মুক্তা-পাথরের গহনায়
পোশাকের সঙ্গে মানানসই গহনা চেহারায় ফুটিয়ে তোলে অন্যরকম সৌন্দর্য
তাসলিমা তামান্না
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
আভিজাত্য আর স্নিগ্ধতার জন্য মুক্তার গহনা সবসময়ই সমাদৃত। সাজে সৌন্দর্য বাড়াতে পাথরের গহনার রয়েছে অন্যরকম আবেদন। হাল ফ্যাশনে মুক্ত-পাথরের গহনার ধারা নিয়ে লিখেছেন তাসলিমা তামান্না
শাড়ির সঙ্গে একটি সুন্দর গলার মালা না পরলে সাজটাই যেন থেকে যায় অসম্পূর্ণ। আবার আধুনিক সাজপোশাকের সঙ্গে বা সাধারণ সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে ছোট একজোড়া কানের দুল, হাতে একটি ব্রেসলেট সাজে আনে ভিন্নতা। একসময় বিয়ে বা যে কোনো অনুষ্ঠানে অভিজাত পরিবারের নারীর কানে দেখা যেত কানপাশা, বড় ঝুমকা, হাতে মোটা বালা, গলায় জড়োয়া নেকলেস, সীতাহার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণের গহনার পরিবর্তে নারীরা বেছে নিয়েছেন পাথর, মুক্তা, পুঁতি দিয়ে তৈরি গহনা। স্বর্ণের দাম যে হারে বাড়ছে তাতে বিয়ে কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্যও গহনাপ্রেমীরা ঝুঁকছেন বিকল্প অলংকারের দিকে।
ফ্যাশনের ট্রেন্ড বদলায় প্রতিনিয়ত। কখনও বড় আকারের স্টেটমেন্ট জুয়েলারি, কখনও আবার একেবারে মিনিমাল সাজ। তবে কিছু অলংকার আছে, যেগুলোর আবেদন একইরকম থাকে। মুক্তা কিংবা পাথরের গহনা তেমনই। ঐতিহ্য থেকে আধুনিক ফ্যাশন–সবসময়ই এসব গহনা রুচি, ব্যক্তিত্ব আর আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে থেকেছে।
নারীর সাজগোজে আভিজাত্য প্রকাশে মুক্তার গহনা ব্যবহারের প্রচলন এ উপমহাদেশে অনেক পুরোনো। একসময় মুক্তার মালা ছিল অভিজাত নারীর অলংকার। প্রাকৃতিক পাথরও ব্যবহৃত হতো রাজপরিবারের গহনায়। সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্য বদলে এসেছে আধুনিক নকশা। কানে ছোট একটা মুক্তার দুল, আঙুলে পাথরখচিত আংটি কিংবা গলায় সরু একটি মুক্তা বা পাথরের নেকলেসও হয়ে উঠতে পারে দৈনন্দিন সাজের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ।
নকশায় নতুনত্ব
একসময় মুক্তার গহনা মানেই ছিল বিশেষ অনুষ্ঠান কিংবা অভিজাত নারীর অলংকার। এখন সেই ধারণা বদলেছে। অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়, উৎসব কিংবা পারিবারিক আয়োজনে–সব জায়গাতেই মুক্তা ও পাথরের গহনা হয়ে উঠেছে রুচিশীল নারীর পছন্দ। কারণ এ গহনাগুলো চাকচিক্যের বদলে ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরে।
বর্তমান সময়ে মুক্তা আর পাথরের গহনায় মিনিমাল ডিজাইন বা ন্যূনতম নকশার প্রভাব বেশি। ছোট ছোট কালচার্ড মুক্তা দিয়ে তৈরি চোকার, লেয়ারড নেকলেস, ড্রপ ইয়াররিং, পাথরখচিত ব্রেসলেট কিংবা আংটি সব বয়সী নারীর কাছে বেশ জনপ্রিয়। অন্যদিকে উৎসব কিংবা বিয়ের আয়োজনে কয়েক স্তরের মুক্তার হার কিংবা পাথর বসানো স্টেটমেন্ট গহনাও আলাদাভাবে চোখে পড়ছে।
