ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

প্রশ্নের মুখে জনপ্রতিনিধিরা

প্রশ্নের মুখে জনপ্রতিনিধিরা
×

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে এক টেবিলে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ও নগরীর তিন সংসদ সদস্য সমকাল

সারোয়ার সুমন

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচিত হওয়ার ৫ মাসের মধ্যেই কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা। রেকর্ড বৃষ্টির সঙ্গে বন‍্যার পানি একাকার হওয়ায় হঠাৎ ছন্দপতন ঘটেছে চট্টগ্রামের ১০ লক্ষাধিক মানুষের জীবনে। নষ্ট হয়ে গেছে ১০ হাজারের বেশি বসতঘর। দেড় শতাধিক ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ডুবে গেছে ফসলি জমি। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। বন‍্যার পানি নামতে নতুন করে দেখা দিয়েছে ডায়রিয়া, কলেরাসহ পানিবাহিত রোগ। এমন দুঃসময়ে জনপ্রতিনিধিদের পাশে চান ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা। চান পর্যাপ্ত ত্রাণ ও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। অসহায় মানুষদের এই চাওয়া পূরণ করাটাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দুর্গত এলাকায় আছেন অনেক জনপ্রতিনিধি। তবে এই দুঃসময়ে অনেক জনপ্রতিনিধি জনগণের পাশে ছিলেন না বলে অভিযোগ আছে। এর প্রভাব পড়বে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। তিন মাস পরই পর্যায়ক্রমে সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে এই নির্বাচন। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, ‘হঠাৎ বন‍্যায় ভেসে গেছে অনেকের স্বপ্ন। এখন পানি কমলেও বন‍্যার সময় এক সপ্তাহ ধরে চুলা জ্বলেনি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক ঘরে। কবর দেওয়ার জন্য মাটি না মেলার খবরও পাচ্ছিলাম আমরা। এই কঠিন সময়ে এমপিসহ জনপ্রতিনিধিদের পাশে চেয়েছে সাধারণ মানুষ। চেয়েছে তাদের সহানুভূতিও। মেয়র, চেয়ারম্যান ও মেম্বারের মতো স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় এমপিদের ওপর নির্ভরশীলতাও বেশি ছিল এবার। কিন্তু কিছু এমপি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করছেন। ত্রাণ বিতরণের নামে ফটোসেশন করে চলে গেছেন। এটা খুব দুঃখজনক। তবে অনেক এমপি টানা সময় দিয়েছেন দুর্গত এলাকায়। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এটির প্রভাব পড়বে।’

বান্দরবানের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী। বন‍্যা শুরুর প্রথম সপ্তাহে এলাকাতেই ছিলেন। কিন্তু দিনের বেশির ভাগ সময় তাঁর কেটেছে বাসায়। ৬ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে তিনি ত্রাণ বিতরণে পুরো দিন ব্যয় করেছেন কেবল ১১ জুলাই। এটি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে পরের টানা ৩ দিন সময় দিয়েছেন তিনি দুর্গত এলাকায়।
বন‍্যাদুর্গত এলাকায় গিয়ে সাচিং প্রু জেরী বলেন, ‘আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ। তবু আপনাদের পাশে থাকতে সাধ‍্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি।’
খাগড়াছড়ির এমপি ওয়াদুদ ভূঁইয়া বন‍্যার প্রথম সপ্তাহে এলাকায় ছিলেন মাত্র একদিন। বেশির ভাগ সময় তিনি ছিলেন ঢাকায়। বন্যার মাঝেই হাটহাজারীর এমপি গেছেন সৌদি আরবে। তবে যাওয়ার আগে ও পরে দুর্গত মানুষকে সময় দিয়েছেন তিনি। 
সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর জামায়াতদলীয় দুই এমপি শুরুর দিকে তৎপর না থাকলেও ঢাকা থেকে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান চট্টগ্রাম আসার পর এলাকায় সক্রিয় হয়েছেন তারা। 
অসহায় মানুষদের পাশে থাকতে এমপিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তারপরও চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধি জলাবদ্ধ ও বন্যাদুর্গত মানুষদের পাশে নেই সশরীরে। তবে ব্যতিক্রম কয়েক জনপ্রতিনিধি। বৃষ্টি ও বন্যার পানি বাড়ার পর থেকেই তারা এলাকায়। প্রতিদিন ছুটছেন দুর্গত এলাকায়। কিন্তু এ সংখ্যা হাতেগোনা।
আমির আসার পরই সক্রিয় জামায়াতের দুই এমপি
বৃষ্টির সঙ্গে বানের পানি একাকার হওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা। এ দুই এলাকার এমপি হচ্ছেন জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী ও অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম। এক সপ্তাহ ধরে এ দুই উপজেলার পাঁচ লাখ বাসিন্দা পানিবন্দি ছিলেন। এসব উপজেলায় কবর দেওয়ার মতো শুকনো মাটিও মেলেনি। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সশরীরে আসেন বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দুই এমপিও। শুরুতে না থাকলেও আমির আসার পর থেকে নিয়মিত দুর্গত এলাকায় থাকছেন তারা। 

