এভারেস্টে তৃতীয় বাংলাদেশি নারী
এভারেস্টের চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা হাতে নুরুন্নাহার নিম্নি -ছবি: নুরুন্নাহার নিম্নির সৌজন্যে
আলাউদ্দিন আলাদিন
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৬:৫৯ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ | ১৮:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
নুরুন্নাহার নিম্নি। গত ২৭ মে নেপাল সময় ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে ওড়ালেন লাল-সবুজ পতাকা। নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরীনের এভারেস্ট জয়ের ১৪ বছর পর দেশের নারী পর্বতারোহীর সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক যুক্ত করা এই পর্বতারোহীর স্বপ্ন জয়ের কথা তুলে এনেছেন আলাউদ্দিন আলাদিন
গত ২৭ মে। নেপাল সময় ভোর ৫টা ২৪ মিনিট। চারদিকে বরফ আর মেঘের সমুদ্র, তীব্র ঠান্ডায় শ্বাস নেওয়াই দায়। ঠিক সেই মুহূর্তে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে দাঁড়িয়ে তৃতীয় বাংলাদেশি নারী হিসেবে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ালেন নুরুন্নাহার নিম্নি। বুকে অদম্য গর্ব নিয়ে নিম্নি সেদিন কেবল একটি পর্বত জয় করেননি; জয় করেছেন বছরের পর বছরের অপেক্ষা, সংগ্রাম আর স্বপ্নকে।
বাংলাদেশের নারী পর্বতারোহণের ইতিহাসে এই সাফল্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরীনের পর এভারেস্ট জয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে পুরো ১৪টি বছর। সেই দীর্ঘ নীরবতার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের তৃতীয় নারী ও অষ্টম ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পা রাখলেন রংপুরের মেয়ে নিম্নি।
পাহাড়ের প্রেমে রংপুরের মেয়েটি
নুরুন্নাহার নিম্নির গল্পটা শুরু হয়েছিল কোনো অভিযান কেন্দ্র থেকে নয়, বরং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ডওয়ার্ক থেকে। রংপুরে বেড়ে ওঠা নিম্নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। ২০০৬ সালে প্রথম বর্ষের ফিল্ডওয়ার্কে চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে প্রথম যান তিনি। সেদিনের সেই অনুভূতি তিনি কখনও ভুলতে পারেননি। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে যে দিগন্ত দেখেছিলেন, সেটা তাঁর ভেতরে এক নতুন দুনিয়া খুলে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বড় একটা সময় কাটে বান্দরবানের পাহাড়-জঙ্গলে। ক্লাস শেষে, ছুটিতে সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়তেন পাহাড়ের টানে। চাকরিতে ঢোকার পরও সে টান একটুও কমেনি। ভুটান, ভারতের সিকিম, নেপালের বিভিন্ন ট্রেইলে হাঁটতে হাঁটতে তিনি বুঝে গেলেন– পাহাড় তাঁর শখ নয়, যেন জীবন।
প্রস্তুতির শুরু
২০১৯ সালে নেপালের অস্ট্রেলিয়ান ক্যাম্পে ট্র্যাকিং শেষে প্রথমবার মনে দানা বাঁধে এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন। ২০২০ সালে এভারেস্ট বেজক্যাম্প ট্র্যাকে গিয়ে সেই স্বপ্ন আর স্বপ্ন থাকে না; হয়ে ওঠে লক্ষ্য। লক্ষ্য স্থিরের পর শুরু হয় প্রস্তুতি। ২০২২ সালে ভারতের দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিতে। উচ্চতাজনিত চাপ সামলানো, বরফের ঢালে আরোহণ, অক্সিজেনের পরিমাপ– সবকিছু রপ্ত করতে হয় একটু একটু করে। একই বছর যোগ দেন বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্র্যাকিং ক্লাব-বিএমটিসিতে। এর পর থেকে একজন পেশাদার পর্বতারোহী হিসেবে নিজেকে গড়তে থাকেন। প্রতিটি ছুটি ও সপ্তাহান্ত যেন একটু একটু করে এভারেস্টের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
ব্যাংকের ডেস্ক থেকে হিমালয় চূড়ায়