দেশীয় গহনা নির্মাতারা ফিউশনধর্মী গহনা তৈরিতে এখন বেশি মনোযোগী। ব্রাস, রুপা, অক্সিডাইজড মেটাল কিংবা গোল্ড প্লেটেড ধাতুর সঙ্গে মুক্তা ও নানা রঙের পাথরের সমন্বয়ে নতুন নতুন ডিজাইন তৈরি করছেন। এতে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সুন্দর মেলবন্ধন তৈরি হচ্ছে।
গহনা উদ্যোক্তারা বলছেন, আগের তুলনায় এখন ক্রেতারা এমন গহনা খুঁজছেন, যা একাধিক পোশাকের সঙ্গে ব্যবহার করা যায়। মুক্তা ও প্রাকৃতিক পাথরের গহনার চাহিদা সে কারণেই বাড়ছে। নারীরা এখন হালকা, হাতে তৈরি এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় এমন গহনাই বেশি পছন্দ করছেন। তারা জানান, বর্তমানে কালচার্ড মুক্তা, ফ্রেশওয়াটার পার্ল, টারকয়েজ, অ্যামেথিস্ট, রোজ কোয়ার্টজ ও আগেট পাথরের গহনার চাহিদা বেশি।
এ ব্যাপারে অনলাইন শপ পার্লোর স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার আরত্ত অরণ্য বলেন, বর্তমান সময়ে মুক্তার গহনার চাহিদা বাড়ার অন্যতম কারণ যোগাযোগ প্রযুক্তি। সবাই বিভিন্ন ধরনের রিলস দেখছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, বড় তারকারাও খুব সাধারণ সাজের গহনা ব্যবহার করছেন। সারা পৃথিবীতেই এখন সাজপোশাকের ক্ষেত্রে মিনিমাল লুক প্রাধান্য পাচ্ছে। মুক্তার তৈরি গহনাগুলো দেখতে সাধারণ হলেও সব ধরনের পোশাকের সঙ্গে বেশ মানিয়ে যায়। চেহারাতেও একটা ক্লাসি লুক দেয়। তিনি আরও বলেন, একসময় অনেকেই মনে করতেন মুক্তার গহনা মানেই খুব দামি। আসলে তা নয়। চীন, জাপান এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে এখন দেশেই স্বল্প দামে বাহারি ডিজাইনের মুক্তার গহনা বিক্রি করা হয়। তিনি জানান, ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজ করেও তারা মুক্তার গহনা তৈরি করেন। এ ছাড়া ক্রেতার চাহিদার কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন পাথরের সঙ্গে মুক্তার সমন্বয় করে প্রতিনিয়ত ফিউশনধর্মী গহনা তৈরি করছেন তারা। তিনি আরও জানান, বর্তমানে সিঙ্গেল লেয়ার, ডাবল লেয়ারের মুক্তার নেকলেস ভালো চলছে। মুক্তার তৈরি কানের দুল, ফিঙ্গার রিং, ব্রেসলেট, চুড়িরও যথেষ্ট চাহিদা র য়েছে।
‘রঙ বাংলাদেশ’-এর স্বত্বাধিকারী সৌমিক দাস জানান, এখন হালকা ও মিনিমাল ডিজাইনের গহনা বেশ জনপ্রিয়। তাদের সংগ্রহে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পাথর ও মুক্তার গহনা। বর্তমানে সিঙ্গেল ও মাল্টি-লেয়ার পার্ল সেট, ডাবল ও ট্রিপল স্ট্র্যান্ড মুক্তার মালা ভালো চলছে। রঙিন পাথরের সেট, প্রাকৃতিক পাথরের লুকের বিডস সেট, স্টেটমেন্ট নেকলেস, অক্সিডাইজড ফিনিশের পাথরের জুয়েলারি, ফিউশন ডিজাইনের নেকলেস-ইয়াররিংয়ের বেশ চাহিদা রয়েছে। তাঁর মতে, সাদা, অফ-হোয়াইট, ধূসর, কালো, সবুজ, নীল, লাল, অ্যাম্বারসহ নানা রঙের পাথর ও মুক্তার সমন্বয়ে তৈরি এসব গহনা শাড়ি, থ্রিপিস, কুর্তি, টপস কিংবা ওয়েস্টার্ন পোশাকের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যায়।
