ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশ্বের আলোচিত অনলাইন পাঠশালা

সৃজনশীল দুনিয়ার ডাক

সৃজনশীল দুনিয়ার ডাক
×

লেখালেখি, আবৃত্তি, গান কিংবা ফটোগ্রাফি–তরুণরা এসব সৃজনশীল পাঠ নেয় এখন সামাজিক মাধ্যমে - ছবি: জেমেনি এআই ন্যানো ব্যানানা

আলাউদ্দিন আলাদিন

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৭:০১ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ০৭:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

তরুণরা নিজেদের সৃজনশীলতায় শান দিতে অনলাইনে পাঠ নিচ্ছে বিশ্বের বাঘা বাঘা সৃজনশীল লোকদের কাছ থেকে। এই তরুণদের কেউ লিখতে চায়, কেউ ছবি তুলতে চায়, কেউ সুর তুলতে চায় তারে। স্বপ্নবাজ এই তরুণরা অনলাইনে কোথায় এবং কেমন করে নেয় সৃজনশীলতার পাঠ– তাই তুলে ধরেছেন আলাউদ্দিন আলাদিন

তরুণরা সামাজিক মাধ্যমে খায়-দায়, ঘুমায়–বড়দের এমন ভাবনাকে থোড়াই কেয়ার করে একদল সৃজনশীল তরুণ। তারা প্রতিনিয়ত নিজের সৃজনশীলতায় শান দিতে চায়। নিজের ভাবনাকে তুলে ধরতে চায় লেখায়, গানে, ছবিতে কিংবা হাতের ক্যারিকেচারে। দেশে হাজার হাজার তরুণ, যাদের ভেতরে একটা শিল্পী ঘুমিয়ে আছে সেই ঘুমিয়ে থাকা শিল্পীকে জাগিয়ে তোলার পথ খুঁজছে। তাদের কেউ লিখতে চায়, কেউ ছবি তুলতে চায়, কেউ সুর তুলতে চায় তারে। সুযোগের অভাবে সেই ঘুম আর ভাঙে না। অথচ আজকের পৃথিবীতে কেবল একটা ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই বিশ্বের সেরা শিল্পীদের মুখোমুখি বসা সম্ভব। একদম বিনামূল্যে কিংবা নামমাত্র খরচে। চলুন, আজ সেই সৃজনশীল দুনিয়ায় নিয়ে যাই আপনাদের–

লেখালেখি: সৃজনশীল দুনিয়ার আদি পাঠ
অনেকেই লিখতে বসেন। কিছুক্ষণ পরেই থমকে যান। মাথায় গল্প আছে, কিন্তু কলম চলে না। এই সমস্যাটা আসলে প্রায় সব লেখকেরই। এমনকি যারা বিশ্বখ্যাত তাদেরও। আর ‘রাইটার ব্লক’ বলেও একটি কথা আছে। সে যাক, ‘রিডসি লার্নিং’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম আছে; যেখানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দশ দিনের একটি পাঠ্যক্রম পাঠানো হয় ইমেইলে। পেশাদার লেখক ও সম্পাদকেরা এটি তৈরি করেছেন। গল্পের কাঠামো কেমন হবে, চরিত্র কীভাবে জীবন্ত হয়, সংলাপ কীভাবে স্বাভাবিক শোনায়, এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো এখানে খুব সহজ করে বোঝানো হয়। 
যদি সত্যিকারের বড় লেখকদের কাছ থেকে শিখতে চান, যারা নিজেরাই বলবেন কীভাবে তারা লেখেন, কোথায় আটকে যান, কীভাবে ব্যর্থতা পেরিয়ে এগিয়েছেন, তাহলে ‘মাস্টারক্লাস’ প্ল্যাটফর্মটি আপনার জন্য। এখানে বিশ্বখ্যাত লেখকেরা এত সহজ ও আন্তরিকভাবে কথা বলেন যে মনে হয় সামনে বসে চা খেতে খেতে গল্প করছেন। ‘কোর্সেরা’ প্ল্যাটফর্মেও নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজনশীল লেখার পাঠ্যক্রম পাওয়া যায়, অনেক পাঠ্যক্রম মিলে বিনামূল্যেই। 

আলোকচিত্র: চিরকালীন মুহূর্তের ডাক
ভালো ছবি তোলা মানে শুধু বোতাম টেপা নয়। আলো কোথায় পড়ছে, দূরত্ব কতটুকু, ফ্রেমে কী রাখব আর কী রাখব না, এই ভাবনাগুলোই একটি সাধারণ ছবিকে অসাধারণ করে তোলে। ‘স্কিলশেয়ার’ প্ল্যাটফর্মে হাজার হাজার আলোকচিত্রের পাঠ্যক্রম আছে। মানুষের মুখের ছবি তোলা, প্রকৃতির দৃশ্য ধারণ করা, শহরের রাস্তায় মুহূর্ত ধরে রাখা–প্রতিটি বিষয়ে আলাদা পাঠ্যক্রম। সবচেয়ে ভালো দিক হলো প্রতিটি পাঠ্যক্রমে নিজে করে দেখানোর কাজ থাকে, কেবল দেখে শেষ করলেই হয় না। ‘ইউডেমি’ প্ল্যাটফর্মে একবার কিনলে আজীবন দেখার সুবিধা পাওয়া যায়। ছবি তোলার পরে সম্পাদনার কাজও এখানে দারুণভাবে শেখানো হয়। যাদের হাতে দামি ক্যামেরা নেই, কেবল একটা মোবাইল ফোন আছে তাদের জন্যও আলাদা পাঠ্যক্রম রয়েছে। সরঞ্জামের অভাব বাধা নয়। 

