মেঘের রাজ্যে এক রাত
সবুজের বুকে ভেসে চলা মেঘের অপরূপ সৌন্দর্য
রবিন হাসান
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৯
জীবনের কিছু কিছু অভিজ্ঞতা কেবল স্মৃতিতে নয়, হৃদয়ে চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যায়। মারায়নতং পাহাড়ের চূড়ায় আমাদের ৯ বন্ধুর ট্র্যাকিং তেমনই এক গল্প। এটি শুধু একটি পাহাড় জয় ছিল না; বরং প্রকৃতি, বন্ধুত্ব আর অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার এক মেলবন্ধন।
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় অবস্থিত মারায়নতং পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় এক হাজার ৬৪০ ফুট। এটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং চূড়ায় অবস্থিত একটি বিশাল বৌদ্ধ উপাসনালয় বা ‘জাদি’-এর জন্য পরিচিত। স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই পাহাড়ের বিভিন্ন নাম প্রচলিত আছে। প্রচলিত মত অনুযায়ী, মারমা ভাষায় এর নাম ‘মারাইং তং’। এখানে ‘মারাইং’ শব্দের অর্থ হলো ‘শঙ্খ’ এবং ‘তং’ শব্দের অর্থ ‘পাহাড়’। ধারণা করা হয়, পাহাড়ের আকৃতি শঙ্খের মতো হওয়ায় অথবা এখানে শঙ্খের মতো দেখতে এক ধরনের গাছ থাকার কারণে এর এমন নামকরণ হয়েছে।
এ ছাড়া চূড়ায় বৌদ্ধ উপাসনালয় থাকায় অনেকে একে ‘মেরাইথং জাদি’ নামেও ডাকে। এই পাহাড়ের পাদদেশে ত্রিপুরা, মারমা ও মুরংয়ের মতো বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী বসবাস করে।
মারায়ানতংয়ের অপার সৌন্দর্যের জন্য ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এটি এক নতুন আকর্ষণ। আমরা ৯ বন্ধু মিলে ঠিক করেছিলাম, এই পাহাড়ের চূড়ায় উঠে মেঘের সঙ্গে আলিঙ্গন করব। পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছেই আমাদের ট্র্যাকিংয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো। স্থানীয় এক হোটেল থেকে রাতের খাবার এবং ক্যাম্পিংয়ের সরঞ্জাম নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করি। পথটা ছিল বন্ধুর, খাড়া আর চ্যালেঞ্জিং। প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল যেন এক নতুন যুদ্ধের সমান। তবে সেই ক্লান্তি নিমেষে উবে যায় যখনই প্রকৃতির স্নিগ্ধ পরশ গায়ে লাগে। বুনো লতা-পাতার ঘ্রাণ, পাখির কিচিরমিচির আর সবুজ বনের নিস্তব্ধতা আমাদের সতেজ করে। প্রায় চার ঘণ্টার অবিরাম হাঁটার পর যখন আমরা চূড়ায় পৌঁছলাম, তখন সূর্যের শেষ আলোটুকু পাহাড়ের গায়ে লেগে এক মায়াবী আভা তৈরি করছিল। চারপাশে সবুজের ঢেউ, দূরে ছোট ছোট ঘরবাড়ি আর বাঁকে বাঁকে মেঘের আনাগোনা। সে এক অসাধারণ দৃশ্য! মনে হচ্ছিল যেন আমরা পৃথিবীর সব কোলাহল থেকে অনেক দূরে, এক শান্ত স্বর্গে এসে পৌঁছেছি। প্রতিটি কষ্ট যেন এই অপরূপ সৌন্দর্যের কাছে নগণ্য মনে হচ্ছিল। এই সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পঙ্ক্তিগুলো আমাদের জন্যই লেখা হয়েছিল:
‘ঐ বুঝি পর্বতমালা,
ঐ বুঝি মেঘের ভেলা।
ঐ বুঝি দূরে নদী–
ছুটে চলে নিরবধি।’