কোন পোশাকে কেমন গহনা
ফ্যাশন স্টাইলিস্টদের মতে, সাদা বা অফ-হোয়াইট মুক্তার দুল জামদানি, মসলিন কিংবা সিল্কের শাড়ির সঙ্গে বেশ মানিয়ে যায়। শাড়ির সঙ্গে মিনিমাল মুক্তা কিংবা ছোট রঙিন পাথরের সেট সাজে আধুনিকতার ছোঁয়া আনে।
লিনেন বা কটন কুর্তির সঙ্গে এক স্তরের মুক্তার নেকলেস, ছোট পেনডেন্ট বা প্রাকৃতিক পাথরের লম্বা মালা ক্যাজুয়াল-চিক স্টাইল তৈরি করে। পশ্চিমা পোশাকের সঙ্গে এক লেয়ার বা দুই-তিন লেয়ারের মুক্তার নেকলেস পরলে সুন্দর দেখায়। মুক্তার গহনা পরলে পোশাকে অতিরিক্ত ভারী কাজ না থাকাই ভালো। বড় স্টেটমেন্ট নেকলেস পরলে কানের দুল ছোট রাখলে স্টাইলিশ দেখায়। পাথরের গহনার রঙের সঙ্গে পোশাকের একটি রং মিলিয়ে নিলে সাজটি সুন্দরভাবে ফুটে উঠবে। দিনের অনুষ্ঠানে ছোট নকশার গহনা আর সন্ধ্যার আয়োজনে কিছুটা বড় ডিজাইনের অলংকার বেছে নিলে সাজ হয়ে ওঠে আরও পরিপূর্ণ।
দামদর
মুক্তা ও পাথরের গহনার দাম সাধারণত নির্ভর করে ব্যবহৃত উপাদান, পাথরের মান, ধাতু এবং কারুকাজের ওপর। বিভিন্ন স্থানে ছোট মুক্তার কানের দুল পাওয়া যায় ১০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায়, মুক্তার নেকলেস এক হাজার ৫০০ থেকে ছয় হাজার, প্রাকৃতিক পাথরের আংটি ৮০০ থেকে তিন হাজার ও পাথরের সেট পাওয়া যাবে ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকায়।
কোথায় পাবেন
দেশীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক নকশার সমন্বয়ে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস এবং জুয়েলারি ব্র্যান্ড নিয়মিত নতুন মুক্তা আর পাথরের গহনার সংগ্রহ নিয়ে আসছে।
লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড আড়ংয়ে কালচার্ড পার্ল, মুক্তা, পাথরের সমন্বয়ে তৈরি নেকলেস, কানের দুল, ব্রেসলেট ও আংটি পাওয়া যাচ্ছে। অঞ্জন’স-এর বিভিন্ন শোরুমেও শাড়ি ও সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে মানানসই মুক্তা ও পাথরের ফ্যাশন জুয়েলারি পাওয়া যায়। এ ছাড়া রঙ বাংলাদেশ, দেশাল, সারা লাইফস্টাইলসহ বিভিন্ন দেশীয় ফ্যাশন হাউস এবং অনলাইনভিত্তিক হাতে তৈরি জুয়েলারি উদ্যোক্তাদের কাছেও বৈচিত্র্যময় গহনা পাওয়া যায়। ঢাকার বেইলি রোড, ধানমন্ডি, বনানী, বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স ও যমুনা ফিউচার পার্কের বিভিন্ন ফ্যাশন আউটলেটে এসব গহনার ভালো সংগ্রহ রয়েছে। পাশাপাশি অনেক উদ্যোক্তা সামাজিক মাধ্যমেও কাস্টমাইজড ডিজাইনের মুক্তা ও পাথরের গহনা তৈরি করছেন।
মডেল: রশ্মি আয়াত; গহনা: রঙ বাংলাদেশ মেকওভার: শোভন’স মেকওভার
ছবি: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য
- বিষয় :
- পোশাক শিল্প