তৃণমূলের ১৫ তরুণের জাতীয় স্বীকৃতি
‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড-২০২৬’ স্বীকৃতি পাওয়া তৃণমূলের ১৫ তরুণের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীসহ অতিথিরা... ছবি: সংগ্রহ
সোহানুর রহমান
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
সামাজিক ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড-২০২৬’ পেয়েছেন তৃণমূলের ১৫ তরুণ। নিজেদের সংগ্রাম পেরিয়ে নারীদের স্বাবলম্বী করছেন কেউ। কেউ ক্রিকেটে নতুন পথ দেখাচ্ছেন তরুণদের। নদীর মানুষের অধিকার থেকে পাহাড়ের পরিবেশ, তৃণমূলের নানা উদ্যোগ এবার পেল জাতীয় সম্মাননা। পুরস্কারজয়ীদের গল্প জানাচ্ছেন সোহানুর রহমান
অল্প বয়সেই বিয়ে। সংসারে অভাব, তারপর পারিবারিক নির্যাতন। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েই একসময় অনিশ্চয়তায় ছিলেন কুষ্টিয়ার পারভীন নাহার কণিকা। কখনও গৃহশিক্ষকতা, কখনও সেলাই, আবার কখনও নার্সের কাজ করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এখন তাঁর চেষ্টা, অন্য নারীরাও যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন। পারভীনের মতো কেউ ব্যক্তিগত সংগ্রাম জয় করেছেন, কেউ মানুষের দুর্দশা দেখে এগিয়ে এসেছেন। তৃণমূলে কাজ করা এমন ১৫ তরুণ-তরুণী পেয়েছেন ‘যুব স্বেচ্ছাসেবক পুরস্কার ২০২৬’। গত ১৭ অক্টোবর ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও উপস্থিত ছিলেন। আটটি ক্ষেত্রে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রত্যেকে পেয়েছেন এক লাখ টাকার চেক, ক্রেস্ট ও সনদ। অনুষ্ঠানে দেশের ৬৪
জেলা থেকে প্রতিনিধিরা অনলাইনে যুক্ত হন। প্রধানমন্ত্রী তরুণদের শুধু নিজেদের উন্নতির কথা না ভেবে অন্য মানুষের কল্যাণেও কাজ করার আহ্বান জানান।
নিজের লড়াই থেকে অন্যের ভরসা
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার কলেজপাড়ার পারভীনের জীবনে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। বাবার অসুস্থতা সংসারের সংকট বাড়িয়েছিল। অল্প বয়সেই বিয়ে তাঁকে নিরাপত্তা দেয়নি; নির্যাতনের অভিজ্ঞতাও পেরোতে হয়েছে। তবু উপার্জনের পথ খোঁজা থামাননি। গৃহশিক্ষকতা, সেলাইয়ের পাশাপাশি নার্সের কাজ করে ধীরে ধীরে নিজের আয় বাড়াতে থাকেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছেন, উপার্জনের সুযোগ না থাকলে অনেক নারী প্রতিকূল জীবন থেকে বেরোতে পারেন না। স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদন শুরু করেন তিনি। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন উষা যুব উন্নয়ন সংগঠন। ন্যাপকিন তৈরির পাশাপাশি নকশিকাঁথা ও গবাদিপশু পালনের মতো কাজে অন্যদের যুক্ত করেন। আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিভাগে তাঁর পুরস্কার সেই চেষ্টা ও সংগ্রামের স্বীকৃতি।
করিমপাড়া জনকল্যাণ যুব সংঘের বিপ্লব
বগুড়ার গাবতলীর আতিকুল ইসলাম বিপ্লবের পথচলা শুরু আরও আগে। ২০০৯ সালে কয়েক তরুণকে নিয়ে গড়ে তোলেন করিমপাড়া জনকল্যাণ যুব সংঘ। পরে নাম হয় জামিরবাড়িয়া হাট জনকল্যাণ যুব সংঘ, যা নিবন্ধন পায় ২০২৫ সালে। শুরুতে এলাকার ছোট সমস্যায় এগিয়ে আসতেন। পরে কাজ ছড়িয়ে পড়ে নানা দিকে। তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে ফুটবল ম্যাচ ও সচেতনতামূলক আয়োজন করেছেন। বেকার যুবকদের মাছ চাষ শেখানো, বৃক্ষরোপণ এবং অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের সহায়তাও তাঁর সংগঠনের কাজ। গ্রামে বায়োগ্যাস ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছেন। করোনাকালে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তি ও নিহতদের পরিবারের জন্য সহায়তার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের কাছে স্বেচ্ছাসেবা এক দিনের আয়োজন নয়; ১৭ বছর ধরে মানুষের প্রয়োজনে সাড়া দেওয়ার অভ্যাস। সমাজসেবা ও জনকল্যাণ বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
খেলার মাঠে স্বপ্ন, নদীতে অধিকার
