ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

একটি ঘর, একটি স্বপ্ন পূরণ

একটি ঘর, একটি স্বপ্ন পূরণ
×

ঘর পেয়ে দারুণ খুশি চন্দ্রলাল তনচংগ্যা ও ফুলবী তনচংগ্যা দম্পতি সমকাল

 কাপ্তাই (রাঙামাটি) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষা এলেই টিনের চালের অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে টুপটাপ পানি পড়ত ঘরের ভেতর। মাটির মেঝে কাদায় ভরে যেত, ভিজে যেত বিছানা-বালিশ। জরাজীর্ণ বাঁশের খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ঘরটি যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে– এমন আতঙ্কে দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে রাত কাটাতেন চন্দ্রলাল তনচংগ্যা ও ফুলবী তনচংগ্যা দম্পতি। দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তায় কাটছিল তাদের জীবন। তবে এক মানবিক উদ্যোগে সেই কষ্টের অবসান হয়েছে। জাতীয় সাইক্লিস্ট ও ক্রীড়াব্যক্তিত্ব রাকিবুল ইসলামের উদ্যোগে তারা পেয়েছেন একটি নতুন, নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য ঘর।
রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার ওয়াগ্গা ইউনিয়নের কাঁঠালতলী এলাকার এই দরিদ্র পরিবারের জন্য প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নতুন ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। রাকিবুল ইসলামের ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি দেশ-বিদেশে থাকা তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের আর্থিক সহযোগিতায় ঘরটি নির্মাণ করা হয়।
সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, নতুন ঘরে উঠে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে পরিবারটি। একসময় যে উঠানে বৃষ্টির পানি জমে থাকত, সেখানে এখন শিশুদের হাসি-খুশি পরিবেশ। পরিবারের সদস্যদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
আবেগাপ্লুত চন্দ্রলাল তনচংগ্যা বলেন, ‘আমরা দিন এনে দিন খাই। বৃষ্টি নামলেই সারারাত জেগে থাকতে হতো। মাটির ঘরে পানি ঢুকে সব ভিজে যেত। ঘর ভেঙে পড়ার ভয় ছিল সবসময়। কখনও ভাবিনি আমাদেরও এমন একটি নিরাপদ ঘর হবে। এটি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার।’ স্ত্রী ফুলবী তনচংগ্যা বলেন, ‘আমরা প্রায় আশাহীন হয়ে পড়েছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, নতুন জীবন শুরু করতে পেরেছি। যারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব না।’
রাকিবুল ইসলাম জানান, গত চার বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাইক্লিং প্রশিক্ষণের কাজে নিয়মিত যাতায়াতের সুবাদে পাহাড়ের মানুষের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সেই সম্পর্ক থেকেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা দিয়েছেন, তার প্রতিদান দেওয়া সম্ভব নয়। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেই এই পরিবারের জন্য একটি নিরাপদ ঘর নির্মাণ করেছি। এটি খুব ছোট একটি উদ্যোগ, কিন্তু একটি পরিবারের জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দিতে পেরেছি।’
রাকিবুল ইসলাম আরও জানান, এর আগে খাগড়াছড়িতেও তিনটি অসহায় পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণে সহযোগিতা করেছেন। ভবিষ্যতেও এমন মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চান।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কাপ্তাই ব্লাড ব্যাংক। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা বীর কুমার তনচংগ্যার নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবকেরা ঘর নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়ায় কাজ করেন।

বীর কুমার তনচংগ্যা বলেন, ‘মানুষের বিপদে মানুষই পাশে দাঁড়াবে—এই বিশ্বাস থেকেই আমরা কাজ করেছি। আজ একটি পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে দেখে যে তৃপ্তি পেয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে একটি নিরাপদ ঘর শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, বরং একটি পরিবারের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। তাই রাকিবুল ইসলামের এই উদ্যোগ এলাকায় ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ওয়াগ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুবিমল তনচংগ্যা বলেন, ‘রাকিবুল ইসলামের এই মানবিক উদ্যোগ অসহায় মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সমাজের বিত্তবানদেরও এ ধরনের কাজে এগিয়ে আসা উচিত। একই সঙ্গে কাপ্তাই ব্লাড ব্যাংকের স্বেচ্ছাসেবকদের নিষ্ঠা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য চিরঞ্জিত তনচংগ্যা বলেন, ‘একটি অসহায় পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর এই উদ্যোগ সমাজের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এমন কাজ অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে।’

আরও পড়ুন

×