ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বৃষ্টিভেজা বিকেল বেলা

বৃষ্টিভেজা বিকেল বেলা
×

অলংকরণ:: শেখ শাহাদ

আবুল কালাম 

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৭:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

কোলাহলপূর্ণ একটি জায়গায় বসে আছি। চারপাশে আমার বয়সী অনেক ছেলেমেয়ে। সবাই গল্প করছে, হাসছে, আড্ডায় মেতে আছে। আমিও তাদের মাঝে বসে ছিলাম, কিন্তু মনটা যেন অন্য কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল। অজানা এক আনন্দ আর অদ্ভুত ভালো লাগা আমাকে ঘিরে রেখেছিল। 
খোলামেলা সেই পরিবেশে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ স্বপ্না এসে আমার ভাবনার জগৎটা ভেঙে দিল। তার হাতে রুটি বেলার মেশিন। বুঝতে বাকি রইল না, অনেকক্ষণ ধরেই সে সংসারের কাজে ব্যস্ত ছিল। লেবুগাছের নিচ দিয়ে পথের ধারে ধীরে ধীরে হেঁটে এসে সে আলতো করে আমার উরুতে আঘাত করল। আমিও মজা করে ব্যথা পাওয়ার ভান করলাম।
সেই মুহূর্তে স্বপ্নাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল। তাকে দেখে আমি চমকে যাই। মনে হচ্ছিল, এ যেন কোনো শুভ্র পরী আকাশ থেকে নেমে এসেছে। তার মুখে ছিল মায়া, চোখে ছিল অভিমান আর পুরো মানুষটার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি। তাকে দেখে আমি আরও মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
এরপর মনে পড়ল, দুদিন আগে স্বপ্নাকে তার বাবার বাড়িতে রেখে এসেছিলাম। তারপর আর কোনো খোঁজই নিইনি। আজ সে একাই বাড়ি ফিরে এসেছে। এসে ঘরদোর গুছিয়েছে, সবকিছু ঠিকঠাক করেছে। আমি সকাল থেকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েই সময় কাটাচ্ছি। ঘরে ফেরার কথাও মনে হয়নি। আসলে আমি জানতামই না সে আজ হঠাৎ করে ফিরে আসবে।
স্বপ্না উঠানের দিকে চলে যাওয়ার পর হঠাৎ আমার বুকের ভেতর কেমন যেন লাগতে শুরু করল। ভাবতেই অবাক লাগছিল, এই মেয়েটা সত্যিই আমার স্ত্রী! এত সুন্দর, এত যত্নশীল, এত ভালো একটা মানুষ আমার জীবনে এসেছে, এটা যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
স্বপ্না ঠিক তেমনই, যেমনটা আমি সবসময় কল্পনা করতাম। যত দিন যাচ্ছে, তার প্রতি আমার ভালোবাসা আরও গভীর হচ্ছে। কিন্তু স্বপ্নার আরেকটা পরিচয়ও আছে। সে একজন স্টুডেন্ট। পড়াশোনায় খুব ভালো। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি আমার প্রতিও তার খেয়াল রাখার কোনো কমতি নেই।
স্বপ্নার অনেক দিনের ইচ্ছে, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবে। একসময় এই স্বপ্নটা আসলে আমারই ছিল। পড়াশোনা করার সময় আমি প্রায়ই তাকে বলতাম, একদিন আমরা সুন্দর একটা দেশে চলে যাব। সেখানে পড়াশোনা করব, ভালো একটা জীবন গড়ব, তারপর দুজনে মিলে সুখে থাকব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভাব এসে আমার সেই স্বপ্নটাকে থামিয়ে দেয়। আমি ধীরে ধীরে উদাসীন হয়ে যাই। তখনই স্বপ্না আমার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নটাকে নিজের ভেতর লালন করতে শুরু করে।
আজ সত্যিই সে বিদেশ যাচ্ছে। তবে একা। যাওয়ার আগে সে বলেছে, কয়েক বছর পর আমাকেও নিয়ে যাবে। তবু তাকে বিদায় দিতে গিয়ে আমার বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল। পুরোনো দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, স্বপ্না চলে গেলে পুরো ঘরটা ফাঁকা হয়ে যাবে। সংসারের কাজ থাকবে, কিন্তু স্বপ্না থাকবে না। তার হাসি থাকবে না, অভিমান থাকবে না, সেই মায়াভরা ডাকটাও থাকবে না।
বিদায়ের মুহূর্তে বুঝতে পারলাম, তাকে আমি কতটা ভালোবাসি। বৃষ্টিভেজা এক বিকেলে স্বপ্না মাইক্রোবাসে করে চলে যাচ্ছিল। আমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে লেবু পাতার ফাঁক দিয়ে তার চলে যাওয়া দেখছিলাম। গাড়িটা ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছিল আর আমার চোখ ভরে উঠছিল অদ্ভুত এক শূন্যতায়...! 
সুহৃদ, মৌলভীবাজার

আরও পড়ুন

×