রান্নাঘরে লুকিয়ে বিপদ
শৈলী ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, খাদ্যবাহিত অসুস্থতা আসে অস্বাস্থ্যকর রাস্তার খাবার বা মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার থেকে। গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের অসুস্থতার আসল কারণ লুকিয়ে থাকে রান্নাঘরের ভেতরেই।
গবেষণার জন্য সম্প্রতি ১০০টি পরিবারের রান্নাঘরের জিনিসপত্রে অণুজীবের উপস্থিতির পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, ৯০ শতাংশেরও বেশি থালাবাসন ধোয়ার স্পঞ্জ এবং ৮১ শতাংশ বার সাবানের পাত্র ই. কোলাই এবং কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত। শুধু তাই নয়, কাটিং বোর্ড, ছুরি, রেফ্রিজারেটরের হাতল এমনকি চুলার নবেও ছিল বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া। কিছু ক্ষেত্রে বিষয়টি টয়লেটের দরজার হাতলে থাকা জীবাণুর মতোই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
এটি শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়। বিশ্বব্যাপী গবেষণায় একই ধরনের ফলাফল পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৮৯ শতাংশ রান্নাঘরের তোয়ালেতে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া থাকে এবং ২৫ শতাংশ ই. কোলাই পজিটিভ। সিঙ্ক, স্পঞ্জ এবং থালাবাসন মোছার কাপড় ভেজা অবস্থায় রেখে দিলে সেগুলো সালমোনেলা এবং লিস্টেরিয়া ব্যাকটেরিয়ার জন্য উপযুক্ত প্রজনন ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বেশির ভাগ অণুজীববিজ্ঞানী জোর দিয়ে বলেন, সতর্কতার সঙ্গে হাত ধোয়া, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, রান্নার স্থান জীবাণুমুক্ত করা এবং কাঁচা মাংস ধুয়ে না ফেলার মতো সহজ পরিবর্তনগুলো এই ঝুঁকি অনেক কমাতে পারে।
ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ভেজা সাবানের ধারকগুলোয় লেগে থাকা খাবারের অবশিষ্টাংশ বার সাবানে ব্যাকটেরিয়ার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়। একই বার সাবান একাধিক জিনিসের জন্য ব্যবহার করলে ক্রস-দূষণ হতে পারে। সেই সঙ্গে প্লেট ও বাসনপত্রে লেগে থাকা সাবানের অবশিষ্টাংশ আরও জীবাণু ও রাসায়নিক ঝুঁকি তৈরি করে।
বিপদ শুধু থালাবাসন আর স্পঞ্জের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় কাঁচাবাজার থেকে কেনা শাকসবজি, মাছ এবং মাংসে প্রায়ই কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু এবং ব্যাকটেরিয়ার দূষণ থাকে। বাড়িতে সঠিকভাবে পরিষ্কার না করলে এই ক্ষতিকর উপাদানগুলো সরাসরি আমাদের খাবারের প্লেটে চলে আসে, যা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড মাইক্রোবায়োলজি এবং খাদ্যনিরাপত্তা গবেষক ড. লতিফুল বারী বলেন, ‘বাংলাদেশে সবজিতে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। তবুও বেশির ভাগ গবেষণা কেবল কীটনাশক বা রাসায়নিকের ওপরই মনোনিবেশ করে। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, শাকসবজি, রান্নাঘর, স্পঞ্জ এবং থালাবাসন ধোয়ার সরঞ্জামগুলোয় থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াও সমানভাবে বিপজ্জনক।’
গবেষণার ফল অনুযায়ী, রান্নাঘর আমাদের শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। তবে এ থেকে প্রতিকার পাওয়া যায় সহজেই। এ জন্য নিরাপদ কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। এর মধ্যে ঘন ঘন স্পঞ্জ পরিবর্তন, বার সাবান থেকে তরল ডিশ ওয়াশে সুইচ করা, রান্নার স্থান শুকনো রাখা, রেফ্রিজারেটর এবং বাসনপত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা উল্লেখযোগ্য। এর পাশাপাশি সুস্থ থাকতে খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
মনে রাখবেন, রান্নাঘরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আজকের কিছু ছোট পরিবর্তন, আগামীকাল অনেক পরিবারকে প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে।
- বিষয় :
- রান্না
