ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

আলো ছড়ানো ছয় তরুণ

আলো ছড়ানো ছয় তরুণ
×

আলাউদ্দিন আলাদিন

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

মেসি-রোনালদোর এটিই শেষ বিশ্বকাপ! ঠিক এই মুহূর্তেই বিশ্বকাপের মাঠে আলো ছড়াতে এসেছে নতুন প্রজন্মের একঝাঁক তরুণ। কেউ বিদ্যুৎগতির ড্রিবলিংয়ে, কেউ জাদুকরী পাস, কেউবা অবিশ্বাস্য গোলে নিজেদের জানান দিচ্ছে বিশ্বকে। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেই উদীয়মান তারকাদের গল্প তুলে ধরেছেন আলাউদ্দিন আলাদিন

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে শুরু হয়েছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। এবার আসরটি আগের সব আয়োজনকে ছাড়িয়ে গেছে এক অনন্য বৈশিষ্ট্যে! ৪৮টি দল নিয়ে এই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। এর চেয়েও বেশি যা নজর কাড়ছে তা হলো এই টুর্নামেন্টে তারুণ্যের এক অভূতপূর্ব জোয়ার। মেসি-রোনালদোর মতো কিংবদন্তিরা সম্ভবত তাদের শেষ বিশ্বকাপ খেলছেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই মাঠে নামছেন নতুন প্রজন্মের একঝাঁক উজ্জ্বল প্রতিভা। ১৮ থেকে ২১ বছর বয়সী এই তরুণরা শুধু ভবিষ্যতের স্বপ্ন নয়, এখনই বর্তমানের বাস্তবতা। গোটা ফুটবলদুনিয়া এখন উন্মুখ হয়ে আছে এই প্রশ্নের উত্তরে; কে হবেন এই বিশ্বকাপের নতুন নায়ক?

ইতিহাস ও পরিসংখ্যান বদলে দেওয়া তারুণ্য
বিশ্বকাপের ইতিহাসে তরুণ খেলোয়াড়রা বারবার প্রমাণ করেছেন যে বয়স কোনো বাধা নয়। ১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে পেলে ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ জেতেন এবং ফাইনালে গোল করে লেখেন অবিস্মরণীয় ইতিহাস। সেই থেকে তরুণদের বিশ্বকাপে জ্বলে ওঠার ঐতিহ্য চলে আসছে। ২০১০ সালে জার্মানির থমাস মুলার মাত্র ২০ বছর বয়সে পাঁচ গোল ও তিন অ্যাসিস্ট দিয়ে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন। ২০১৪ সালে কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেজ ২৩ বছর বয়সে ছয় গোল করে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়ে সেরা খেলোয়াড়ের মুকুট পরেন। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে মাত্র ১৯ বছরে বিশ্বকাপ জিতে ফাইনালে গোল করা দ্বিতীয় কিশোর খেলোয়াড় হিসেবে পেলের পাশে নাম লেখান। ২০২২ সালে এনজো ফার্নান্দেজ আর্জেন্টিনার হয়ে তরুণ খেলোয়াড় পুরস্কার জিতে প্রমাণ করেন, তারুণ্য মানেই এক্স-ফ্যাক্টর। ইতিহাস বলছে, প্রতিটি বিশ্বকাপেই কোনো না কোনো তরুণ হঠাৎ করে উঠে এসে পাল্টে দিয়েছেন পুরো টুর্নামেন্টের হিসাব।

২০২৬ বিশ্বকাপের উদীয়মান ছয় তরুণ  
স্পেনের লামিনে ইয়ামাল
১৮ বছর বয়সী এই তরুণ এফসি বার্সেলোনায় খেলেন রাইট উইঙ্গার হিসেবে। ইউরো ২০২৪-এ ১৭তম জন্মদিনের পর দিনই ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করে ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলস্কোরার হওয়া লামিনে ইয়ামাল এখন বার্সেলোনা ও স্পেনের মেরুদণ্ড! ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৪৮ ম্যাচে ২৪ গোল ও ১৮ অ্যাসিস্টের অসাধারণ পরিসংখ্যানের ধারক এই তরুণ। তাঁর ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের গুণ তাঁকে বর্তমান ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড়দের একজনে পরিণত করেছে। স্বয়ং মেসিও বলেছেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে তাঁর পছন্দ ইয়ামাল। হ্যামস্ট্রিং চোটের কারণে প্রথম দুই ম্যাচে মাঠে না থাকলেও, ইয়ামাল ফিরলে স্পেনের শিরোপার দৌড় আরও শক্তিশালী হবে!

