশি।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পনার ঘাটতির কারণেই সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি আজও জনসাধারণের কোনো কাজে আসছে না। বছরের পর বছর ধরে তারা সংযোগ সড়ক নির্মাণের দাবি জানিয়ে এলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
হারুয়ালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সংযোগ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে খালের বর্তমান প্রস্থ বিবেচনায় নতুন পরিকল্পনায় বড় সেতু নির্মাণের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাহাড়, খাল আর সবুজে ঘেরা এই জনপদের মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়– শুধু একটি ব্যবহারযোগ্য সেতু। যে সেতু পার হয়ে শিশুরা নিরাপদে স্কুলে যাবে, কৃষক সহজে ফসল বাজারে নিতে পারবেন, অসুস্থ মানুষ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে পারবেন। প্রায় ১০ বছর ধরে সেই অপেক্ষাতেই দিন গুনছেন ছয় পাড়ার হাজারো মানুষ।

আরও পড়ুন

×