ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ

এই কূলে সাগর, ওই কূলে নদী মাঝখানে বাঁচার লড়াই

এই কূলে সাগর, ওই কূলে নদী মাঝখানে বাঁচার লড়াই
×

ভাঙনের কবলে পড়েছে তাঁর ঘর। সাত মাসের শিশু ইয়াছিনকে কোলে নিয়ে নাফ নদের তীরে বসে যেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আছেন আমেনা সমকাল

 আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাত মাসের শিশু ইয়াছিনকে কোলে নিয়ে নাফ নদের তীরে ভেসে আসা শুকনো লাকড়ি কুড়াচ্ছিলেন আমেনা খাতুন। ঘরে চাল আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই। তাই শিশুকে নিয়েই নেমেছেন আগুন জ্বালানোর উপকরণ খুঁজতে। চারদিকে নদীর গর্জন, পায়ের নিচে ভাঙতে থাকা মাটি; তবু থেমে নেই জীবন।
শাহপরীর দ্বীপের শত শত পরিবারের গল্প আমেনার মতোই। বর্ষা এলেই আতঙ্ক বাড়ে। নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় আর টানা বর্ষণে প্রতিবছরই হারিয়ে যায় ঘর, জমি, জীবিকা ও নিরাপত্তা। রাতে ঢেউয়ের শব্দে ঘুম ভাঙে, সকালে ঘরটি থাকবে কিনা– সেই অনিশ্চয়তা নিয়েই শুরু হয় নতুন দিন।
সাগর ও নাফ নদের মাঝখানে ৩২ দশমিক ৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শাহপরীর দ্বীপে ১৩টি গ্রামে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনে দেড় হাজারের বেশি ঘরবাড়ি নদী ও সাগরে বিলীন হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। অনেকেই উখিয়ার কুতুপালংসহ বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। তবে এখনও শত শত পরিবার নদী ও সাগরের কিনারায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।

‘ঘরে চাল আছে, আগুন নেই’
বুধবার দুপুরে নাফ নদের তীরে কথা হয় আমেনা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নদীর পারের মানুষের জীবন কত কষ্টের, তা শুধু এখানকার মানুষই বোঝে। ঘরে চাল আছে, কিন্তু রান্নার জ্বালানি নেই। তাই নদীর পারে লাকড়ি কুড়াতে এসেছি।’ তিনি জানান, আট সদস্যের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তাঁর স্বামী। নদীতে মাছ ধরে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চলে। টানা বৃষ্টিতে তাদের ঝুপড়ি ঘর আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আমেনার ভাষায়, ‘ঘর মেরামত করার টাকাও নেই। ভাঙতে ভাঙতে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা নদীতে চলে গেছে। এখন নিজের জীবনের চেয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েই বেশি ভয় হয়।”

একুল-ওকূল ঢেউ, মাঝখানে জীবনসংগ্রাম
নদীর পাড়ে জিও ব্যাগের ওপর বসে ছেলের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন বিধবা মোস্তফা খাতুন। পাশে ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন রেহেনা বেগম। মোস্তফা খাতুন বলেন, ‘৩০ বছর ধরে নদীর পাড়ে জীবনযুদ্ধ করছি। কত ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস গেছে, তবু বেঁচে আছি। ছেলে নদীতে মাছ ধরতে গেছে, আকাশে কালো মেঘ দেখলেই বুক কেঁপে ওঠে।’ তিনি বলেন, ‘শাহপরীর দ্বীপের এক পাশে নাফ নদী, অন্য পাশে সাগর। দুই দিকের ঢেউয়ের মাঝেই আমাদের জীবন। বর্ষা আর ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রতিটি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটে।’

ভাঙনের দীর্ঘ ইতিহাস
স্থানীয়দের ভাষ্য, টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসে দেড় থেকে দুই হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। বিশেষ করে ২০১২ সালে পশ্চিম পাশের বেড়িবাঁধ সাগরে বিলীন হওয়ার পর পশ্চিমপাড়া, জালিয়াপাড়া ও মাঝেরপাড়ার বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়।
পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা কৃষক আবদুল আমিন বলেন, ‘যে নিজের ভিটেমাটি সাগরে তলিয়ে যেতে দেখেনি, সে এই কষ্ট বুঝবে না। বসতভিটা, চাষের জমি—সব সাগর গিলে খেয়েছে। এখন আমি নিঃস্ব।’ তিনি জানান, এখন উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরসংলগ্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
একসময় ইউপি সদস্য ছিলেন নুরুল আমিন। সাগরের পাড়ে ছিল তাঁর বসতভিটা ও প্রায় আট একর আবাদি জমি। আজ সবই সাগরের গর্ভে। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের দুটি পাড়া পুরোপুরি সাগরে বিলীন হয়েছে। প্রায় ৩০০ পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। কেউ অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে, কেউ ভিক্ষা করে সংসার চালাচ্ছে। আমার অবস্থাও তাদের মতোই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন মাঝেরপাড়ায় আশ্রয় নিয়েছি। ১১ সদস্যের পরিবার নিয়ে ছেলের মাছ ধরে আনা সামান্য আয়ের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছি। একসময় মানুষের প্রতিনিধি ছিলাম, আজ নিজেই সর্বহারা।’

ভাঙন রোধে সরকারের জরুরি উদ্যোগ চান এলাকাবাসী
শাহপরীর দ্বীপের ইউপি সদস্য আবদুস সালাম বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে এখনও প্রায় ৫০০ মানুষ নদীর পাড়ে চরম ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০টি ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। তাদের রক্ষায় জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন।’
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুল মন্নান বলেন, ‘শাহপরীর দ্বীপের এক পাশে নাফ নদী, অন্য পাশে সাগর। দুই ঢেউয়ের মাঝখানে মানুষের জীবনসংগ্রাম চলছে। গত দেড় দশকে প্রায় দুই হাজার ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘শাহপরীর দ্বীপে নদী ও সাগরপাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন

×