ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ক্লিংস্পোর মিউজিয়ামে শিশু বই প্রদর্শনী

বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের এক নতুন সেতুবন্ধন

বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের এক নতুন সেতুবন্ধন
×

ছবি: সংগৃহীত

হাবিব বাবুল

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬:২৭ | আপডেট: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬:২৯

শিশুসাহিত্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্পনা, চিন্তা ও মানবিকতার বীজ বপনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। বইয়ের পাতায় আঁকা রঙিন ছবি, গল্পের ছোঁয়ায় জেগে ওঠা বিস্ময় ও বিস্তার—এইসব মিলেই শিশুদের পৃথিবী হয়ে ওঠে আরও বিস্তৃত ও নির্মল। জার্মানির অফেনবাখে অবস্থিত ক্লিংস্পোর মিউজিয়াম সেই নির্মল পৃথিবীরই শিল্পসম্মত ও ইতিহাসভিত্তিক নথি সংরক্ষণ করে আসছে ১৯৫৩ সাল থেকে। টাইপোগ্রাফি, ক্যালিগ্রাফি ও বই ডিজাইনের জগতে অনন্য এই মিউজিয়াম ২০২৬ সালে আয়োজন করতে যাচ্ছে তাদের আন্তর্জাতিক শিশু বই প্রদর্শনীর ৭০তম বর্ষপূর্তি। সাত দশকের এই পথচলা শুধু একটি প্রদর্শনীর ধারাবাহিকতা নয়; এটি বিশ্বব্যাপী শিশুসাহিত্যের বিকাশ, বিবর্তন ও স্বীকৃতির এক ইতিহাস।

২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী। এবারের থিম “জন্মদিনের উৎসব”, যা নিছক একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সংস্কৃতি-ভেদে মানবজীবনে আনন্দ ও উদযাপনের বহুমাত্রিক রূপকে সামনে আনার একটি বৈশ্বিক শিল্পমঞ্চ। জন্মদিন মানে নতুন করে শুরু হওয়া, স্মৃতি ও উদযাপনের মিলনস্থল; আর শিশু বইয়ের জগতে তারাই তো সবচেয়ে বেশি উদযাপিত, সবচেয়ে বেশি প্রতীক্ষিত!

এই প্রদর্শনীতে থাকবে নতুন বইয়ের সঙ্গে অতীতের শিশু বই ডিজাইনের ইতিহাসও। সাদাকালো চিত্র থেকে আধুনিক রঙিন ইলাস্ট্রেশনের রূপান্তর, টাইপোগ্রাফির পরিবর্তন, বই নির্মাণের নান্দনিকতা—সবই থাকবে দর্শকের সামনে একসঙ্গে উন্মুক্ত। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে প্রদর্শিত হবে অগ্রগামী শিল্পী হেন্ড্রিক নিকোলাস ওয়ার্কম্যানসহ আরও বহু মহান বই-শিল্পীর কাজ, যা শিশু বইয়ের বিবর্তনকে ইতিহাসের ধারায় সুবিন্যস্ত করে তুলবে।

তবে এবারের প্রদর্শনী আমাদের বাংলাদেশের জন্য আরও অর্থবহ ও গর্বের। কারণ এই অনুষ্ঠানের অন্যতম বিশেষ অতিথি, কিউরেটর ও আয়োজক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ শিশুসাহিত্যকর্মী মিতিয়া ওসমান। বর্তমানে তিনি ক্লিংস্পোর মিউজিয়ামে ফেলোশিপ করছেন এবং প্রদর্শনীর পরিকল্পনা, কিউরেশন ও বিশ্বব্যাপী অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

