উষ্ণতায় সঙ্গী শাল
শীতের ফ্যাশনে অনেক বৈচিত্র্য এলেও শালের কদর একই রকম রয়েছে ছবি সৌজন্য: রঙ বাংলাদেশ
রোজী আরেফিন
প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
এ বছর শীতের ট্রেন্ডে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন এসেছে শালের ডিজাইন, রং এবং ফেব্রিকে। এখন মানুষ অতিরিক্ত ঝলমলে বা বড়সড় ডিজাইনের চেয়ে বেশি পছন্দ করছে সিম্পল, পরিমিত এবং আরামদায়ক স্টাইল
শীত এলেই আমাদের দৈনন্দিন জীবন কিছুটা বদলে যায়। সকালে ঘুম থেকে ওঠা, অফিসে বা বাইরে যাওয়া–সব জায়গায় ঠান্ডা স্পর্শ অনুভূত হয়। তাই পোশাক-আশাকেও আসে পরিবর্তন। এ সময় বাঙালির পোশাকে যে অনুষঙ্গটি সবচেয়ে সহজে চোখে পড়ে, তা হলো শাল। উষ্ণতার প্রয়োজন থেকে শুরু করে ফ্যাশনের নান্দনিকতা–সব কিছুকেই একসঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে শাল। কখনও এটি মায়ের মমতার প্রতীক, কখনও প্রিয় মানুষের যত্ন, কখনও আবার স্টাইল স্টেটমেন্ট। যুগ বদলালেও শালের জনপ্রিয়তা একই রকম আছে।
চলতি শীতের ট্রেন্ড
প্রতিবছর সব ধরনের পোশাকেই নতুন কিছু যুক্ত হয়। এ বছর শীতের ট্রেন্ডে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন এসেছে শালের ডিজাইন, রং এবং ফেব্রিকে। এখন মানুষ অতিরিক্ত ঝলমলে বা বড়সড় ডিজাইনের চেয়ে বেশি পছন্দ করছে সিম্পল, পরিমিত এবং আরামদায়ক স্টাইল। নিউট্রাল রং যেমন–গ্রে, বেজ, কফি, নেভি অনেক বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে। কারণ, এ রংগুলো প্রায় সব ধরনের পোশাকের সঙ্গে সহজে মিলিয়ে নেওয়া যায়। পাশাপাশি ওভারসাইজ শাল, হালকা উলের প্রাকৃতিক রঙের শাল এবং স্টাইলিশ প্যাটার্নযুক্ত শাল তরুণদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। আরেকটি বড় ট্রেন্ড হলো সাসটেইনেবল ফেব্রিক, অর্থাৎ এমন উপকরণ দিয়ে তৈরি শাল, যেগুলো পরিবেশবান্ধব। মানুষ এখন শুধু স্টাইল নয়, আরাম ও সাশ্রয়ী দিক বিবেচনা করেও শাল বেছে নিচ্ছে।
ছেলেদের শালের ট্রেন্ডে এ বছর কিছু বিশেষ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগের মতো প্রচুর ডিজাইন বা ভারী কাজ নয়, বরং এখন ছেলেরা বেশি পছন্দ করছে সলিড রং বা মিনিমাল প্যাটার্ন। ব্ল্যাক, গ্রে, ক্যামেল, ডার্ক কফি বা নেভি–এ রংগুলোই সবচেয়ে জনপ্রিয়। কারণ এগুলো জ্যাকেট, সোয়েটার, ব্লেজার অথবা কোট সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে যায়। স্ট্রাইপ বা বড় চেক প্যাটার্নও এখন ছেলেদের মধ্যে নতুনভাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
ফেব্রিকেও ছেলেদের পছন্দে এসেছে বৈচিত্র্য। হালকা উল, কটন-উল ব্লেন্ড কিংবা ক্যাশমিয়ারের মতো নরম শাল অফিস বা বাইরে চলাফেরায় খুব ভালো মানায়। অনেকেই ওভারলং বা খানিকটা মোটা শাল ব্যবহার করছে। কারণ এগুলো দেখতে স্মার্ট এবং শীতও বেশি ধরে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছেলেরা এখন শালকে শুধু শীতবস্ত্র নয়, বরং নিজেদের স্টাইল স্টেটমেন্টের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে।
মেয়েদের শালের সংগ্রহ সবসময়ই বৈচিত্র্যময় আর এই শীতেও তার ব্যতিক্রম নয়। মেয়েদের শালে এখন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে সফট প্যাস্টেল টোন, হালকা এমব্রয়ডারি, কাশ্মীরী-স্টাইল প্রিন্ট ও বড় সাইজের ওভারশাল। বিশেষ করে উৎসব বা পার্টির লুকে সূক্ষ্ম কাজ করা শাল দারুণ মানিয়ে যায়। ক্যাজুয়াল বা অফিসে ব্যবহারের জন্য হালকা উল বা কটন-উল ব্লেন্ড শাল মেয়েরা বেশি পছন্দ করছে।
এ ছাড়া জুট-মিক্স বা হ্যান্ডক্রাফট শালের চাহিদাও বেড়েছে। কারণ এগুলো দেখতে নরম এবং আরামদায়ক, পাশাপাশি সহজেই যে কোনো পোশাকের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়। মেয়েরা এখন পোশাকের রং ও স্টাইল মিলিয়ে শাল বেছে নেয়। ফলে পুরো লুকটিতে এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি হয়। ওভারসাইজ শাল, কাঁধে জড়িয়ে রাখা লং শাল বা সামনে বাঁধা স্টাইল–সব মিলিয়ে মেয়েদের শালের ব্যবহার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ট্রেন্ডি, বাস্তবসম্মত এবং স্টাইলিশ।
