প্রেরণা
পরিশ্রমের বড়াই করুন
ব্রিজিত বার্দো (জন্ম: ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪, মৃত্যু: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫) ছবি : সংগ্রহ
জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিয়া
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ব্রিজিত বার্দো। সিনেমা ও মডেলিং জগতের সবচেয়ে আবেদনময়ী ব্যক্তিত্বের অন্যতম। পরবর্তী সময়ে প্রাণী রক্ষা আন্দোলনের অগ্রপথিক হয়ে ওঠা এই কিংবদন্তির বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রেরণার কথা তুলে এনেছেন জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিয়া
১৯৪৯ সালে এক পারিবারিক বন্ধু আমাকে ফ্যাশন শোর মডেল হতে আমন্ত্রণ জানান। এর পর ‘ফ্রেঞ্চ এল’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে আমার ছবি দেখে যোগাযোগ করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা রগা ভাদি, ওরফে রজার ভাদিম। আমার বয়স তখন ১৫। পরে বিখ্যাত হয়ে যাওয়ার পর প্রাণীদের অধিকার ও জীবন রক্ষার আন্দোলনে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছি।
যুদ্ধের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা
তবে প্রাণীর প্রতি এক ধরনের প্রীতি বা মমতা আমার মনে ছোটবেলা থেকেই কাজ করে। শৈশবে যেহেতু যুদ্ধের ভেতর দিয়ে বড় হয়েছি, ফলে প্যারিসে জীবনযাত্রা ভীষণ দুরূহ ছিল বলে কোনো প্রাণীর প্রতি আলাদা মনোযোগ বা মমতা দেখাতে পারিনি। যুদ্ধের স্মৃতি এখনও আমাকে ঘোরগ্রস্ত করে। এখনও আতশবাজি কিংবা বজ্রপাতের শব্দ শুনলে সে দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়!
সাধারণেই স্বস্তি
মৌচাকের মতো চুল, অসংযত মেকআপ, বিড়ালের মতো আইলাইনার–সব মিলিয়ে আমার যে একটা কমন লুক দাঁড়িয়ে গেছে, সেটি আমার নিজের সৃষ্টি নয়; লোকজন চেহারা ও চুল নিয়ে ফিসফাস করুক–এটি আমার কোনোদিনই ভালো লাগেনি। বরং অভিনয় কিংবা মডেলিংয়ের বাইরের সময়টায় পুরোনো ধাঁচে, নিজের মতো সাধারণ একটি সাজে থাকতেই ভালোবেসেছি।
উড়ুক্কু সময়ের সিদ্ধান্ত
১৯৭৩ সালে ক্যারিয়ারের এক উড়ুক্কু সময়ে অভিনয় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিই আমি। এর কারণ আর কিছু নয়; স্রেফ একটাই–টের পেয়ে গিয়েছিলাম, এ জীবন আমাকে স্বস্তি দিচ্ছে না। বরং নিজের প্রাণীর প্রতি ভালোবাসাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সেটিকে ঘিরে জীবন এগিয়ে নেওয়ার ভাবনা ছিল আমার। ফলে পেছন ফিরে চাইনি।
প্রাণীর জন্য ফাউন্ডেশন
১৯৮৬ সালে নিজের জিনিসপত্র নিলামে তুলে, ‘ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন’ গড়ে তুলি। এতদিন রাস্তায় যত কুকুর-বিড়াল উদ্ধার করে সেগুলোর প্রাণ বাঁচালেও, এ কাজটিকে আরও নিবিড়ভাবে করার উদ্দেশ্যেই এই ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা। আমি চেয়েছি ফ্রান্স কিংবা যে কোনো দেশের বন্য কিংবা পোষা প্রাণী সব উদ্ধার করতে, রক্ষা করতে, নিরাপদ জীবন দিতে। কাজটা খুব ছোট আকারে শুরু করেছিলাম। দিনে দিনে জেনে নিয়েছি প্রাণী রক্ষার যত আইনকানুন, সংগঠন-সংস্থার খোঁজখবর, ব্যবস্থাপনা কৌশল, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়-আশয়। আমি, আমার স্বামী ও বন্ধু সবাই নিরামিষভোজী। আমার ধারণা, প্রাণীর মাংস খাওয়া অনেকটা নরমাংস ভক্ষণের মতোই নৃশংস ব্যাপার। দেখেছি, অনেক মানুষ না বুঝেই নানা প্রাণীকে বিপদগ্রস্ত করে তোলে। তারা এগুলোকে গণ্য করে স্রেফ পণ্য কিংবা মাংসের জোগান হিসেবে। এ বিষয়টি ভীষণ মর্মাহত করে আমাকে। ফলে বিলুপ্তির কিনারায় পৌঁছে যাওয়া প্রজাতিগুলোকে রক্ষা করার জন্য যে কোনো লড়াই করে যেতে নিজেকে সবসময় প্রস্তুত রাখি। জানি, এগুলোকে রক্ষা করার ব্যাপারে জনসচেতনতা গড়ে তোলা খুবই জরুরি।
শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে নয়, পরিশ্রমের বড়াই
নিজের শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে কোনোদিনই বড়াই ছিল না আমার। বিশ্বাস করি, মেরিলিন মনরো আর আমি একেবারেই আলাদা দুটি মানুষ হলেও, আমরা দুজনই নিজেদের ঘিরে রাখা ভাবমূর্তির দুর্ভাগ্যজনক শিকার। আশি বছর বয়সে পৌঁছেও নিজের স্বাস্থ্য ও জীবন নিয়ে আমি সুখী। বাতগ্রস্ত হয়ে পায়ের অবস্থা যদিও নাজুক, তবু ছড়িতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটি। আর ফাউন্ডেশনের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখি প্রতিদিন। সরকারি মন্ত্রী, বিদেশি কূটনীতিক, মেয়র ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে প্রাণী রক্ষার আবেদন জানিয়ে নিয়মিত চিঠি লিখি। নিজের সংরক্ষণে থাকা প্রাণীদের যত্ন নিই। এতদিন কাজ করে বুঝেছি, প্রাণীদের প্রতি মানুষের মমত্ব কম হওয়ার কারণ, মানুষ নিজের ভেতর জন্মগতভাবেই নিষ্ঠুরতা ও আদিম হিংস্রতাকে ধারণ করে!
- বিষয় :
- প্রেরণার কথা