ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

যোগব্যায়ামে ঝরঝরে

যোগব্যায়ামে ঝরঝরে
×

নিয়মিত যোগব্যায়ামে শরীর ও মন দুই-ই সুস্থ থাকে মডেল: বৃতি দেব (ইয়োগা প্রশিক্ষক); ছবি: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য

রিক্তা রিচি

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত যোগাসন করেন। মালাইকা অরোরা, শিল্পা শেঠি ফিটনেস ও নমনীয় শরীরের জন্য বেছে নেন যোগব্যায়াম। শিল্পা শেঠি এ নিয়ে বইও লিখেছেন। হলিউডের জেনিফার অ্যানিস্টন, ব্রিটিশ ফুটবলার স্যার ডেভিড বেকহামসহ অনেকেই যোগে মনোযোগী। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশের সোহানা সাবা, নুসরাত ফারিয়ারাও। মূলত শরীর ও মনের সুস্থতায় যোগাসন জরুরি। এক্স, মিলেনিয়াল জেনারেশনের পাশাপাশি জেনজিদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যোগব্যায়াম। ঘরেই শুধু নয়, উন্মুক্ত স্থানে, সবুজের সান্নিধ্যে যোগব্যায়ামের চিত্র হরহামেশাই সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায়। এটি এক ধরনের ট্রেন্ড। 

যোগাসন কেন জরুরি?
ইয়োগা উইথ দেবের প্রশিক্ষক বৃতি দেব জানান, যোগাসন বা যোগব্যায়াম মূলত আমাদের শরীরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার ওপর সরাসরি কাজ করে। যেমন পেশি ও অস্থিসংক্রান্ত ব্যবস্থা (মাসকুলোস্কেলেটাল সিস্টেম) এবং স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্র (অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেম)।
নিয়মিত যোগব্যায়াম করলে মাংসপেশির নমনীয়তা ও জয়েন্টের নড়াচড়া করার ক্ষমতা বাড়ে। শরীরের ভঙ্গিমাজনিত সমস্যা বা পোস্টারাল ইমব্যালান্স কমে এবং রক্ত সঞ্চালন উন্নত হয়। দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা ও পেশির শক্তভাব কমাতে যোগব্যায়াম বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর। অন্যদিকে, যোগব্যায়ামের শ্বাস-প্রশ্বাসভিত্তিক অনুশীলন শরীরের ভেগাস নার্ভকে সক্রিয় করে। এতে স্ট্রেস হরমোন (কর্টিসল) কমে। মন স্থির হয়, স্নায়ু শান্ত থাকে এবং ঘুমের মান উন্নত হয়।

যোগের যাত্রা
যোগব্যায়াম শুরু প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে– ভারতে। প্রাচীন ঋষি-মুনিরা প্রথম যোগব্যায়াম চর্চা করতেন। পরে এটি বেদ, উপনিষদ ও পতঞ্জলির যোগসূত্রে লিপিবদ্ধ হয়। ধীরে ধীরে ভারত থেকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে যোগব্যায়াম। 

