ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয় শেষে ক্যারিয়ার

যে পথে ভবিষ্যৎ

যে পথে ভবিষ্যৎ
×

শুরু হোক পথচলা স্বপ্নময় পথে... মডেল: কাদের, আফসানা ও আবীর। ছবি: সাহস

মাহমুদুল হাসান

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৯ | আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

উচ্চ মাধ্যমিক শেষে তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু করেন রাজ্যের স্বপ্ন নিয়ে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে এই স্বপ্নযাত্রায় ক্যারিয়ার নামের দানব যুক্ত হয়ে জীবনে নেমে আসে বিষাদের ছায়া! শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক চাপ হয়ে ওঠা এই বিষাদ থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছেন মাহমুদুল হাসান

হৈহুল্লোড়, আনন্দ, খেলাধুলা আর পড়ালেখা, কখনওবা স্যারের বকুনি খেয়ে স্কুলজীবনের যেন সমাপ্ত ঘটে। নতুন পরিবেশ আর রঙিন স্বপ্ন পাড়ি দেয় কলেজজীবন। কেউ প্রত্যাশিত কিংবা তার চেয়ে কিছুটা কম ফল নিয়ে ভর্তি হন বিশ্ববিদ্যালয়ে। মনের মতো বিষয় না পেলেও অন্য বিষয়ে মনোনিবেশ করে চারটা বছর ক্লাস আর পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটে। এরপরই চলে আসে একজন শিক্ষার্থীর কাছে পারিপার্শ্বিক প্রত্যাশার চাপ। এই প্রত্যাশার চাপের মাঝেও কেউবা উচ্চশিক্ষা শেষ করেন, কেউবা জীবিকার তাগিদে নিজেকে কর্মজীবনে নিয়োজিত করেন। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের এই দেশে জনসংখ্যার ভিড়ে হাজারো শিক্ষিত চাকরিপ্রত্যাশীর মাঝে তখন সদ্য পাস করা তরুণকে বেশ হিমশিম খেতে হয় একটা ভালো চাকরির জন্য।

ঘটনা–০১
আহনাফের কথাই ধরা যাক। মা-বাবার একমাত্র ছেলে। প্রত্যাশার চাপ একটু বেশিই। স্কুলজীবনে ফার্স্ট বয়, কলেজে লেটার মার্ক আর ইউনিভার্সিটিতে মেধাবী আহনাফের জয়জয়কার। মা-বাবা, বন্ধু-বান্ধবের প্রত্যাশাও তাই আহনাফকে নিয়ে একটু বেশিই বৈকি! কিন্তু এমবিএ শেষ করার পরও কোথাও চাকরি হচ্ছে না আহনাফের।  শত অ্যাপ্লাই করা সত্ত্বেও তা ইন্টারভিউ বোর্ড পর্যন্তই, চাকরি হচ্ছে না। মা-বাবাও হতবাক। এখন আহনাফকে প্রায়ই শুনতে হয়–সবাই তোমার থেকে খারাপ ফল করেও চাকরি পায়। এত পড়েও তুমি কেন পাও না? হতাশ হয়ে পড়েন আহনাফ, নিজেকে এখন খুব একা লাগে তাঁর! 

ঘটনা–০২
এই ঘটনা তাসনীমের। মা-বাবার বড় মেয়ে। শৈশব থেকেই পড়ালেখায় খুব ভালো। বাবা-মায়ের ইচ্ছা মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে। যথারীতি কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন। এখানেও তিনি খুব ভালো ফল করেন। ইউনিভার্সিটি জীবনের ইতি টেনে দৌড়ঝাঁপ শুরু জীবিকার প্রতিযোগিতায়। প্রথমে কিছুটা সময় নিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই চাকরির একটা অফার পান। প্রত্যাশিত বেতন না হওয়ায় তাসনীম এই অফার ফিরিয়ে দেন। তাসনীম চাকরি বেশ কিছু পেলেও প্রত্যাশিত বেতন বা সবকিছুতে না মেলার কারণে সব অফার ফিরিয়ে দেন। একটা পর্যায়ে দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিকতার মাঝে তাসনীম আগের মতো আর কোনো চাকরির অফার পান না। 

ঘটনা–০৩ 
এবারের ঘটনাটি একটু ব্যতিক্রম। অরুণ মোটামুটি ভালো ছাত্র। শৈশব থেকেই শুধু ভালো ফল নয়, ভালো খেলাধুলার জন্যও বেশ সুপরিচিত ছিলেন। সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের বেশ ফুর্তিবাজ। বন্ধু-আড্ডা বাদ দেন না। সামাজিক কার্যক্রম সবার আগে। পড়ালেখার সময় পড়ালেখা ঠিকই আছে। বিবিএ সদ্য শেষ করলেন। বেশ কিছু জায়গায় অ্যাপ্লাই করার পর চাকরি একটা জুটে গেল। তাও সেটা প্রত্যাশার চাইতে একটু বেশিই।