ব্রাজিলের এন্দ্রিক
লোনে রিয়াল মাদ্রিদ থেকে লিয়ঁতে খেলা ১৯ বছর বয়সী এই ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার রিয়ালে সময় পাওয়া নিয়ে সংকটে পড়েছিলেন, তারপর ফ্রান্সের লিয়ঁতে লোনে গিয়ে ২১ ম্যাচে ৮ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করে নিজের মূল্য প্রমাণ করেছেন। বিস্ফোরক গতি, জোরালো শট এবং ড্রিবলিংয়ের দক্ষতা তাঁকে করেছে ব্রাজিলের নতুন আশার প্রতীক। ভিনিসিউস জুনিয়রও একসময় এমন কঠিন পথ পার হয়েছিলেন। এন্দ্রিকের মধ্যে সেই পুনরুত্থানের গল্পই যেন বারবার ফিরে আসছে। ব্রাজিল ভক্তরা তাঁর দিকে তাকিয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছেন।

তুরস্কের আর্দা গুল
রিয়ালের অ্যাটাকিং মিডফিল্ড কাঁপানো ২১ বছর বয়সী এই তরুণ তুর্কি এই মৌসুমে লা লিগায় ১৪টি অ্যাসিস্ট করে আলো কেড়েছেন আগেই! আর্দা গুল চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও ঝলক দেখিয়েছেন। ৩৫ সেকেন্ডে গোল করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের দ্রুততম গোলের রেকর্ড গড়েছেন তিনি। তার বাঁ পা থেকে বেরিয়ে আসা পাস, ফ্রি-কিক ও দূরপাল্লার শট তুরস্কের শক্তির প্রধান উৎস। তাঁর কোচ বলেছেন, ‘তুরস্কে আর্দার প্রতি ভক্তিটা ঠিক যেমন ছিল নাপোলিতে ম্যারাডোনার প্রতি!’ তুরস্কের ২৪ বছরের বিশ্বকাপ অনুপস্থিতির পর এই তরুণই হতে পারেন দলের আসল ট্রাম্পকার্ড!

আর্জেন্টিনার নিকো পাজ
২৩ বছর বয়সী এই তরুণ ইতালিয়ান ক্লাব কোমোয় খেলেন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে। বাঁ-পায়ের এই খেলোয়াড়ের সঙ্গে প্রায়ই মেসির তুলনা করা হয়, গোল করেন, গোল বানান এবং দারুণ প্রেসিং করেন। গত মৌসুমে সিরি আ-তে সবচেয়ে বেশি সফল ড্রিবল সম্পন্ন করার পাশাপাশি ১৩ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করেছেন নিকো পাজ! কোমোর সাফল্যে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। জাতীয় দলে কতটা সুযোগ পাবেন তা নির্ভর করবে আর্জেন্টাইন কোচ স্কোলানির পরিকল্পনার ওপর, তবে সুযোগ পেলে তিনি তা কাজে লাগাতে পারবেন, এটুকু নিশ্চিত!

মরক্কোর গেসিম ইয়াসিন
২০ বছর বয়সী এই তরুণ ফরাসি ক্লাব স্ট্রাসবুর্গে খেলেন রাইট উইঙ্গার হিসেবে। বার্সেলোনা ও চেলসির মতো ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর নজরে থাকা মরক্কোর গেসিম ইয়াসিন হতে পারেন এবারের বিশ্বকাপের বড় তারকা! কোচ মোহাম্মদ ওউহাবির অধীনে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মার্চে ইকুয়েডরের বিপক্ষে সিনিয়র দলে অভিষেকের পর থেকে নিয়মিত জাতীয় দলে ডাক পাচ্ছেন এই উইঙ্গার–বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর ঝলক দেখার অপেক্ষায় ফুটবলপ্রেমীরা!

মেক্সিকোর গিলবার্তো মোরা
১৭ বছর বয়সী এই কিশোর মেক্সিকো জাতীয় দলে খেলেন মিডফিল্ডার হিসেবে। বিশ্বকাপ শুরুর দিন তাঁর বয়স হয়েছে মাত্র ১৭ বছর ২৪০ দিন। এবারের আসরের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামতে যাচ্ছেন গিলবার্তো মোরা! মাত্র ১৬ বছর বয়সে গত বছরের জুনে জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছিল এই প্রতিভাবান মিডফিল্ডারের। নিজের দেশের মাটিতেই বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পেয়েছেন এই কিশোর। স্বাগতিক দেশের এই তরুণ তারকার দিকে তাই সবার চোখ থাকবে আলাদাভাবে!

