ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা
×

নওগাঁর মান্দায় কাঞ্চন উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে সুহৃদ সমাবেশ আয়োজিত ‘নিরাপদ বিদ্যাপীঠ, শিক্ষার্থীর অধিকার’ শীর্ষক কর্মশালা শেষে অতিথি ও সুহৃদদের সঙ্গে কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের একাংশ

কাজী কামাল হোসেন 

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিদ্যালয় কি কেবলই চার দেয়ালের মধ্যে পাঠ্যবইয়ের পাতা ওল্টানোর জায়গা নাকি একজন শিক্ষার্থীর নিরাপদ ও মানবিক বিকাশের এক উন্মুক্ত আকাশ? এ প্রশ্নটি আবারও সামনে এলো সুহৃদের কর্মশালায়। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধ, যৌন হয়রানির প্রতিবাদ এবং বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করার প্রত্যয়ে নওগাঁর মান্দায় অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমী কর্মসূচি।
সমকাল সুহৃদ সমাবেশ নওগাঁর উদ্যোগে কাঞ্চন উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে ‘নিরাপদ বিদ্যাপীঠ, শিক্ষার্থীর অধিকার’ শীর্ষক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সোমবার দুপুরে এ বিদ্যাপীঠ মুখর হয়ে উঠে একঝাঁক তারুণ্যের উপস্থিতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী উচ্চারণে।

সমাজে এখনও অনেক মেয়ে কৈশোরের স্বপ্নগুলো ডানা মেলার আগেই বাল্যবিবাহের বলয়ে বন্দি হয়ে যায়। এ নির্মম বাস্তবতায় বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতামূলক কর্মশালার প্রধান আলোচক, নওগাঁ মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনা খাতুন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, বাল্যবিবাহ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। অল্প বয়সে বিয়ে একটি শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক বিকাশকে পুরোপুরি অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দেয়। তিনি ছাত্রীদের আত্মবিশ্বাসী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যে কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বা বিয়ের জোরপূর্বক চেষ্টা চললে তা লুকিয়ে না রেখে শিক্ষক, অভিভাবক কিংবা প্রশাসনকে জানাতে হবে। কারণ, সঠিক সময়ে একটি ছোট প্রতিবাদও অনেক বড় সামাজিক দুর্ঘটনা রুখে দিতে পারে।

একটি নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন গড়ে তুলতে হলে শুধু প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে থাকলেই চলবে না, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে–এ সত্যটিই মনে করিয়ে দেন সমকাল সুহৃদ সমাবেশের জেলা সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী চন্দন কুমার দেব। বক্তব্যে তিনি বলেন, অন্যায়ের মুখে নীরব থাকা অপরাধের চেয়েও বড়। আজকের তরুণদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে; তবেই গড়ে উঠবে বৈষম্যহীন আগামী। এই রূপান্তরের মূল কারিগর যে আমাদের ছাত্রসমাজ, তা পুনর্ব্যক্ত করেন সংগঠনের জেলা সভাপতি মৌদুদুর রহমান কল্লোল। তাঁর মতে, ভয়হীন এবং নিরাপদ পরিবেশে যখন একটি শিশু বড় হওয়ার সুযোগ পায়, তখনই সে দেশের একজন আত্মবিশ্বাসী নাগরিক হয়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশটি ছিল উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব। প্রথার চাদর ভেঙে কাঞ্চন উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের কয়েকশ শিক্ষার্থী সরাসরি যুক্ত হয় সংলাপে। যৌন হয়রানি, সাইবার বুলিং কিংবা নিজের অজান্তেই বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে পড়ার মতো বাস্তব সংকটগুলো নিয়ে কিশোরী ও তরুণীরা একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। অতিথিরাও আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তব উদাহরণ ও আইনের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করে তাদের মনে সাহস জোগান। একইসঙ্গে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের সতর্কতা এবং আত্মসম্মানবোধ বজায় রাখার চমৎকার কিছু কৌশল শিখিয়ে দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের।
তবে শুধু সচেতনতা সৃষ্টিই শেষ কথা নয়, আকস্মিক কোনো বিপদে মেয়েরা কীভাবে নিজেদের রক্ষা করবে এবং তাৎক্ষণিক সহায়তা পাবে এর কার্যকর নির্দেশিকাও দেওয়া হয়েছে কর্মসূচির মাধ্যমে। অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হলে মেয়েরা ভয়ে বা দ্বিধায় প্রিয়জনদের কিছু জানাতে পারে না। এ সংকট কাটাতে কর্মসূচিতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন জরুরি যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার হাতে-কলমে শিখিয়ে দেওয়া হয়। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এর পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ‘১০৯’ এবং ‘৩৩৩’ নম্বরের কার্যকারিতা প্রদর্শন করা হয়। বিশেষ নজর কাড়ে সরকারের ‘জয়’ মোবাইল অ্যাপের ব্যবহারিক প্রদর্শনী। এই অ্যাপের প্যানিক বাটনে একটি মাত্র ক্লিকেই কীভাবে তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পরিবারের কাছে সাহায্য এবং লোকেশন পৌঁছে যায়, তা দেখে ছাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের বাড়তি আত্মবিশ্বাস লক্ষ্য করা গেছে।
অধ্যক্ষ দিলীপ কুমারের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন–শিক্ষক কাজী মোজাম্মেল হক, আব্দুস সাত্তার, বিমান কুমার সরকার, আনিসুর রহমান, আব্দুল আলিমসহ সুহৃদরা। 
সময়োপযোগী উদ্যোগের প্রশংসা করে শিক্ষক ও অভিভাবকরা বলেন, বিদ্যালয়ভিত্তিক কর্মশালা নিয়মিত হওয়া উচিত, যা প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবে এবং তাদের করে তুলবে মানবিক মূল্যবোধে বলীয়ান। ‘বাল্যবিবাহকে না বলুন, নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তুলুন’–এই প্রত্যয়ে সেদিন ঘরে ফিরেছে একদল স্বপ্নবাজ তরুণ; যারা আগামী দিনে আর কোনো স্বপ্নকে মাঝপথে ঝরে যেতে দেবে না। 
সমন্বয়ক, সুহৃদ সমাবেশ, নওগাঁ

আরও পড়ুন

×