এ বছরের শালের আয়োজন নিয়ে রঙ বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী সৌমিক দাস জানান, শীতে তাদের প্রতিষ্ঠান ভেজিটেবল থিমে শাল উপস্থাপন করেছে। কটন-ভিসকজ কাপড়ে তৈরি শালে শীতের সবজি যেমন–বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, গাজর, শিম, মটরশুঁটি, পেঁয়াজকলি ইত্যাদি নকশায় ধরা হয়েছে। দুই পাশে ব্যবহারযোগ্য শাল, আঁচলের কাজ করা শাল, পঞ্চো ও কটিও রয়েছে। তাঁর মতে, শালের এসব ব্যতিক্রমী সম্ভার সমসাময়িক রুচি, আরাম ও ঐতিহ্যের সুন্দর সমন্বয় দেখায়।
শীতের উপযোগী শাল
শাল বেছে নেওয়ার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর ফেব্রিক ও ডিজাইন। ফেব্রিক ঠিক করে দেয় শাল কতটা গরম রাখবে, কতটা নরম হবে এবং কতদিন ব্যবহার উপযোগী থাকবে। শীতের তীব্রতা অনুযায়ী ফেব্রিক নির্বাচন করা জরুরি। বেশি ঠান্ডায় মোটা উলের শাল সর্বোত্তম। কারণ এগুলো তাপ ধরে রাখে এবং শরীরকে আরামদায়কভাবে উষ্ণ রাখে। অফিস বা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য হালকা উল বা কটন উল ব্লেন্ড শাল খুব ভালো। কারণ এগুলো সহজে পোশাকের সঙ্গে মানিয়ে যায় এবং পরতে আরাম হয়। কাশ্মীরী বা প্যাশমিনা স্টাইল শাল নরম, হালকা এবং প্রিমিয়াম লুক দেয়, যা দীর্ঘসময় ব্যবহারের পরও বিরক্তিকর মনে হয় না।
কোন শালের সঙ্গে কোন পোশাক
শালের ডিজাইন ও ফেব্রিক যদি আপনার পোশাকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে পুরো লুকটাই হয়ে যাবে দুর্দান্ত। সাধারণ বা সলিড রঙের শাল সব ধরনের পোশাকের সঙ্গেই মানানসই। যদি আপনার পোশাক রং বা ডিজাইনে একটু ভারী হয়, তখন নিউট্রাল বা হালকা রঙের শাল বেছে নিন, এতে পুরো সাজটাতে একটা ভারসাম্য থাকবে।
ফেস্টিভ অনুষ্ঠান বা পার্টির জন্য যখন গেটআপ হয়, তখন প্রিন্টেড, এমব্রয়ডারি বা কাশ্মীরী প্যাটার্নের শাল খুব উপযোগী। এমন শালের সঙ্গে সালোয়ার-কুর্তা, লং ড্রেস বা কোনো পার্টি ড্রেস থাকলে পুরো লুককেই বিশেষ করে তুলবে। অফিস বা ক্যাজুয়ালে হালকা কটন-উল ব্লেন্ড কিংবা সিম্পল শালগুলো বেশ ভালো মানাবে।
ছেলেরা ব্লেজার, সোয়েটার বা জ্যাকেটের সঙ্গে সলিড বা চেকড শাল ব্যবহার করলে ভালো দেখাবে। ওভারসাইজড শাল বা নরম প্যাশমিনা-স্টাইল শাল পরলে মেয়েদের স্মার্ট এবং রুচিশীল লাগবে।
শাল কেনার কিছু টিপস
শাল কেনার আগে হাত দিয়ে শালের ফেব্রিক ও শালের ওজন দেখে নিন।
যদি বাইরে বেশি চলাফেরা করা লাগে, হালকা কিন্তু গরম রাখার শাল নিন। যেমন কটন-উল বা প্যাশমিনা।
রঙিন পোশাকের সঙ্গে সলিড শাল, সাদামাটা পোশাকের সঙ্গে প্রিন্টেড বা প্যাটার্ন শাল মানাবে।
দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সাশ্রয়ী আর উৎসব বা ফ্যাশনের জন্য প্রিমিয়াম শাল নিন।
দরদাম
শালের দামও বৈচিত্র্যময়, যা ফেব্রিক, ডিজাইন, ব্র্যান্ড এবং কাজের মানের ওপর নির্ভর করে। সাধারণ অ্যাক্রিলিক বা স্থানীয় উল শাল ৪০০-৮০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়, যা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সাশ্রয়ী। উন্নত ফেব্রিক বা ব্র্যান্ডেড শাল ৯০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। প্রিমিয়াম বা হ্যান্ডক্রাফট, কাশ্মীরী শাল হলে দাম এক হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার টাকার ওপর যেতে পারে। তাই নিজের বাজেট, ব্যবহার ও শৈলীর সঙ্গে মিলিয়ে শাল বাছাই করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কোথায় পাবেন
ফ্যাশন ব্র্যান্ড আড়ং, অঞ্জন’স, সেইলর, বিশ্বরঙ, রঙ বাংলাদেশ, সাদাকালো, লা রিভে ভালো মানের এবং বিভিন্ন ডিজাইনের শাল পাওয়া যাচ্ছে। অনলাইনেও এখন দারাজ, পিকাবু বা বিভিন্ন ফেসবুক বুটিকে বৈচিত্র্যময় শালের সংগ্রহ পাওয়া যায়। যারা সাশ্রয়ী দামে শাল চান, তারা স্থানীয় বাজার যেমন নিউমার্কেট, গাউছিয়া, বায়তুল মোকাররম বা চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার ঘুরে দেখতে পারেন। এখানে হ্যান্ডমেইড এবং ভালো মানের শালও পাওয়া যায়।
- বিষয় :
- শীতের পোশাক
