মেঘের ওপারে বাড়ি
অলংকরণ:: সাফায়েত সাগর
এম আব্দুল হালীম বাচ্চু
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৭:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
গ্রামের শেষ প্রান্ত। কাঁচা রাস্তার পাশে ছোট্ট টিনের ঘর। সামনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো কদম গাছ আর আগুনরঙা ফুলে ভরা পলাশ গাছ–দুটি গাছ যেন ঋতুর বুক থেকে গল্প কুড়িয়ে রাখত। সেই ঘরেই থাকত এহসান বারী বচ্চন। সবাই ডাকত বচ্চন নামে। মা আইভি লতা আর ছোট বোন নাহার। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু বচ্চনের মনে ছিল এক অদ্ভুত স্বপ্ন–একদিন সে মেঘের ওপারে একটা বাড়ি বানাবে, যেখানে কোনো কষ্ট থাকবে না।
পাশের বাড়ির মণিকা বিকেল হলেই কদম আর পলাশের ছায়ায় এসে বসত। হাতে বই, চুলে বাতাস আর চোখে এক নীরব নদী। বচ্চন দূর থেকে তাকিয়ে থাকত। কিছু বলতে পারত না। শুধু মনে হতো, মণিকার হাসি শুনলে পৃথিবীর সব বৃষ্টি থেমে যায়।
বচ্চনের শৈশবের বন্ধু সাখাওয়াত ছিল তার জমে থাকা সব কথার সাক্ষী। একদিন সাখাওয়াত বলল, তুই ওকে ভালোবাসিস, তাই না? বচ্চন মেঘের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
ভালোবাসা কি মুখে বলতে হয়?
সাখাওয়াত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–না বললে কখনও কখনও মানুষ হারিয়ে যায়।
বচ্চন কিছু বলল না। কদমফুলের গন্ধে সন্ধ্যা নেমে আসছিল।
একদিন বিকেলে মণিকা এসে বলল, তুমি সবসময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাক কেন?
বচ্চন বলল, ওপারে আমার একটা বাড়ি আছে।
মণিকা অবাক হয়ে হেসে বলল,
–মেঘের ওপারে আবার বাড়ি হয় নাকি?
–যারা খুব কষ্ট পায়, তারা বানায়।
মণিকা সেদিন কিছু বলেনি। শুধু তাকিয়ে ছিল। প্রথমবার বুঝেছিল, ছেলেটার ভেতরে ঝড় লুকিয়ে আছে। এরপর মণিকা প্রায়ই আসত। নাহারের জন্য বই আনত, আইভি লতার সঙ্গে রান্নাঘরে গল্প করত। ঘরটায় যেন আলো ঢুকে পড়েছিল। আইভি লতা বলতেন, মেয়েটা এলে এই ঘরটা বেঁচে ওঠে। বচ্চনের বুকের ভেতর জমে উঠত অদ্ভুত এক সুখ। কিন্তু সে কখনও বলেনি, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। হঠাৎ একদিন খবর এলো মণিকার বিয়ে ঠিক হয়েছে শহরের এক স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে। সবকিছু খুব দ্রুত। পৃথিবী যেন হঠাৎ থেমে গেল। সেই রাতে কদম আর পলাশ গাছের মাঝে বচ্চন বসে ছিল। সাখাওয়াত পাশে এসে বলল, এখনও সময় আছে। গিয়ে বলে আয়। বচ্চন মাথা নাড়ল। –যে পাখি উড়তে চায়, তাকে ধরে রাখা পাপ।
পরদিন মণিকা এলো। হাতে একটি ছোট কাঠের বাক্স। –এটা রাখো।
বচ্চন খুলে দেখল ভেতরে শুকনো কদমফুল, পলাশের লাল পাপড়ি আর একটি কাগজ।
তাতে লেখা– ‘তোমার মেঘের ওপারের বাড়িতে যদি জানালা থাকে, তাহলে আমাকে দেখো মাঝেমধ্যে।’
বচ্চনের গলা কেঁপে উঠল। –তুমি চলে যাবে?
মণিকা চোখ নামিয়ে বলল, সবাই নিজের ইচ্ছেমতো থাকতে পারে না।
দূরে দাঁড়িয়ে সাখাওয়াত দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই বিকেলটা একদিন গল্প হয়ে থাকবে।
আকাশে কালো মেঘ। মণিকার গাড়ি ধুলো তুলে দূরে মিলিয়ে গেল। বচ্চন দাঁড়িয়ে ছিল কদম আর পলাশের ছায়ায়। মনে হচ্ছিল, কেউ তার মেঘের ওপারের দরজাটা বন্ধ করে দিল।
বছরখানেক পরে এক বর্ষার দুপুরে সে গ্রামে ফিরল। কদম আর পলাশ গাছ এখনও পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। ডাকপিয়ন একটা পুরোনো খাম দিল।
খাম খুলে বচ্চন দেখল একটি চিঠি–‘বচ্চন, আমার জানালা আজও খোলা। তোমার মেঘের ওপারের বাড়ি কি এখনও আছে? আমি প্রতিদিন বৃষ্টির শব্দে তার ঠিকানা খুঁজি।’
চিঠির কালি ঝাপসা। যেন কারও চোখের জল শুকিয়ে আছে। বচ্চন বাক্সটা খুলল। শুকনো কদমফুল, পলাশের লাল পাপড়ি–সব আগের মতোই আছে। সাখাওয়াত এসে পাশে দাঁড়াল। এত বছর পরও বন্ধুর নীরবতা সে চিনতে পারে।
আইভি লতা বারান্দা থেকে ডাকলেন,
–কী দেখিস এত?
বচ্চন আকাশে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, বাড়ি।
–কোথায়?
সে ধীরে বলল, মেঘের ওপারে। যেখানে হারিয়ে যাওয়া মানুষও একদিন ফিরে আসে।
বৃষ্টি নেমে এলো। বচ্চন বুঝল–কিছু ভালোবাসা কখনও কাছে আসে না। তবু সারাজীবন হৃদয়ের আকাশে মেঘ হয়ে ভাসে।
সুহৃদ, পাবনা
- বিষয় :
- সুহৃদ সমাবেশ
