ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশ্বের পঞ্চম উঁচু পর্বতশৃঙ্গ জয়

মাকালু শিখরে আমাদের প্রথম

মাকালু শিখরে  আমাদের প্রথম
×

মাকালু অভিযানে পর্বতারোহী বাবর আলী

আশিক মুস্তাফা

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৬:৫৬ | আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ | ১২:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাবর আলী। ২ মে শনিবার ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে বিশ্বের পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাকালুতে আরোহণ করে নিজেকে আরেক ধাপ উচ্চতায় তুলে নিলেন এই পর্বতারোহী। পৃথিবীতে ৮ হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতার পর্বত রয়েছে মোট ১৪টি। এর মধ্যে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পাঁচটি জয় করলেন এই তরুণ। মাকালু জয়ের উদ্দেশ্যে বাবর গত ৭ এপ্রিল দেশ ছাড়েন। তখন থেকেই যোগাযোগ রেখেছেন সাহস-এর সঙ্গে। বাবরের এই স্বপ্ন জয়ের কথা তুলে ধরেছেন আশিক মুস্তাফা

২ মে শনিবার। ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে বিশ্বের পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাকালুতে আরোহণ করে নিজেকে আরেক ধাপ উচ্চতায় তুলে নিলেন পর্বতারোহী বাবর আলী। পৃথিবীতে ৮ হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতার পর্বত রয়েছে মোট ১৪টি। এর মধ্যে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পাঁচটি জয় করলেন বাবর। নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালয়ে অবস্থিত ৮,৪৮৫ মিটার বা ২৭,৮৩৮ ফুট উচ্চতার এই পর্বতে এটিই প্রথম বাংলাদেশির আরোহণ। মাকালু জয়ের উদ্দেশ্যে বাবর গত ৭ এপ্রিল দেশ ছাড়েন। 
তখন থেকেই যোগাযোগ রেখেছেন সাহস-এর সঙ্গে। 

মোহন লামসাের  তথ্য
‘এক্সপিডিশন মাকালু: দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক এই অভিযানের আয়োজক পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’। এই ক্লাবের সভাপতি ফরহান জামান নেপালের আউটফিটার ‘মাকালু অ্যাডভেঞ্চার’-এর স্বত্বাধিকারী মোহন লামসাের মাকালু জয়ের এই তথ্য নিশ্চিত করেন। শিখরে বাবরের সঙ্গে ছিলেন আং কামি শেরপা।

৯ এপ্রিল দেশ থেকে টুমলিংটারে 
‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’ বা ‘মহা-কালো’খ্যাত এই চূড়া আরোহণের উদ্দেশ্যে বাবর ৭ এপ্রিল দেশ ছাড়েন। আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি শেষে ৯ এপ্রিল উড়ে যান টুমলিংটার এবং সেখান থেকে গাড়িতে সেদুয়া গ্রামে। এরপর পায়ে চলা শুরু করে ১৮ এপ্রিল পৌঁছান পর্বতের উচ্চতর বেজক্যাম্পে। ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নিতে ২১ এপ্রিল তিনি ক্যাম্প-১ ও পরদিন ক্যাম্প-২ তে ঘুমিয়ে ৭ হাজার মিটার উচ্চতা ছুঁয়ে বেসক্যাম্পে নেমে আসেন। দ্বিতীয় দফায় ২৭ এপ্রিল তিনি পর্বতে চড়ে ক্যাম্প-২-এ এক দিন কাটিয়ে পরদিন নেমে আসেন বেসক্যাম্পে। তারপর শুরু হয় ভালো আবহাওয়ার অপেক্ষা।

আজ নেমে আসছেন বেসক্যাম্পে
আবহাওয়া কিঞ্চিৎ সদয় হওয়ার আভাস পেয়ে বাবর আলী ফের পর্বতে চড়তে শুরু করেন ৩০ এপ্রিল। ওই দিন তিনি সরাসরি উঠে যান ৬ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-২-এ। পরদিন ওঠেন ৭ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-৩-এ। বিকেলটা সেখানেই অপেক্ষা করে মাঝরাতে বেরিয়ে পড়েন শিখরের উদ্দেশ্যে। টানা ১ হাজার ১০০ মিটারেরও বেশি ভয়ানক চড়াই অতিক্রম করে ২ মে ভোরে পৌঁছে যান শিখরে। ২ মে প্রতিবেদন লেখার সময়ে তিনি ক্যাম্প-২ ও আজ ৩ মে বেজক্যাম্পে নেমে আসবেন বলে প্রত্যাশা করেছেন অভিযানের ব্যবস্থাপক ফরহান জামান। 

