ভালো সাড়া মিলছে ভোগান্তিও কম নয়
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৫-২৬ করবর্ষ থেকে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করেছে। এর মূল লক্ষ্য ডিজিটাল ট্যাক্সেশন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনা। আয়কর-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে করদাতাদের মধ্যে বেশ সাড়া দেখা গেলেও কিছু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন, কারিগরি ত্রুটি ও অতিরিক্ত ট্রাফিকের কারণে ধীরগতি, নিবন্ধনের কঠিন শর্তাবলি, কর গণনার সুবিধা না থাকায় তথ্য পর্যালোচনা করতে অসুবিধা, ডিজিটাল বিভাজনের ফলে স্বাক্ষরতা ও ইন্টারনেট অ্যাক্সেসের অভাব। ফলে ব্যবসায়ী ও উচ্চবিত্ত করদাতাদের একটি বড় অংশ অনলাইন সিস্টেমে পুরোপুরি অভ্যস্ত হতে পারেননি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ই-রিটার্ন সিস্টেমের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি তথ্যসমৃদ্ধ কর গণনা ও রিটার্ন তৈরি করা, যেখানে আয়ের প্রধান উৎস, উৎসে কর, ব্যয়, সম্পদ এবং দায় ই-রিটার্ন পোর্টালের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। তখন করদাতার শুধু অল্প কিছু তথ্য পর্যালোচনা ও সম্পাদনা করার প্রয়োজন হবে।
অনলাইনে রিটার্ন জমা ৪০ লাখের বেশি
এনবিআর জানিয়েছে, চলতি ২০২৫-২৬ করবর্ষে ৪০ লাখের বেশি করদাতা অনলাইন আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন। করযোগ্য সীমার নিচে আয় দেখিয়েছেন, এমন পুরুষ করদাতার সংখ্যা ১৪ লাখ ৩৫ হাজার ৬৩০ ও নারী সাত লাখ ৬৫ হাজার ১৯৭। এর মানে ২২ লাখের বেশি করদাতা রিটার্ন জমা দিলেও কোনো কর দেননি। রিটার্ন জমা দেওয়া করদাতাদের মধ্যে ৪০ লাখ টাকার বেশি আয় দেখিয়েছেন, এমন পুরুষ করদাতার সংখ্যা ২৯ হাজার ৮০ ও নারী পাঁচ হাজার ১১৭। সব মিলিয়ে ৪০ লাখ টাকার বেশি আয় করেছেন ৩৪ হাজার ১৯৭ জন করদাতা। এ ছাড়া প্রায় ৫০ লাখ করদাতা অনলাইন বা ই-রিটার্ন
সিস্টেমে নিবন্ধন নিয়েছেন। এনবিআর জানিয়েছে, ব্যক্তিশ্রেণির সব করদাতা আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত রিটার্ন জমা দিতে পারবেন।
অনলাইনে রিটার্ন কতটা সহজ
অনলাইনে রিটার্ন জমার সময় কোনো প্রকার সাপোর্টিং ডকুমেন্ট বা বিল-ভাউচার স্ক্যান করে আপলোড করা লাগে না। ব্যবসায়িক রিটার্নের ক্ষেত্রে ‘ইনকাম স্টেটমেন্ট’ এবং ‘ব্যালেন্স শিট’ সরাসরি পোর্টালে ইনপুট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রিটার্ন জমার পর তাৎক্ষণিকভাবে একনলেজমেন্ট স্লিপ ও কর সার্টিফিকেট ডাউনলোড করা যায়।
করদাতা একবারে সব তথ্য দিতে না পারলে ড্রাফট হিসেবে সেভ করে রাখতে পারছেন। সব তপশিলি ব্যাংকের কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ, রকেট) দিয়ে সরাসরি ট্যাক্স পরিশোধ করা যাচ্ছে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাবিবুর রহমান নামের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আগে আয়কর অফিসে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হতো, এখন ঘরে বসেই রিটার্ন জমা দিয়ে সার্টিফিকেট পাওয়া যাচ্ছে। তবে ব্যাংক লোন বা অন্যান্য কাজে কাগজের রিটার্নের যে ডিমান্ড থাকে, অনলাইন একনলেজমেন্ট কপি সব জায়গায় সহজে গ্রহণ করছে কিনা তা আরও পরিষ্কার হওয়া দরকার।
কোন ক্ষেত্রে সাড়া কম
এনবিআরের তথ্যমতে, সরকারি চাকরিজীবী, ব্যাংক ও টেলিকম খাতের কর্মীদের মধ্যে ই-রিটার্ন দাখিলের হার বেশি। তবে যাদের আয়ের উৎস একাধিক এবং যারা বিভিন্ন উৎস থেকে লভ্যাংশ পান, তারা অনলাইন সিস্টেমের ‘শর্টকাট’ বা ‘অটো-ক্যালকুলেশন’ পদ্ধতির চেয়ে ম্যানুয়াল হিসাব যাচাইকে বেশি নিরাপদ মনে করেন। অনেকে এনআইডি দিয়ে বায়োমেট্রিক নিবন্ধিত সিম না থাকায় রেজিস্ট্রেশন করতে পারছেন না। সার্ভারে অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক সময় ধীরগতিতে কাজ করে। একবার রিটার্ন জমা হয়ে গেলে তা সংশোধনের প্রক্রিয়া এখনও অস্পষ্ট।
এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, এর অনেক সুবিধা রয়েছে, কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ডিজিটাল রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়াটি সহজ হলেও জটিল কর আইন এবং ডিভাইসের সীমাবদ্ধতা এখনও অনেকের সমস্যা। এনবিআরের উচিত একটি তথ্যসমৃদ্ধ কর গণনা ও রিটার্ন তৈরি করা, যেখানে আয়ের প্রধান উৎস, উৎসে কর, ব্যয়, সম্পদ এবং দায় ই-রিটার্ন পোর্টালের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, করদাতারা কোন হয়রানি ছাড়াই এখন সহজে রিটার্ন দাখিল করতে পারছেন। করদাতাদের সহায়তার জন্য প্রতিটি কর অঞ্চলে ‘হেল্প ডেস্ক’ এবং কেন্দ্রীয় কলসেন্টার (০৯৬৪৩-৭১৭১৭১) চালু আছে।
- বিষয় :
- অনলাইনে
