ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ব্লক বাটিকে নতুন ধারা

ব্লক বাটিকে নতুন ধারা
×

রিক্তা রিচি

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

কয়েক শতাব্দী ধরে ব্লক-বাটিক প্রিন্টের কাজ চলছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে শিল্পী ও ডিজাইনাররা পোশাকে ব্লক-বাটিকের প্রিন্ট নিয়ে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। প্রাকৃতিক রঙের পাশাপাশি রাসায়নিক রঙের দিকে ঝুঁকেছেন। এখনকার ডিজাইনাররা ব্লক-বাটিককে আধুনিক কাট, নতুন রঙের প্যালেট এবং মিনিমাল মোটিফের সঙ্গে মিশিয়ে উপস্থাপন করছেন। লিখেছেন রিক্তা রিচি

গরমে হালকা ওজনের সুতি কাপড়ের পোশাক আলাদা কদর পায়। কারণ একটাই– আরাম। এ বছরও স্বস্তিতে থাকতে অধিকাংশ মানুষ বেছে নেন ব্লক ও বাটিকের পোশাক। তবে গরমের ফ্যাশনে ব্লক প্রিন্ট ও বাটিক নতুন কিছু নয়। কয়েক শতাব্দী ধরে এ দুই কারুকাজের চর্চা চলছে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের গরম তো বটেই, অন্যান্য ঋতুতেও এ ধরনের পোশাকের গুরুত্ব এতটুকু কমে না। সাম্প্রতিক সময়ে ডিজাইনাররা ব্লক-বাটিককে আধুনিক কাট, নতুন রঙের প্যালেট এবং মিনিমাল মোটিফের সঙ্গে মিশিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করছেন, যা তরুণদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেছে। একসময় যেখানে লাল-সাদা-হলুদ বা গাঢ় রংই প্রাধান্য পেত, এখন সেখানে প্যাস্টেল শেড, আর্থি টোন, এমনকি মনোক্রোম্যাটিক ডিজাইনও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

মেয়েদের সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি, কুর্তি, ফতুয়া তো বটেই, ছেলেদের শার্ট, ফতুয়া, পাঞ্জাবিতেও ব্লক-বাটিকের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। এখন কেবল সুতি কাপড়েই নয়, সিল্ক, গরদ, তসর, মসলিন, অ্যান্ডি কটন এমনকি খাদি কাপড়েও বাটিক প্রিন্ট করা হয়। ব্লক প্রিন্ট মূলত সুতি, সিল্ক, লিনেন, ভয়েল এবং খাদি কাপড়ে বেশি করা হয়। কারণ এ ধরনের ফেব্রিকে প্রিন্ট ভালো হয়। এ ছাড়া টুইল কটন, ভ্যাট বাটিকের কাপড়ে ব্লক প্রিন্ট বেশি জনপ্রিয়। অনলাইনভিত্তিক ব্র্যান্ড দেশীয়র ম্যানেজার জান্নাতুল ইপা জানান, এসি কটনের বাটিক থ্রিপিস এই গরমে বেশ চলছে। এ ছাড়া নিজস্ব নকশার ব্লকের সালোয়ার-কামিজও সাড়া পাচ্ছে। সেগুলো প্রিমিয়াম অর্ক সেঞ্চুরি ভয়েল ফেব্রিকের ওপর করা হয়েছে। আড়ং কটনের ওপর ব্লক করা শাড়ির চাহিদাও বেড়েছে। 
বিবিয়ানার স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার লিপি খন্দকার বলেন, ‘আগে কেবল কুমিল্লাতেই বাটিকের কাজ করা হতো। সেখান থেকে বাটিকের কাপড় কিনে আনা হতো। তা দিয়ে পোশাক বানাতাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, ব্লক-বাটিকের কলেবর বেড়েছে। অনেক ডিজাইনার কাজ করছেন, এতে বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে।’ 

তাঁর মতে, ‘বাটিকের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে এখন ডিজাইন, কোয়ালিটির মান এবং রঙের স্থায়িত্ব অনেক বেড়েছে। আগে বাটিকের কাপড় ধুলে প্রচুর রং উঠত। এখন ডিজাইনাররা এমনভাবে কাজ করছেন যেন রং না ওঠে। তাই এখন অনেক মানসম্মত বাটিক তৈরি হচ্ছে।’
ডিজাইনের ক্ষেত্রে আগে অনেক মোটা ও সলিড কাজ হতো। তখন হয়তো একটি চিকন যন্ত্র দিয়ে ড্রয়িং করে করে বাটিক করা হতো। এখন ব্লক বাটিকের ক্ষেত্রে কাঠের ব্লকের পাশাপাশি স্টিলের ব্লকও ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে ডিজাইন আরও সূক্ষ্ম ও নিখুঁত হচ্ছে। এটি মূলত টেকনিক্যাল বিষয়। প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, কাজ তত সুন্দর হবে–জানান লিপি খন্দকার। 