ওজন কমাতে যোগব্যায়াম 
অনেকেই মনে করেন, যোগ মানে শুধু শান্তভাবে বসে শ্বাস নেওয়া। আসলে বিষয়টি তা নয় বলে জানান বৃতি দেব। নিয়মিত সূর্য নমস্কার, ভিনিয়াসা বা পাওয়ার ইয়োগার মতো যোগব্যায়ামগুলো করলে শক্তি বাড়ে, হৃদযন্ত্র সক্রিয় থাকে। যোগের ফলে শরীর টোনড হয় এবং বিপাকক্রিয়া বাড়ে বলেও জানান বৃতি। 
সুনির্দিষ্ট যোগাসনে ক্যালরি বার্ন হয়। ক্যালরি বার্ন হলে ওজন কমে। যোগব্যায়াম স্ট্রেসও কমায়। শরীরে স্ট্রেস বেশি থাকলে কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায়; যা পেটের মেদ বাড়াতে সহায়ক। যোগব্যায়াম এই হরমোন কমাতে কার্যকর। ফলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং পেটের চর্বি কমাতে সুবিধা হয়।
যোগ তিনভাবে ওজন কমাতে সাহায্য করে। যেমন শরীরকে নড়াচড়া করিয়ে ক্যালরি বার্ন করে পাওয়ার ইয়োগা। পেশি কাজে লাগিয়ে মেটাবলিজম বাড়ায় স্ট্রেংথ বেইজ ইয়োগা–প্লাঙ্ক পোজ, চতুরঙ্গ, উৎকটাসন বা চেয়ার পোজ, নৌকাসন বা বোট পোজ, ওয়ারিয়র সিরিজ অর্থাৎ বীরভদ্রাসন। স্ট্রেস কমিয়ে পেটের চর্বি কমতে সাহায্য করে ডিপ ব্রিদিং, মাইন্ডফুল ইয়োগা। ফ্যাট বার্নিং যোগাসনগুলো হলো সূর্য নমস্কার, ভুজঙ্গাসন, ধনুরাসন, উত্তানপাদাসন, পশ্চিমোত্তানাসন। স্ট্রেস কমিয়ে ওজন কমাতে সহায়ক আসনগুলো হলো শবাসন, প্রাণায়াম বিশেষ করে অনুলোম বিলোম, ভ্রমরী, ডিপ ব্রিদিং বা গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস, কপালভাতি। 

ফুসফুস ভালো রাখতে 
ভুজঙ্গাসন (কোবরা পোজ): পেটের ওপর শুয়ে পড়ুন। হাত দুটি কাঁধের নিচে রাখুন। শ্বাস নিতে নিতে ধীরে ধীরে বুকে ভর দিয়ে শরীর তুলুন। কাঁধ নিচে রাখুন, গলা লম্বা রাখুন। ১৫-২০ সেকেন্ড ধরে রাখতে পারেন। এ ইয়োগা বুকের খাঁচা খুলে দেয়। এটি করলে ফুসফুসে বেশি বাতাস ঢোকে এবং এটি ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ায়। 
তাড়াসন: দুই পা একসঙ্গে, হাত দুই পাশে নামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ান। গভীর শ্বাস নিয়ে হাত মাথার ওপর তুলুন। লম্বা হয়ে ১০-১৫ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে শ্বাস নিন। এ যোগ ফুসফুস পুরোপুরি প্রসারিত করতে সাহায্য করে ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। 
মৎস্যাসন (ফিশ পোজ): পা ছড়িয়ে বা পদ্মাসনে পিঠের ওপর শুয়ে পড়ুন। বুকে ভর দিয়ে শরীর তুলে গলা পেছনে নিন। বুক ফুলিয়ে গভীর শ্বাস নিন। শ্বাস ১৫-৩০ সেকেন্ড ধরে রাখুন। এ যোগাসনে বুকের অংশ পুরো খুলে যায়, গভীর শ্বাস নেওয়া সহজ হয়। 
ধনুরাসন (বো পোজ): পেটের ওপর শুয়ে পা দুটো ভাঁজ করুন। হাতে পায়ের গোড়ালি ধরুন। শ্বাস নিয়ে বুক ও পা দুটো ওপরে তুলুন। শরীর ধনুকের মতো আকৃতি নেবে। ১০-১৫ সেকেন্ড রাখুন। এটি করলে ডায়াফ্রাম ও ফুসফুসে জায়গা তৈরি হয়। 
উষ্ট্রাসন (ক্যামেল পোজ): হাঁটু গেড়ে দাঁড়ান। পেছনে ঝুঁকে দুই হাতে দুই গোড়ালি ধরুন। বুক সামনে ঠেলে দিন। গভীর শ্বাস নিন। ১০-২০ সেকেন্ড ধরে রাখুন।

প্রাণায়াম 
অনুলোম-বিলোম: সোজা হয়ে বসুন। ডান নাক বন্ধ করে বাম নাক দিয়ে শ্বাস নিন। এরপর বাম বন্ধ করে ডান দিয়ে ছাড়ুন। আবার ডান দিয়ে নিন, বাম দিয়ে ছাড়ুন। ৫-৭ মিনিট করুন। এটি করলে ফুসফুস সমানভাবে কাজে লাগে, শ্বাসনালি পরিষ্কার হয়। 
ডায়াফ্রামেটিক ব্রিদিং বা ডিপ ব্রিদিং: সোজা হয়ে বসুন বা শুয়ে পড়ুন। এক হাত বুকে, আরেক হাত পেটে রাখুন। শ্বাস নিতে নিতে শুধু পেট ফোলান। ধীরে ছাড়ুন। এটি ১০-১৫ বার করুন। 