যন্ত্রসংগীত: বাদামের খোসায় সুর 
যন্ত্রসংগীত শেখার একটা পুরোনো ধারণা আছে আমাদের মধ্যে। শিখতে হলে ছোটবেলা থেকেই শুরু করতে হয়, না হলে আর হয় না। এই ধারণাটা একদম ভুল! ‘ইউসিশিয়ান’ প্ল্যাটফর্মটা যন্ত্রসংগীত শেখাকে একটা খেলার মতো করে ফেলেছে। বাজালে সঙ্গে সঙ্গে বলে দেয় ঠিক হলো কিনা। ভুল হলে কোথায় ভুল হলো সেটিও দেখিয়ে দেয়। গিটার, পিয়ানো, বেহালা, বেশ কয়েকটি বাদ্যযন্ত্রের জন্য এখানে আলাদা পথ আছে। পিয়ানো শিখতে চাইলে ‘সিম্পলি পিয়ানো’ এবং ‘প্লেগ্রাউন্ড সেশনস’ প্ল্যাটফর্ম দুটো দারুণ। গিটারের জন্য ‘ফেন্ডার প্লে’ বিশেষভাবে জনপ্রিয়, কারণ এটি শুরু থেকেই পরিচিত সুর বাজাতে শেখায়–ফলে মন উঠে যায় না। আর সংগীতের গভীরে যেতে চাইলে, সত্যিকারের তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করতে চাইলে ‘বার্কলি অনলাইন’ প্ল্যাটফর্মে যেতে হবে। এটি বিশ্বের বিখ্যাত বার্কলি সংগীত মহাবিদ্যালয়ের অনলাইন শাখা।

ক্যালিগ্রাফি: হাতের লেখায় মহাকাল
ছোটবেলায় হাতের লেখা সুন্দর করার জন্য কত চেষ্টা করেছি আমরা। কিন্তু ক্যালিগ্রাফি শুধু সুন্দর লেখা নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পকলা। একটি অক্ষরকে কত আলাদাভাবে লেখা যায়, তাতে কত রকম ভাব আনা যায়। এটিই ক্যালিগ্রাফির জগৎ। বিশ্বজুড়ে এই শিল্পের চাহিদা এখন বাড়ছে। বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র, উপহারের মোড়ক, ঘর সাজানোর নকশা, সর্বত্র ক্যালিগ্রাফির ছোঁয়া। ‘স্কিলশেয়ার’ প্ল্যাটফর্মে তুলির ক্যালিগ্রাফি ও আধুনিক হরফ-নকশার ওপর অসাধারণ পাঠ্যক্রম আছে। ‘উডেমি’ প্ল্যাটফর্মেও কলম ধরার নিয়ম থেকে শুরু করে জটিল সব ধরন পর্যন্ত শেখানো হয়। যারা ডিজিটাল ট্যাবলেটে কাজ করতে চান, তাদের জন্যও খোলা আছে আলাদা পথ!

আবৃত্তি: কণ্ঠের লুকিয়ে থাকা জাদু
কবিতা পড়া আর আবৃত্তি করা, দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। কথায় আছে–আবৃত্তিতে কণ্ঠ হয় রং, বিরতি হয় তুলির টান! কোথায় একটু থামতে হবে, কোথায় গলা নামাতে হবে, কোথায় আবেগ আনতে হবে, এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো শেখা থাকলে তবেই রংতুলির সঠিক মিশ্রণটা ঘটবে আপনার কণ্ঠে! ‘কোর্সেরা’ প্ল্যাটফর্মে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষ পাঠ্যক্রম আছে যেখানে কণ্ঠের সঠিক ব্যবহার, উচ্চারণ এবং মঞ্চে উপস্থিতির কৌশল শেখানো হয়। ‘মাস্টারক্লাস’ প্ল্যাটফর্মে বিখ্যাত কবি ও শিল্পীরা বলেন কীভাবে একটি লেখার ভেতরের অনুভূতি কণ্ঠ দিয়ে বের করে আনতে হয়। এই পাঠগুলো শুনলে বোঝা যায় আবৃত্তি কেবল গলার জোরের বিষয় নয়, এটি হৃদয়ের গভীর থেকে কথা বলার শিল্প। 

তবে এবার শুরু হোক 
প্ল্যাটফর্মের তালিকা জানা আর আসলে শুরু করা, এই দুটোর মাঝে একটা বড় দূরত্ব আছে। অনেকেই ভাবেন, ‌‘পরে শুরু করব।’ সেই পরে আর আসে না। আজ রাতেই যে বিষয়টি সবচেয়ে ভালো লাগে, সেটির একটা পাঠ্যক্রম খুলে প্রথম ক্লাসটা দেখুন। কাল থেকে প্রতিদিন আধা ঘণ্টা রাখুন শুধু সেই চর্চার জন্য। মাস তিনেক পরে পেছনে তাকিয়ে দেখবেন। আপনি কতটা এগিয়ে গেছেন। শিল্পের পথে কোনো শর্টকাট নেই, তবে পথটা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। বিশ্বের সেরা শিক্ষকেরা এখন আর দূরে নয়; তারা আপনার ঘরেই আছেন, কেবল ডাকের 
অপেক্ষায়!  

আরও পড়ুন

×