নগরে ব্যতিক্রম
ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রাম শহরে। টানা বৃষ্টিতে নগরে জলাবদ্ধতা তৈরি হলেও এখন তা কমতির দিকে। কিন্তু নগরের তিন এমপি এক সপ্তাহ ধরে আছেন নিজ নিজ আবাসিক এলাকায়। অপর এমপি ও অর্থমন্ত্রী আমি খসরু মাহমুদ চৌধুরী এলাকায় না থাকলেও কেন্দ্র থেকে নগরের ত্রাণ কার্যক্রম তদারক করছেন। দুদিন আগে দুর্গত এলাকায় সশরীরে গিয়েও ত্রাণ দিয়েছেন তিনি। 
এদিকে, সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে নগরের এমপিরা  সমন্বয় বৈঠক করেছেন গত শনিবার। জেলার মধ্যেও কয়েকটি এলাকায় তৎপর আছেন জনপ্রতিনিধিরা। চন্দনাইশে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও সশরীরে উপস্থিত থেকে ত্রাণ কার্যক্রম তদারক করছেন চন্দনাইশের এমপি জসিম উদ্দিন। 
ফটিকছড়ির সদ্য শপথ নেওয়া এমপি সরোয়ার আলমগীরও এলাকায় থেকে ত্রাণ কার্যক্রম তদারক করছেন। তিনি বলেন, ‘৯ জুলাই শপথ নেওয়ার পর ১০ ও ১১ জুলাই উপজেলার সুন্দরপুর, হারুয়ালছড়ি, নাজিরহাট পৌরসভা ও বক্তপুরে ত্রাণ ও শুকনো খাবার বিতরণ করি। সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকায় যাই রোববার।’
রাঙামাটির এমপি দীপেন দেওয়ান পুরো সময়টাতে এলাকায় অবস্থান করে প্রতিদিন ছুটছেন দুর্গত এলাকায়। 

সৌদি থেকে তড়িঘড়ি ফিরলেন মীর হেলাল 
নগরের সঙ্গে লাগোয়া হাটহাজারী উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এবার বেশি ছিল। প্রশাসনের হিসাবে এ উপজেলায় পানিবন্দি ছিল ১ হাজার ৪০০ পরিবার। ২১টি আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন ৩২৯ জন। শুকনো খাবার দেওয়া হয় ১ হাজার ৪৬৫ জনকে। উপজেলার ১৪টির মধ্যে ৮টি ইউনিয়নের বাসিন্দা পানিবন্দি ছিলেন, যার সংখ্যা ৫০ সহস্রাধিক। এর মধ‍্যে সেখানকার স্থানীয় এমপি ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন গিয়েছিলেন সৌদি আরব। তবে ওমরাহ সংক্ষিপ্ত করেই দ্রুত ফিরে এসেছেন তিনি। দাঁড়িয়েছেন দুর্গত মানুষের পাশে।
ব‍্যারিস্টার মীর হেলাল বলেন, ‘সৌদি আরব যাওয়ার আগেও বন‍্যাদুর্গত মানুষের পাশে ছিলাম। ওমরাহ শেষ করে আবার দাঁড়িয়েছি তাদের পাশে।

 অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন‍্যই রাজনীতি করি আমরা।’

এক টেবিলে সিটি মেয়র ও নগরের ৩ এমপি
চট্টগ্রামে বিপর্যস্ত সড়ক ও অচল ড্রেনেজ সচল করতে এবং জলজট থেকে নগরবাসীকে স্থায়ী মুক্তি দিতে গত শনিবার এক টেবিলে বসেছেন চট্টগ্রামের তিন এমপি ও সিটি মেয়র। সাম্প্রতিক রেকর্ড বৃষ্টিতে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কারের লক্ষ্যে চারটি সংসদীয় আসনভিত্তিক বিশেষ সমন্বয় কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। প্রতিটি কমিটিতে চসিক ছাড়াও সিডিএ, ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সকল সেবা সংস্থার প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। মাঠ পর্যায়ে দ্রুত সমস্যা চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্যই এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিটি মেয়রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এ সভায় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, আবু সুফিয়ান ও সাঈদ আল নোমান। 

দুর্গত এলাকায় রাঙামাটির দীপেন
পানি বাড়ার খবর পেয়েই রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান ঢাকা থেকে রাঙামাটি আসেন। এরপর কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া, ঘাগড়া ইউনিয়ন ও শহরের লোকনাথ মন্দির, রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসকারীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন, খাবার ও নগদ অর্থ বিতরণ করেন। তিনি বৃহস্পতিবার থেকে প্রায় প্রতিদিন স্কুল, কলেজ, স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করেন। আইমাছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা জ্ঞান চাকমা জানান, এমপি দীপেন দেওয়ান গত শনিবার তাদের ইউনিয়নের আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন ছাড়াও কলাবুনিয়া, ভূষণছড়া ইউনিয়নে আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন।

মাত্র একদিন ছিলেন এমপি ওয়াদুদ 
খাগড়াছড়ির এমপি ওয়াদুদ ভূঁইয়া প্রথমএক সপ্তাহে মাত্র একদিন ছিলেন তাঁর নির্বাচনী এলাকায়। বানের পানি হু হু করে বাড়লেও তিনি অবস্থান করছেন ঢাকায়। দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেন খাগড়াছড়ি এলেও অনুপস্থিত ছিলেন স্থানীয় এমপি।
জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক এশতেয়াক আহম্মদ নিপু বলেন, ‘স্থানীয় এমপি শুরুর দিকে একদিন ছিলেন এলাকাতে। ঢাকা থাকলেও ত্রাণ কার্যক্রম তদারকি করেছেন তিনি।’
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তখ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সমকালের স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিরা)

আরও পড়ুন

×