ঘাড়ের ব্যথা প্রতিরোধে 
নেক স্ট্রেচ–মাথা ধীরে ডান, বাম, সামনে ও পেছনে কাত করুন। মার্জারি আসন বা ক্যাট কাউ আসন–পিঠ নিচে ও ওপরে নড়াচড়া। ভুজঙ্গাসন–বুক তুলে রাখা। চাইল্ড পোজ বা শিশুসন–বিশ্রাম ভঙ্গি। সেতুবন্ধাসন–কোমর তুলে ব্রিজের মতো ভঙ্গি। এ যোগাসনগুলোয় ঘাড়ের পেশি শিথিল হয়, রক্ত সঞ্চালন বাড়ে। 

মানসিক শান্তির জন্য 
মনের বিক্ষিপ্ততা দূর করে এবং মনের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করে কিছু আসন। যেমন চাইল্ড পোজ বা শিশুসন, সুপ্ত বদ্ধ কোনাসন বা বাটারফ্লাই পোজ, মার্জারি আসন ইত্যাদি। 

চুল পড়া কমাতে 
অধোমুখ শ্বানাসন: চার হাত-পা ভর দিয়ে দাঁড়ান। নিতম্ব ওপরে তুলুন, মাথা নিচে রাখুন। পিঠ সোজা রেখে ২০-৩০ সেকেন্ড শ্বাস নিন। এটি মাথায় রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়। এ যোগের ফলে চুলের গোড়া শক্ত হয়। 
পাদহস্তাসন: দাঁড়িয়ে সামনে ঝুঁকে মাথা নিচে নামান। হাত দিয়ে পা ধরার চেষ্টা করুন। হাঁটু নরম রাখুন। ২০-৩০ সেকেন্ড গভীর শ্বাস নিন। এটি স্কাল্পে অক্সিজেন প্রবাহ বাড়ায়। 
সিংহাসন: হাঁটু গেড়ে বসে সামনে তাকাতে হবে। মুখ বড় করে খুলুন, জিভ পুরো বের করে ‘হাআ’ শব্দে শ্বাস ছাড়ুন। ৮-১০ বার এমন করুন। এ পোজ স্কাল্পে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং ফেসিয়াল+স্কাল্প নার্ভ রিল্যাক্স করে। 
বজ্রাসন: খাবার খাওয়ার পর এই ভঙ্গিতে বসে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস অনুশীলন করুন। ২-৩ মিনিট এ পোজে থাকুন। এতে হজমের উন্নতি ঘটে, পুষ্টি শোষণ বাড়ে–একইসঙ্গে চুলের গোড়াও মজবুত হয়। 

যোগে যেসব ভুল নয়
lপ্রশিক্ষকের পরামর্শ ছাড়া নিজের মর্জিমতো যোগাসন করা ঠিক নয়। কেননা সব ধরনের আসন সবার জন্য নয়। দেহভেদে আসনগুলো ভিন্ন হয়। এছাড়া অনুশীলন ছাড়া কঠিন পোজ দিলে ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে।
lঅনেকে শরীর ওয়ার্ম আপ না করেই যোগাসন শুরু করেন। এটি ঠিক নয়। হালকা ব্যায়াম ও ওয়ার্ম আপ করে শরীরকে আসনগুলোর জন্য তৈরি করে নিতে হবে।
lখাবার খাওয়ার পরপরই যোগাসনে বসে যাবেন না। খাওয়ার ৩০ মিনিট আগে ও পরে অনুশীলন করতে পারেন।
lখুব আঁটোসাঁটো পোশাক ও জুতা পরে যোগচর্চা করবেন না। এতে পাঁজর ও ফুসফুসের সঞ্চালন সীমাবদ্ধ হয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

আরও পড়ুন

×