এই সময় শিশুর সুস্থতায়
স্মৃতি চক্রবর্তী
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্ষা প্রকৃতিকে যেমন সজীব ও প্রাণবন্ত করে তোলে, তেমনি বড়দের পাশাপাশি শিশুদের জন্য নিয়ে আসে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি। অতিরিক্ত আর্দ্রতা, জলাবদ্ধতা, দূষিত পানি এবং ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার দ্রুত বিস্তারের কারণে এ সময় শিশুর মধ্যে সর্দি-কাশি, ভাইরাসজনিত জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও বিভিন্ন চর্মরোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকায় তারা সহজেই এসব সংক্রমণের শিকার হতে পারে। তাই বর্ষাকালে শিশুর সুস্থ রাখতে প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা, পরিচ্ছন্নতা, সুষম খাদ্য এবং সময়মতো চিকিৎসা।
ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও বাংলাদেশ শিশু স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হানিফ বলেন, বর্ষাকালে পরিবেশে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দ্রুত বাড়ে। ফলে শিশুর অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। তবে অভিভাবকরা যদি কিছু সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন, তাহলে অধিকাংশ মৌসুমি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। শিশুকে সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, নিরাপদ খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘ সময় ভেজা বা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে না রাখাই এ সময়ের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু ঘেমে যাচ্ছে কিনা, সেদিকেও খেয়াল রাখুন। ঘাম হলে মুছিয়ে দিন। প্রয়োজনে পোশাক বদলে দিন। খাবারের আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নখ ছোট রাখা, খেলনা ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখাও জরুরি।
বর্ষাকালে খাদ্য ও পানির বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ডায়রিয়া, আমাশয় এবং অন্ত্রের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই শিশুকে অবশ্যই ফুটিয়ে ঠান্ডা করা বা নিরাপদ উৎসের বিশুদ্ধ পানি পান করাতে হবে। রাস্তার খোলা খাবার, কাটা ফল কিংবা দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় মাছ, ডিম, দুধ, ডাল, সবুজ শাকসবজি এবং মৌসুমি ফল রাখলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে। পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য তরল খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপও বেড়ে যায়। তাই ঘরের আশপাশে কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ফুলের টব, টায়ার, ড্রাম, বালতি, এসির ট্রে কিংবা ছাদে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। শিশুর ঘুমের সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। দিনের বেলাতেও এডিস মশা কামড়ায়, তাই শিশুকে ফুলহাতা জামা ও লম্বা প্যান্ট পরানো এবং প্রয়োজনীয় মশা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এর পাশাপাশি ধুলাময় স্থান এড়িয়ে চলুন। শিশুকে ছায়াযুক্ত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্থানে রাখুন। ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস আসার ব্যবস্থা রাখুন।
অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হানিফের মতে, শিশুর জ্বর দুদিনের বেশি স্থায়ী হলে, শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে, বারবার বমি বা পাতলা পায়খানা হলে, শরীরে র্যাশ উঠলে, খেতে না চাইলে কিংবা অতিরিক্ত ঝিমুনি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মৌসুমে কোনো জ্বরকেই সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়। একই সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ খাওয়ানো থেকেও বিরত থাকতে হবে।
শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিবারের সবার। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, সুষম পুষ্টি, মশা নিয়ন্ত্রণ এবং অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা–এ কয়েকটি বিষয় মেনে চললেই বর্ষাকালের অধিকাংশ স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
- বিষয় :
- শিশু