পেশাগত পরিচয়ে নুরুন্নাহার নিম্নি একজন ব্যাংকার, পূবালী ব্যাংক পিএলসির জেনারেল ব্যাংকিং বিভাগে প্রিন্সিপাল অফিসার। সপ্তাহের পাঁচ দিন সামলান ব্যাংকের ফাইলপত্র, হিসাব-নিকাশ আর গ্রাহকসেবা। ছুটির দিনে ডাকে পাহাড়। দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎকে তিনি বছরের পর বছর ধরে সমান দক্ষতায় সামলে এসেছেন।
সহকর্মীরা হয়তো অফিসে তাঁকে একজন নিষ্ঠাবান ব্যাংকার হিসেবেই চেনেন। কিন্তু সেই মানুষটিই সুযোগ পেলে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়তেন পাহাড়ের উদ্দেশে। এবারের এভারেস্ট অভিযানে তাঁর কর্মস্থলই হয়ে উঠেছে পৃষ্ঠপোষক, ব্যক্তিগত স্বপ্ন আর প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের এক বিরল মিলন।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিজয়ের সকাল
এভারেস্টে ওঠা শুধু শক্তি বা সাহসের পরীক্ষা নয়। এটি সময়, আবহাওয়া আর মানসিক দৃঢ়তারও লড়াই। গত ১১ এপ্রিল ঢাকা থেকে নেপালের উদ্দেশে যাত্রা করেন নিম্নি। কাঠমান্ডু থেকে লুকলা হয়ে পৌঁছেন বেজক্যাম্পে। শুরু হয় উচ্চতাজনিত পরিবেশের সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার কঠিন প্রক্রিয়া।
১১ এপ্রিল ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু। কাঠমান্ডু হয়ে এভারেস্ট বেজক্যাম্পের পথে রওনা দিয়ে নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে ২৭ মে ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে পৌঁছেন স্বপ্নের শিখরে। আট হাজার ৮৪৮ মিটার উচ্চতায় বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালেন নিম্নি। তিনি বলেন, ‘সেই অপেক্ষার দিনগুলো ছিল সবচেয়ে কঠিন। প্রতিদিন আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখা, ঝড়ের আশঙ্কা, অক্সিজেনের হিসাব, শরীরের সহনীয়তা– সবকিছু মিলিয়ে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়েছে। ২৫ মে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে আবার যাত্রা শুরু। ২৬ মে পৌঁছি ক্যাম্প ৪-এ। সেখান থেকে রাতের আঁধারে শুরু হয় শেষ লড়াই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা টানা আরোহণের পর ২৭ মে ভোরে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত!’
দেশের এভারেস্ট ইতিহাসে নতুন অধ্যায়
১৯৫৩ সালে এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগের হাত ধরে এভারেস্ট জয়ের যে ইতিহাস শুরু হয়েছিল; বাংলাদেশ তাতে নিজের নাম লেখায় ২০১০ সালে মুসা ইব্রাহীমের পদক্ষেপে। এরপর একে একে এমএ মুহিত, নিশাত মজুমদার, ওয়াসফিয়া নাজরীন, সজল খালেদ, বাবর আলী ও ইকরামুল হাসান শাকিল দেশের পতাকা উড়িয়েছেন সেই শিখরে। কিন্তু নারী পর্বতারোহীদের ক্ষেত্রে ২০১২ সালের পর থেকে ছিল দীর্ঘ বিরতি। নিম্নি সেই বিরতির অবসান ঘটালেন। তাঁর এই সাফল্য শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বাংলাদেশের নারী পর্বতারোহণের পুনর্জাগরণের ঘোষণা।
নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার গল্প
এভারেস্টে ওঠা মানে শুধু ৮ হাজার ৮৪৮ মিটার উচ্চতায় পৌঁছানো নয়। এটি নিজের সীমাকে অতিক্রম করার গল্প। একজন তরুণী, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ডওয়ার্কে গিয়ে প্রথম পাহাড়ের প্রেমে পড়েছিলেন; দিনের পর দিন ব্যাংকের কাজ সামলে রাতে পাহাড়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন; তিনিই একদিন পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে দাঁড়িয়ে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ালেন। নুরুন্নাহার নিম্নির এই সাফল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন বার্তা দিচ্ছে– স্বপ্ন যদি যথেষ্ট বড় হয়; পথ যত দুর্গমই হোক; শিখর একদিন ধরা দেয়।
- বিষয় :
- এভারেস্ট জয়
- নুরুন্নাহার নিম্নি