ইতিহাসের পাতা থেকে
ব্লক প্রিন্ট প্রাচীন পদ্ধতি, যার শিকড় চীনে। এর উদ্ভব প্রায় চার হাজার বছর আগে। খোদাই করা কাঠের ব্লকে রং লাগিয়ে কাপড়ে ছাপ দেওয়া হতো। চীন থেকে এ শিল্প এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতে বারো শতকের দিকে ছড়িয়ে পড়লেও বিকাশ লাভ করে মোগল আমলে। আমাদের দেশে এ প্রিন্টের বিকাশ লাভ করে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কামরুল হাসানের মতো শিল্পীদের হাত ধরে। সে সময় আলু ও লাউয়ের ডাঁটা ব্যবহার করে ব্লক করতেন তিনি। এরপর কাঠব্লকের সাহায্যে কাজ করেছেন। 
ধারণা করা হয়, বাটিকের জন্ম ইন্দোনেশিয়ায়। কারিগররা সুনিপুণ হাতে সমুদ্রের নীল জলরাশি কিংবা সবুজ প্রকৃতি, নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরেন। লিপি খন্দকার জানান, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় প্রযুক্তি এত উন্নত যে তারা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ডট বা চিকন লাইন আনতে পারে, যা বাংলাদেশে এখনও পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। তবে অনুশীলনের মাধ্যমে আমাদের এখানেও দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। 
জানা যায়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে বাটিক জনপ্রিয় হয়। অন্য দেশ থেকে দেখে তিনি শান্তিনিকেতনেও সেটি শুরু করেন। সে সময় বাটিকে প্রাধান্য পেত আলপনার নকশা। এভাবেই এই উপমহাদেশে বাটিক প্রবেশ করে। 

রঙের ব্যবহার
প্রাচীনকালে প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা হতো। এখন রাসায়নিক রঙেই বেশির ভাগ কাজ করা হয়। তবে ১৯৬০ দশকের পর শিল্পী কামরুল হাসান প্রাকৃতিক রঙের বদলে কাঠের ব্লকে রাসায়নিক রং দিয়ে ব্লক প্রিন্ট করতেন। প্রাকৃতিক রঙের জাদুকর রুবি গজনবী সেই ধারা মানেননি। তিনি আশির দশকে প্রাকৃতিক রং নিয়ে কাজ শুরু করেন। কেবল ডাইংয়েই নয়, ব্লক প্রিন্ট ও স্ক্রিন প্রিন্টেও প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করেন এবং প্রাকৃতিক রঙের পুনর্জাগরণে অভাবনীয় ভূমিকা রাখেন। ব্লক প্রিন্টকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ডিজাইনার চন্দ্রশেখর সাহার ভূমিকাও অগ্রগণ্য। 
লিপি খন্দকার জানান, বাটিক বা ব্লকে এখন রাসায়নিক এবং ভেজিটেবল (প্রাকৃতিক) দুই ধরনের ডাই-ই হচ্ছে। তবে অনলাইনে অনেক সময় ভুল তথ্য দিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করা হয়। বলা হয়–সব বাটিকই ভেজিটেবল ডাই। প্রাকৃতিক রং মূলত প্রকৃতি থেকে পাওয়া যায়। যেমন মাটি বা লোহার জং থেকে রং তৈরি করা হয়। ভেজিটেবল ডাইয়ের ক্ষেত্রে পেঁয়াজের খোসা, সুপারি, হলুদ, বিট বা বিভিন্ন মসলা ব্যবহার করে রং করা হয়।

শিবোরি বাটিক বনাম টাইডাই
আজকাল শিবোরি বাটিকের শাড়ি ও অন্যান্য পোশাক বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ডিজাইনারদের মতে, শিবোরি মূলত বাটিক নয়, এটি সম্পূর্ণ আলাদা টেকনিক। এটি অনেকটা আমাদের কাঁথা স্টিচের মতো। কাঁথা ফোঁড় বা ‘রানিং স্টিচ’ দিয়ে কাপড়ে প্যাটার্ন তৈরি করে সুতা টেনে একদম টাইট করে ডিজাইনটি আনা হয়। অন্যদিকে, টাই-ডাই হলো কাপড়ের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট ডট বা শেপ দিয়ে বেঁধে ডাই করার পদ্ধতি। শিবোরিও বেঁধে ডাই করা হয়। তবে এর সেলাইয়ের টেকনিক একে সাধারণ টাই-ডাইয়ের চেয়ে আলাদা ও কঠিন করে তোলে। এটি অনেক সূক্ষ্ম কাজ এবং এতে নকশার অনেক বৈচিত্র্য আনা যায়। 

গরমে আড় কটনের ওপর ব্লক প্রিন্ট শাড়ির চাহিদা বেড়েছে    মডেল: প্রিয়মণি; মেকওভার: পারসোনা; পোশাক: দেশীয়; ছবি: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য

জাপানি টাইডাই 
সৌখিন কারুশিল্পের স্বত্বাধিকারী আফরোজা খানম মুক্তা জানান, এখন জাপানি টাইডাই করা বিভিন্ন পোশাক, বিছানার চাদর বেশ চলছে। আড়ং, দেশী দশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পোশাকে এ টাইডাই করা হয়। জাপানি টাইডাই ব্যাট কালার দিয়ে করা যায়। ট্রোশিয়ান কালার দিয়েও করা হয়। তবে ব্যাট কালার দিয়ে করলে ওটা কখনোই নষ্ট হয় না। ব্লক ও টাইডাইয়ের কাজে নন্দন যোগ করার পরামর্শ দিয়ে মুক্তা জানান, ব্লকের পাশে জুঁই বা শিউলি ফুল বসিয়ে ওই ফুলে হাতের সেলাই করে বেশ আকর্ষণীয় করা যায়।

আরও পড়ুন

×