শৈশবেই সাঁতার
সাঁতার শিশুর শারীরিক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে
আসমাউল হুসনা
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
পানির প্রতি শিশুর আকর্ষণ স্বাভাবিক। সুইমিংপুলে নামা, পানিতে খেলাধুলা কিংবা সাঁতার কাটার আনন্দ শিশুর কাছে বেশ উপভোগ্য। তবে এ আনন্দের পাশাপাশি পানিতে রয়েছে ঝুঁকিও। দেশে প্রতিবছর পানিতে ডুবে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়। তাই সাঁতার এখন শুধু বিনোদন বা শরীরচর্চার বিষয় নয়, শিশুর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোটবেলা থেকেই সাঁতার শেখানো হলে পানির সঙ্গে শিশুর পরিচিতি তৈরি হয় এবং পানিতে চলাফেরার মৌলিক দক্ষতা অর্জন করে। তবে সাঁতার জানা মানেই শিশু পানিতে সম্পূর্ণ নিরাপদ এমন ধারণা ঠিক নয়। সাঁতার জানা শিশুকেও কখনও পানির কাছে একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অভিভাবকের সচেতনতা ও সার্বক্ষণিক নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।
প্রশিক্ষকদের মতে, সাঁতার শেখানোর ক্ষেত্রে বয়সের পাশাপাশি শিশুর শারীরিক সক্ষমতা, পানির প্রতি আগ্রহ এবং মানসিক প্রস্তুতিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। সাধারণত ছয় থেকে আট বছর বয়স থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ শুরু করা যায়। কিছু ক্ষেত্রে আরও ছোট শিশুকেও অভিভাবকের উপস্থিতিতে পানির সঙ্গে পরিচিত করা হয়।
সাঁতার শিশুর শারীরিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পানিতে শরীরচর্চার ফলে শরীরের বিভিন্ন পেশি সক্রিয় হয় এবং শরীরের ভারসাম্য ও সমন্বয় ক্ষমতা বাড়ে। নিয়মিত সাঁতার শিশুর শারীরিক সক্ষমতা ও সহনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে এটি শিশকে সক্রিয় রাখে এবং দীর্ঘ সময় মোবাইল, ট্যাব বা টেলিভিশনের সামনে বসে থাকার প্রবণতা কমাতেও সহায়ক হতে পারে।
সাঁতার শেখার মাধ্যমে শিশুর আত্মবিশ্বাসও বাড়ে। নতুন একটি দক্ষতা অর্জনের ফলে তাদের মধ্যে আত্মনির্ভরতার অনুভূতি তৈরি হয়। দলগতভাবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় অন্য শিশুর সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ তৈরি হয়, যা সামাজিক দক্ষতা ও শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তুলতেও সহায়ক।
কোথায় শেখানো হয়, খরচ কত
ঢাকার বিভিন্ন সুইমিংপুল, স্পোর্টস ক্লাব ও ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানে শিশুদের সাঁতার শেখানো হয়। প্রতিষ্ঠানভেদে কোর্সের মেয়াদ, প্রশিক্ষণের সময়, বয়সসীমা ও ফি ভিন্ন।
রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ১৬ দিনের একটি কোর্সে সপ্তাহে চার দিন ক্লাস হয়। ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুর জন্য এ কোর্সে সর্বোচ্চ ১২ জন শিক্ষার্থী থাকে এবং ফি ১৮ হাজার ৫০০ টাকা।
ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ২১ দিনের সেশনে প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে, সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস হয়। ছয় বছর বয়স থেকে শিশুকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একটি ব্যাচে একজন প্রশিক্ষকের অধীনে ছয়জন শিক্ষার্থী থাকে এবং কোর্স ফি ২০ হাজার টাকা।
দ্য ওয়েস্টিন ঢাকায় ৬ বছর থেকে শিশুদের সাঁতার শেখানো হয়। ২ মাসের এই কোর্সে মোট ১৬টি ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি ব্যাচে শিশু থাকে ৬ থেকে ৮ জন। শুক্র ও শনিবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত চলে সাঁতারের প্রশিক্ষণ। এখানে ৬ থেকে ১২ বছরের শিশুদের কোর্স ফি ২৪ হাজার টাকা। ১৩ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের সাঁতার শিখতে খরচ পড়বে ২৯ হাজার টাকা।
শুধু বেসরকারি ব্যবস্থাপনা বা পাঁচতারকা হোটেলেই নয়, সরকারি ব্যবস্থাপনাতেও শিশুর সাঁতার শেখার সুযোগ রয়েছে।
মিরপুরে সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতীয় সুইমিং কমপ্লেক্সে সাধারণত আট বছর বয়স থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া যায়। প্রথম মাসে ফি তিন হাজার টাকা এবং পরবর্তী মাসগুলোয় দুই হাজার ৫০০ টাকা। এখানে পেশাদার প্রশিক্ষকের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা সময়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের আইভি রহমান সুইমিং পুল, পুরানা পল্টনেও সাঁতার শেখানো হয়। প্রথম মাসের ফি দুই হাজার ৫০০ টাকা এবং পরবর্তী মাসে দুই হাজার টাকা। সপ্তাহে পাঁচ দিন ১ ঘণ্টা করে ক্লাস হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সুইমিং পুলেও সাঁতার শেখার সুযোগ রয়েছে। এখানে মাসিক ফি প্রায় দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকা। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত এই পুলে প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে।
ঢাকা অফিসার্স ক্লাব সুইমিং পুলে বহিরাগতদের জন্য ১৬ দিনের কোর্সের ফি প্রায় ছয় হাজার ৮০০ থেকে সাত হাজার ২০০ টাকা। সদস্যদের জন্য খরচ তুলনামূলক কম।
সাঁতার শেখানোর ক্ষেত্রে তাই শুধু কোর্সের ফি বা কাছের সুইমিংপুল বেছে নেওয়াই যথেষ্ট নয়। শিশুর বয়স ও সক্ষমতার সঙ্গে মানানসই প্রশিক্ষণ, দক্ষ প্রশিক্ষক এবং নিরাপদ পরিবেশ সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হবে। তবে প্রশিক্ষণ যত ভালোই হোক, পানির কাছে শিশুকে কখনও একা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কারণ সাঁতার জানা পানিতে ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করলেও, অভিভাবকের সচেতনতা ও নজরদারির বিকল্প নেই। আনন্দ, শরীরচর্চা ও আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ
জীবনদক্ষতা হিসেবে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের সাঁতার শেখানো তাই হতে পারে সচেতন অভিভাবকত্বেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
- বিষয় :
- সাঁতার