আরও যাঁরা আলো ছড়াতে পারেন
এই তালিকায় শুরুর দিকে আছেন ১৯ বছর বয়সী ইকুয়েডরের কেন্দ্রি পায়েজ। আলো কাড়বেন স্পেনের ১৯ বছর বয়সী পাউ কাবারসি। বার্সার তরুণ সেন্টার-ব্যাক, নতুন প্রজন্মের সেরা ডিফেন্ডার ক্রোয়েশিয়ার ১৯ বছরের লুকা ভুসকোভিচের ওপরও থাকবে ফ্লাড লাইটের আলো। সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণ সেন্টার-ব্যাকদের মধ্যে ইউরোপে শীর্ষস্থানীয়
কেনান ইলদিজ। তুরস্কের এই তরুণ তুর্কির বয়স এখনও ২০ এর ঘরে। জুভেন্টাসের হয়ে দারুণ ছন্দে থাকা তুরস্কের আক্রমণের দ্বিতীয় অস্ত্র এই তরুণ। তালিকায় আছেন ১৯ বছর বয়সী ব্রাজিলের রায়ান। বোর্নমাউথের এই তরুণ উইঙ্গার এস্তেভাও-এর অনুপস্থিতিতে সেলেসাওতে জায়গা পেয়েছেন। ২১ বছর বয়সী আর্জেন্টিনার নিকো পাজ। কোমো-র হয়ে ইতালিতে আলো ছড়ানো ২৩ বছর বয়সী জাপানি মিডফিল্ডার তাকেফুসা কুবো। রিয়াল সোসিয়েদাদের এই জাপানি উইঙ্গার ইউরোপের অন্যতম বিপজ্জনক খেলোয়াড়! মিতোমার অনুপস্থিতিতে সামুরাই ব্লুর প্রধান অস্ত্র এই তরুণ। 
২২ বছর বয়সী সৌদি আরবের মুসাব আল-জুওয়াইর খেলেন মিডফিল্ডে। সৌদি দলের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণ প্রতিভা; স্মার্ট পাসিং ও অ্যাটাকিং সেন্সের জন্য আলোচিত।

তরুণদের হাতেই ট্রফির ভবিষ্যৎ
বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ভবিষ্যদ্বাণীতে সবাই স্পেন, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের কথা বলছেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, শিরোপার হিসাব-নিকাশ ঘুরিয়ে দেওয়া সেই অপ্রত্যাশিত তরুণের গল্পই সবচেয়ে মনে থাকে। লামিনে ইয়ামাল যদি সুস্থ থেকে পুরো টুর্নামেন্ট খেলেন, স্পেনের শিরোপা ধরে রাখার সম্ভাবনা উজ্জ্বল! এন্দ্রিক যদি ব্রাজিলের জার্সিতে আগুন ঝরাতে পারেন, হলুদ দলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপের স্বপ্ন আর অলীক থাকবে না। আর গুলেরের নেতৃত্বে তুরস্ক যদি চমক দেখায়, তাহলে ফুটবল ভক্তরা আরেকটি ২০০২ সালের মতো রূপকথার সন্ধান পাবেন।

দেশের তরুণদের প্রত্যাশা
দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার যে গভীর জায়গা, তা কোনো পরিসংখ্যানে মাপা সম্ভব নয়। ঢাকার গলি থেকে চট্টগ্রামের বন্দর, সর্বত্র হলুদ ও নীল-সাদা পতাকার মহামিলন। এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এন্দ্রিক বা আর্জেন্টিনার মাস্তান্তুওনোর প্রতিটি গোলে বাংলাদেশের মাঠ-ঘাট যেন কেঁপে উঠছে উল্লাসে। তারুণ্যের এই উৎসবে বাংলার দর্শকরা যার সমর্থক হোন না কেন শেষ পর্যন্ত তারা চান ফুটবলের জয়। আর পরিসংখ্যানে চোখ রেখে তরুণরাও বলতে পারেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই জয়ের গল্পটা লিখতে শুরু করেছে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে! u
 

আরও পড়ুন

×