ক্যাম্পিংয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, কিন্তু রাতের আকাশের মেজাজ হঠাৎ করেই পাল্টে গেল। ঝমঝম করে শুরু হলো বৃষ্টি। ক্যাম্প করে থাকার সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। এমন সময় হঠাৎ চোখে পড়ল এক জুমঘর। ভাগ্যক্রমে ১২ জনের আরেকটি দল আমাদের আগেই সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল।
অপরিচিত মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সেই মুহূর্তটি ছিল ভ্রমণের সেরা প্রাপ্তি। ১২ জন অপরিচিত মানুষ নিমেষেই আমাদের বন্ধু হয়ে গেল। গানের আসর, হাসি-ঠাট্টা আর গল্পের মধ্য দিয়ে রাতটা যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। বাইরে যখন মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছিল, আমরা তখন উষ্ণ হাসিতে আর বন্ধুত্বে নিজেদের আবিষ্কার করছিলাম। সেই রাতে আমরা পাহাড়ের কোলে বসে থাকা মেঘগুলোকে আরও কাছ থেকে অনুভব করেছিলাম। চাঁদের আলোয় পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে জমে থাকা মেঘগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যেন এক রুপালি নদী বয়ে চলেছে। আমরা ছিলাম সেই নদীর অনেক ওপরে–একাকী, তবে এক অসাধারণ অনুভূতির সঙ্গে। এই দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল যেন জীবনানন্দ দাশের কবিতার এ লাইনগুলো বাস্তবে ধরা দিয়েছে:
‘পাহাড়ের বুক চিরে
মেঘেরা যেথা ছোটে,
মনে হয় যেন এক নদী
আকাশে খেলা করে।’
পরদিন সকালে মেঘের চাদর ভেদ করে সূর্যের প্রথম কিরণ যখন আমাদের চোখে পড়ল, সেই দৃশ্য ছিল কোনো কবির কল্পনার মতো। বৃষ্টি-ধোয়া পাহাড় আরও সতেজ, সবুজ হয়ে উঠেছিল।
মারায়নতংয়ের চূড়ায় সেই রাতটি শুধু একটি ভ্রমণ ছিল না, ছিল জীবনের এক অনন্য পাঠ। পথ যত কঠিনই হোক না কেন, জীবনের বন্ধুর পথচলা শেষে যে অপার সৌন্দর্য অপেক্ষা করে, তা আমরা সেদিন অনুধাবন করেছিলাম। প্রতিটি ঘাম ঝরানো পদক্ষেপ, প্রতিটি ক্লান্তি, সবকিছুই যেন সার্থক হয়ে উঠেছিল পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দিগন্তজোড়া মেঘ আর তারাদের রাজ্যে। সেই মুহূর্তগুলো আমাদের শিখিয়েছে, সত্যিকারের আনন্দ লুকিয়ে থাকে সংগ্রামের মধ্যে। সেই সংগ্রামই শেষ পর্যন্ত আমাদের এক অনিন্দ্য সুন্দর গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।
সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল সেই জুমঘরে অপ্রত্যাশিত বন্ধুত্ব; যেখানে আমরা ৯ বন্ধু গিয়েছিলাম এক নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে, সেখানে আরও ১২ জন অপরিচিত মানুষের উষ্ণতা আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। রাতভর গান, হাসি আর গল্পে ভুলে গিয়েছিলাম আমরা একে অপরের অচেনা। এক লহমায় আমরা হয়ে উঠেছিলাম এক বড় পরিবার। সেই রাত আমাদের শিখিয়েছে, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো সাধারণত অপ্রত্যাশিতভাবেই আসে। বন্ধুত্ব–তা কেবল পরিচিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে, কিছু বিশেষ মানুষের সঙ্গে এক লহমায় গড়ে ওঠে যে বন্ধন, তা জীবনের সেরা উপহার। সেই রাতে পাহাড়ের কোলে বসে থাকা মেঘের মতোই যেন আমাদের হৃদয়গুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল এক নতুন নদীর জন্ম দিয়ে। v
ছবি: লেখক
- বিষয় :
- মেঘ
