ছায়ানটে লোকগানের সুরে ওয়াহিদুল হককে স্মরণ
ওয়াহিদুল হককে স্মরণে ছায়ানটে ‘দেশঘরের গান’ অনুষ্ঠান
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ | ১৫:০৬ | আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২৬ | ১৫:০৮
ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সংস্কৃতি চিন্তক ওয়াহিদুল হককে স্মরণে নিয়মিত আয়োজন ‘দেশঘরের গান’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার সকাল ১০টায় ছায়ানট মিলনায়তনে এবারের আয়োজনের মূল সুর ছিল বাংলাদেশের লোকঐতিহ্যের দুই অনন্য ধারা-পালাগান ও আঞ্চলিক গান।
স্মরণ অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলীর কথনের মধ্য দিয়ে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ওয়াহিদুল হকের জীবনদর্শন, জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতিবোধের গভীরতা। তিনি বলেন, পাশ্চাত্যের রূপকথায় প্রায়ই দেখা যায়- প্রত্যেক গ্রামে একজন জ্ঞানী মানুষ থাকেন, যার কাছে মানুষ বিপদের সময় পরামর্শ নিতে যায়। সমাজের পথচলায় তাঁর জ্ঞান হয়ে ওঠে দিশারী। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে এমনই একজন জ্ঞানী মানুষ ছিলেন ওয়াহিদুল হক।
তিনি বলেন, ওয়াহিদুল হকের জ্ঞানের পরিধি কেবল সঙ্গীতের তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সংস্কৃতির প্রায় সব শাখায়,স্থাপত্য থেকে শুরু করে পরমাণু বিজ্ঞান পর্যন্ত-তাঁর ছিল বিস্ময়কর দখল। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল তাঁর জ্ঞান বিতরণের প্রবণতা। মানুষকে চিন্তায় শাণিত করা এবং একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্নই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। সেই সাধনায় সঙ্গীত ছিল তাঁর প্রধান অবলম্বন। আমরা তাঁকে বলি ‘গানের ফেরিওয়ালা’। তিনি সঙ্গীত নিয়ে সারা দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আজকের অনেক খ্যাতিমান শিল্পীর শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য, বলেন সারওয়ার আলী।
ওয়াহিদুল হকের সমাজচিন্তার একটি স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর শিল্পী কামরুল হাসানের নেতৃত্বে একটি ত্রাণদল দুর্গত এলাকায় যায়। দিনের পরিশ্রম শেষে রাতে তাঁরা আলোচনা করছিলেন, একটি স্বাধীন দেশ হলে সেটি কেমন হবে। কামরুল হাসান প্রস্তাব করেছিলেন, গ্রামাঞ্চলের মসজিদগুলো ফজরের নামাজের পর থেকে জোহর পর্যন্ত ফাঁকা থাকে; সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়, ক্লাব বা পাঠাগার গড়ে তোলা যেতে পারে। সেই আলোচনায় ওয়াহিদুল হক মন্তব্য করেছিলেন-সেখানে তো হিন্দুদেরও যেতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিস্তারে তিনি সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিতেন।
ডা. সারওয়ার আলী বলেন, জীবনের শেষ পর্যায়ে ওয়াহিদুল হক দেশের আদি ও শুদ্ধতম দেশজ সংস্কৃতির দিকে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল,বাংলাদেশের লোকঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বাণিজ্যিকতার ঝুঁকির ভেতরেও এই শুদ্ধ লোকরূপকে সংরক্ষণ করা জরুরি। কারণ লোকসংগীত মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য গড়ে তোলে, সমাজের বৈষম্য ও অসংগতিকেও তুলে ধরে। এই ভাবনার ধারাবাহিকতাতেই এবারের আয়োজন সাজানো হয় দেশজ লোকশিল্পীদের পরিবেশনায়।
কথনের পর শুরু হয় মূল পরিবেশনা। অনুষ্ঠানের সূচনায় সুনামগঞ্জের শিল্পী অনামিকা কর একক আঞ্চলিক গানে শোনান লোকঐতিহ্যের তিনটি পরিচিত গান- হাছন রাজার ‘একদিন তোর হইবো রে মরণ’, শাহ আব্দুল করিমের ‘বসন্ত বাতাসে সই গো’ এবং রাধারমণ দত্তের ‘জলে গিয়াছিলাম সই’। তাঁর কণ্ঠে সুরের ভাঁজে ভাঁজে ধরা পড়ে সিলেট অঞ্চলের লোকসংগীতের আবহ।
এরপর চাঁদপুরের শিল্পী মুক্তা সরকার পরিবেশন করেন আঞ্চলিক গানের আরেকটি পর্ব। তিনি শোনান রমেশ শীলের ‘তরানে ওয়ালা’, দূরবীন শাহের ‘ডাকলে কি আর প্রাণ জুড়োবে’ এবং গুষ্ঠ গোপালের ‘ও জীবনরে জীবন’; যেখানে নদীমাতৃক বাংলার আবেগ ও লোকজ জীবনবোধ প্রতিফলিত হয়।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করে নেত্রকোনার বাউল শিল্পী সিরাজউদ্দিন পাঠান পরিবেশন করেন সিরাজ আলীর ‘জানি না রে, নদীর কোন কুল বালা’। পাশাপাশি তিনি গেয়েছেন নিজের দুটি গান। ‘রাধিকা তুই আমার প্রেমের মূল্য দিলি না’ এবং ‘খালি হাতে যাবো রে এখন’। তাঁর পরিবেশনায় বাউল ধারার আধ্যাত্মবাদী সুরের পাশাপাশি ধরা পড়ে জীবনবোধের সহজিয়া দর্শন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে নেত্রকোনার দেলোয়ার হোসেন দিলু বয়াতি ও তাঁর দল পরিবেশন করেন কারবালার প্রান্তরের করুণ কাহিনী অবলম্বনে একটি পালাগান। বয়াতিদের ঐতিহ্যবাহী বর্ণনাভঙ্গি, সুর ও সংলাপে ভর করে সেই কাহিনী মঞ্চে হয়ে ওঠে এক আবেগঘন লোকনাট্য।
সকালবেলা অনুষ্ঠিত এই লোকজ আয়োজনে অনেক দর্শক উপস্থিত থেকে এটি উপভোগ করেন। তাদের অনেকের মতে, লোকঐতিহ্যের সুরে সাজানো এই আয়োজন যেন স্মরণ করিয়ে দেয় ওয়াহিদুল হকের সেই স্বপ্ন; যা বাংলার মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির শিকড়ে দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা এক সৌহার্দ্যময় সমাজের স্বপ্ন।