চাঁদপুরের শাহরাস্তির সাদ্দাম হোসেন মিঠু তরুণদের জন্য বেছে নিয়েছেন ক্রিকেট। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শাহরাস্তি ক্রিকেট একাডেমিতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক খেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালে শুরু করেন শাহরাস্তি প্রিমিয়ার লিগ। প্রথম আসরে ৩২টি দল অংশ নেয়। পুরস্কার বিতরণীতে অতিথি ছিলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল ও ক্রিকেটার মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। স্থানীয় কয়েকজন খেলোয়াড় ঢাকার ক্লাবেও খেলার সুযোগ পেয়েছেন। প্রত্যন্ত এলাকার একজন খেলোয়াড়ের জন্য নিয়মিত অনুশীলন, প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের কাছাকাছি আসার সুযোগ সহজে মেলে না। মিঠুর চেষ্টা সেই দূরত্ব কিছুটা কমানো। পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে মিঠু বলেন, ‘এটি আমার জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত, যা আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে।’ এই স্বীকৃতি তাঁকে বড় পরিসরে কাজ করতে উৎসাহ দেবে।
মান্তাদের নিয়ে কাজের স্বীকৃতি
বরিশালের নদীতে নৌকায় বসবাসকারী মান্তা জনগোষ্ঠীর অনেকের স্থায়ী ঠিকানা নেই। ফলে পরিচয়পত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আর্থিক সেবায় তাঁদের প্রবেশ কঠিন। এই জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে ২০১৬ সালে কাজ শুরু করেন ঝালকাঠির মো. আরিফুর রহমান। বর্তমানে ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক তিনি। সংগঠনের ‘মান্তাকানেক্ট’ উদ্যোগে প্রায় ৩০০ মান্তা সদস্যকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে সহায়তা করেছেন। পরিবেশ শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজেও তিনি যুক্ত।
পাহাড়ে সাইমুনের স্বপ্নবুনন
একই বিভাগে সম্মানিত হয়েছেন রাঙামাটির মো. সাইমুন ইসলাম। স্বপ্নবুনন যুব সংস্থার সদর উপজেলা সমন্বয়ক হিসেবে তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও দুর্যোগকালীন মানবিক কার্যক্রমে যুক্ত। পাহাড়ের জনপদে কাজ করা এই তরুণের জাতীয় স্বীকৃতি মনে করিয়ে দেয়, রাজধানীর বাইরে থেকেও স্বেচ্ছাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব। পরিবেশের ক্ষতি কিংবা দুর্যোগের অভিঘাত স্থানীয় মানুষের জীবনে সরাসরি পড়ে। তাই স্থানীয় তরুণদের অংশগ্রহণ এসব এলাকার জন্য জরুরি।
আরও যারা পেলেন স্বীকৃতি
ক্রীড়া উন্নয়ন বিভাগে মিঠুর সঙ্গে পুরস্কার পেয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক ও জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড় মোছাম্মৎ নার্গিস খাতুন। খেলোয়াড় পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর এই নেতৃত্ব নারীদের মাঠে অংশগ্রহণের গুরুত্বও সামনে এনেছে। আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে পারভীনের সঙ্গে আরজু আকতার; সমাজসেবা ও জনকল্যাণে বিপ্লবের সঙ্গে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম পুরস্কৃত হয়েছেন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি বিভাগে মো. আবদুল্লাহ আল সিয়াম ও মো. রিয়াদ হোসেন; নারী ও শিশু উন্নয়নে কামরুন নাহার মোহনা ও অমিত দাস; শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসারে ইসতাক আহমেদ এবং কলা এবং সংস্কৃতিতে মো. শান্ত শেখ ও খালেদা আক্তার সম্মাননা পেয়েছেন।
৪১৩টি আবেদন থেকে সেরাদের বাচাই
এবার পুরস্কারের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল ৪১৩টি। জেলা পর্যায়ে ১৮০ জনের নাম সুপারিশের পর নির্বাচিত হন ১৫ জন। পাশাপাশি ১ হাজার ৬০৮টি আবেদন থেকে ৪৩২টি যুব সংগঠন প্রকল্প অনুদানের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। নির্বাচনে জেলা পর্যায়ের কমিটিগুলোর সুপারিশ ও যুবকল্যাণ তহবিল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের মূল্যায়ন বিবেচনায় নেওয়া হয়। এই আয়োজন অনেক ছোট সংগঠনকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। তবে পুরস্কারের পরও পারভীনের মতো উদ্যোক্তার দরকার বাজার সংযোগ, মিঠুর একাডেমির প্রশিক্ষণ সুবিধা, আর স্থানীয় সংগঠনগুলোর প্রয়োজন টেকসই অর্থায়ন ও সহযোগিতা।
আগামীর স্বপ্ন
এই তরুণদের কেউ নিজের জীবনের প্রতিকূলতা জয় করে অন্যের স্বাবলম্বিতার পথ খুলেছেন। কেউ খেলাধুলায় তরুণদের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন; কেউ দাঁড়িয়েছেন প্রান্তিক মানুষের পাশে। তাদের অনেকের শুরু সীমিত সামর্থ্য নিয়ে। রাষ্ট্র সেই কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো সেই মানুষগুলোর মুখের হাসি, যারা বিপদের দিনে কাউকে পাশে পেয়েছেন কিংবা নতুন করে বাঁচার সাহস খুঁজে পেয়েছেন। সামনের দিনগুলোতে তারা তাদের স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে পারবেন নিশ্চয়– এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা!
- বিষয় :
- তরুণী