গড়ে তুলুন নিজেকে
তিন ঘটনায় তিনটি চরিত্র, কিন্তু তিনজনেরই লক্ষ্য এক। শিক্ষাজীবনে আমাদের ফলাফলের মূল লক্ষ্যই থাকে ভালো ও সুন্দর একটি ক্যারিয়ার গড়ে তোলার। সবার প্রত্যাশার চাপ থাকে। কিন্তু এই প্রত্যাশার চাপ একটু বোঝাই মনে হয় যখন শিক্ষাজীবন শেষে চাকরি না পাওয়া যায়। একটা সময় শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়ে পড়েন। তবে আর হতাশা নয়। সব প্রত্যাশা ঝেড়ে গড়ে তুলুন নিজেকে, জগৎকে। 

কেবলই পাঠ্যপুস্তক নয়: শিক্ষাজীবনে ভালো ফল করতে পাঠ্যপুস্তকে মনোযোগী হওয়া আবশ্যক। কিন্তু যে শিক্ষার্থী শুধুই এর মাঝে নিজেকে আবদ্ধ করে রেখেছেন, ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে তিনি শুধুই পিছিয়ে পড়েছেন। পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও বিভিন্ন বই আছে, যা পড়ে বিশ্বকে জানা যায়। জানা যায় অজানা অনেক কিছুই। সংবাদপত্র কিংবা খবর দেখা, একটু বিনোদন শুধু নিজের মানসিক প্রশান্তিই নয়, জীবনে পথচলাকেও অনেক প্রশস্ত করে দেয়। এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। তাই তথ্যপ্রযুক্তির বাইরে থাকা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। পরীক্ষা শেষের অবসর সময়ে কম্পিউটার সম্পর্কে নিজের দক্ষতা বাড়িয়ে নিতে পারেন। অনেক শিক্ষার্থীই শুধু এই একটি বিষয়ে নিজের দক্ষতা প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় ইন্টারভিউ বোর্ড থেকে হয়তো অসংখ্যবার ফেরত এসেছেন। পাশাপাশি বাড়িয়ে নিতে পারেন ইংরেজি বলার দক্ষতাও।

থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে: পড়ালেখা, ক্লাস আর পরীক্ষা সারাদিন শুধু এভাবে কাটিয়ে দিলে একসময় একঘেয়েমি চলে আসে। এই একঘেয়েমি দূর  করতে প্রয়োজন একটু দূরে বেড়িয়ে আসা। কিন্তু হায়। হাতে সময় কই? তাই মন খারাপ করে ঘরে বসে থাকা। আবার বই নিয়ে বসা। না, নিজেকে বদ্ধ ঘরে আটকে না রেখে চারপাশটা একটু ঘুরে দেখুন। অর্থাৎ একঘেয়েমি লাগলে হাতে সময় নেই তাতে কী। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো যেতে পারে। ইউনিভার্সিটিতে অনেক ক্লাব থাকে। সেগুলোতে যোগ দিতে পারেন। এভাবে অনেক বন্ধু পেতে পারেন। সেই সঙ্গে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবেন।  

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি: মানুষের জীবনে প্রত্যাশা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। এটাও স্বাভাবিক পার্শ্বিক প্রত্যাশার চাপ। কিন্তু একটু ভেবে দেখা উচিত, সেই প্রত্যাশা কতটুকু বাস্তবিক। বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি না রেখে প্রত্যাশা থাকলে প্রাপ্তির খাতায় তো অসংগতি ধরা পড়বেই। বরং স্বপ্ন বা লক্ষ্য স্থির করতে নিজেকে প্রস্তুত  করুন। বাধা-বিপত্তি আসবে। কখনও এটা ভাবা উচিত নয় আমার স্বপ্ন এখনই পূরণ হতে হবে। প্রাপ্তি কতটুকু এটা না ভেবে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়াই শুভবুদ্ধির লক্ষণ। নয়তো সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই হবে না। 

সাফল্যের মূলমন্ত্র: সাফল্যের মূলমন্ত্রটা কিসে? খুব সোজা। অল্প কিছু কথাতেই সাফল্যের মূলমন্ত্র অন্তর্নিহিত রয়েছে। প্রথমেই খুঁজে নিতে হবে কিসে আপনি সাফল্য পাবেন এবং আপনার আত্মবিশ্বাস কোথায়। অনুকরণ নয় বরং অনুসরণ করে দেখতে পারেন আপনার প্রিয় আদর্শকে। হতে পারেন তিনি আপনার বাবা-মা, বন্ধু, মহামানব যে কেউ। চাই স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী। অনেকেই আছেন নিজের কী নেই তা নিয়ে বেশি হতাশ। নিজের কী নেই তা নিয়ে হতাশ না হয়ে কী আছে সেটি নিয়েই বরং এগিয়ে চলুন। 

চাই আত্মবিশ্বাস: নিজের লক্ষ্য জানা থাকলে সেটি স্থির করে সেদিকে এগিয়ে যেতে হবে আত্মবিশ্বাস নিয়ে। শিক্ষাজীবনে নিজেকে বদ্ধ ঘরে, পাঠ্যপুস্তকে আটকে না রেখে নিজের জগৎটাকে আবিষ্কার করতে হবে। আর যখন নিজের জগৎটাকে আবিষ্কার করা সম্ভব হবে; তখন আত্মবিশ্বাস নিয়েই নিজের লক্ষ্য ও স্বপ্নপূরণের পথে ধাবিত হওয়া সম্ভব হবে!

আরও পড়ুন

×