শুরুর কথা
পর্বতারোহণে বাবরের পথচলা শুরু ২০১৪ সাল থেকে। ট্র্যাকিংয়ে হাতেখড়ি ২০১০ সালে; পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ে পথচলার মধ্য দিয়ে। চট্টগ্রামের পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক বাবর আলী। এই ক্লাবের হয়েই গত বারো বছর হিমালয়ের নানান শিখরে অভিযান করে আসছেন তিনি। ভারতের উত্তরকাশীর নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে মৌলিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন ২০১৭ সালে।

যত অভিযান
২০২৪ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করেন বাবর আলী। একই অভিযানে চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ লোৎসেও জয় করেন। বাবরের আগে আরও পাঁচজন এভারেস্ট জয় করেছিলেন। তবে বাংলাদেশের দুঃখ হয়ে রইলেন ২০১৩ সালের ২০ মে এভারেস্ট জয় করে নামার পথে মারা যাওয়া সজল খালেদ, যিনি পঞ্চম বাংলাদেশি হিসেবে পর্বত জয় করেছিলেন। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পর ১১ বছরে আর কোনো বাংলাদেশি এভারেস্টের পথ মাড়াননি। ১১ বছর পর ২০২৪ সালে আবার বাবরের হাত ধরে লাল-সবুজের পতাকা উড়েছিল এভারেস্টের বুকে। ২০২২ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে দুর্গম ও টেকনিক্যাল শৃঙ্গ আমা দাবলাম জয় করেন বাবর। ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি আরোহণ করেন বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ পর্বত অন্নপূর্ণা-১। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই আরোহণ করেন বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম পর্বত মাউন্ট মানাসলু। কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই আট হাজার মিটার উচ্চতার শিখরে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আরোহণ করেন এই তরুণ। ২ মে জয় করা মাউন্ট মাকালু চৌদ্দটি আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত শিখর স্পর্শের স্বপ্নের পথে বাবরের পঞ্চম সাফল্য।

পঞ্চাশ দিনের অভিযান
বিশ্বে আট হাজার মিটার বা ততধিক উচ্চতার পর্বত আছে সাকল্যে চৌদ্দটি। এই ১৪টি পর্বত চূড়ার মধ্যে ইতোমধ্যে চারটি পর্বতের চূড়া ছুঁয়েছেন পর্বতারোহী বাবর আলী। এই কৃতিত্ব নেই আর কোনো বাংলাদেশির। পঞ্চম আট হাজার মিটার পর্বত শৃঙ্গ মাকালু অভিযানে যাওয়ার আগে ৫ এপ্রিল বাবর আলী বলেছিলেন, ‘বিশ্বের ১৪টি আট হাজার মিটার পর্বত আরোহণের একটা সুতীব্র ও দীর্ঘ ইচ্ছা অনেকদিন ধরেই লালন করছি আমি। ইতোমধ্যে সে লক্ষ্যে বেশ কিছুদূর এগিয়েছি। মাকালু সে লক্ষ্যের পানে আরও একটি দৃঢ় পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে। ক্রমান্বয়ে বাকি পর্বতগুলোর চূড়া ছুঁতে চেষ্টা করব আমি। যদিও এ বছর আমার ইচ্ছে ছিল পাকিস্তানের কারাকোরাম হিমালয়ে অবস্থিত পৃথিবীর নবম উচ্চতম শৃঙ্গ নাঙ্গা পর্বত আরোহণের। তবে অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অপ্রতুলতা ও পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে বিদ্যমান উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি লক্ষ্য পরিবর্তন করে পাখির চোখ করেছি মাউন্ট মাকালুকে। মাউন্ট মাকালু নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং একটি পর্বত। এটি বিখ্যাত এর খাড়া ঢাল ও প্রচণ্ড বাতাসের জন্য। চতুর্মুখী পিরামিড আকৃতির স্বতন্ত্র এই পর্বত আরোহীদের ভালোই পরীক্ষায় ফেলে। সেই চ্যালেঞ্জটুকু নিতে আমি প্রস্তুত। নতুন আর চ্যালেঞ্জিং কিছু করতে আমি সব সময়ই আনন্দ পাই।’ পুরো অভিযানে সময় লেগেছে পঞ্চাশ দিন। এবার অপেক্ষা আগামীর অভিযানের! 

আরও পড়ুন

×