মিতিয়া ওসমান শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইতোমধ্যে স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছেন। তিনি ঢাকার পরিচিত শিশুপুস্তক প্রকাশনা ময়ূরপঙ্খীর প্রধান—যে প্রতিষ্ঠান বহু ছবির বই, উপন্যাস ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিশুগ্রন্থ প্রকাশ করে দেশের শিশুসাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ময়ূরপঙ্খির কাজ ইতোমধ্যে দেশের বাইরে প্রশংসিত হয়েছে, এবং এবার প্রথমবারের মতো ক্লিংস্পোর মিউজিয়ামের মতো বিশ্বমানে স্বীকৃত মঞ্চে স্থান পাচ্ছে বাংলাদেশের সমকালীন শিশু বই। এটি নিঃসন্দেহে বাংলা শিশুসাহিত্যের জন্য এক ঐতিহাসিক অর্জন।

কয়েকদিন আগে মিতিয়ার ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে আমি মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছি। বলতে দ্বিধা নেই—দেখে আমি অভিভূত। এত সুসংগঠিত ও নান্দনিকভাবে সাজানো প্রদর্শনী হল, আলো-ছায়ার নিখুঁত ব্যবহার, বইয়ের ইতিহাসের পাশে বর্তমানের সৃজনশীলতার রেখাচিত্র—সব মিলিয়ে মনে হয়েছে আমি যেন বইয়ের ইতিহাসের সাথে পাশাপাশি হাঁটছি। মিতিয়া অত্যন্ত যত্ন ও আন্তরিকতায় প্রদর্শনীর প্রতিটি অংশ গড়ে তুলছেন। তার কাজের প্রতিটি স্পর্শে ফুটে ওঠে পেশাদারিত্ব, নান্দনিকতা এবং শিশু বইয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা।

এটাও উল্লেখযোগ্য যে মিতিয়া ওসমান আন্তর্জাতিক প্রকাশজগতে বর্তমানে অন্যতম আলোচিত তরুণ প্রকাশক। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় তিনি বিশ্বের প্রভাবশালী নারী প্রকাশকদের একজন হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন। তার কাজ এখন আর শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—ইংল্যান্ড, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্কসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে তার পথচলা বিস্তৃত। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে নারীর নেতৃত্বের যে নতুন দিগন্ত তৈরি হচ্ছে, মিতিয়ার সাফল্য তার উজ্জ্বল প্রতীক।

তার এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং ক্লিংস্পোর মিউজিয়ামে অংশগ্রহণ নিছক ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের অগ্রযাত্রার সোপান। একদিকে বিশ্ব আমাদের সাহিত্যকে চিনছে, অন্যদিকে আমরা পাচ্ছি নতুন অনুপ্রেরণা, নতুন সম্ভাবনার জানালা।

বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য দীর্ঘদিন ধরে বিকাশমান এক ধারায় এগোচ্ছে। কখনো লোককথা, কখনো ইতিহাস, কখনো স্বপ্ন—সব মিলিয়ে শিশুদের গল্পের জগত আজ আরও বিস্তৃত। মিতিয়া ওসমানের আন্তর্জাতিক ভূমিকা এই সৃজনশীল ঐতিহ্যে যোগ করবে নতুন আলো, নতুন গতি। ৭০তম প্রদর্শনী শেষে ফিরে আসবে অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ, ভাবনা—যা ভবিষ্যতের বই নির্মাণে কাজে লাগবে নিশ্চিতভাবেই। আগামী প্রজন্মের হাতে আমরা তুলে দিতে চাই পরিচ্ছন্ন দৃশ্যমানতা, কল্পনার রূপকথা, সত্য ও বিজ্ঞানের আলো। সেই পথেই আরও একধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

ক্লিংস্পোর মিউজিয়ামের এই উৎসব শুধু তাদের জন্মদিন নয়—এটি শিশু বইয়ের, পাঠকের, প্রকাশকের এবং কল্পনার জন্মদিন। আর এই জন্মদিনে বাংলাদেশের উপস্থিতি যেন রঙিন আতশবাজির দীপ্তির মতো, আত্মবিশ্বাসী ও দূরপ্রসারী।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম, ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি

আরও পড়ুন

×